জুলাই ২০, ২০১৬ ১৫:১৬ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের গুলশানের ঘটনায় মিডিয়া ভুল করেছে এমনটি মনে হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ।

তিনি রেডিও তেহরানের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মিডিয়ায় যদি সরাসরি প্রচার হতো তাহলে মানুষ ওই ঘটনাটি সম্পর্কে আরো ভালোভাবে ধারনা করতে পারত এবং ওই ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কেও জানতে পারত। আর এরকম পরিস্থিতি প্রতিরোধে সাধারণের মধ্যে চেতনাবোধ ও উপলব্ধি আরো বেশি করে সৃষ্টি করা সম্ভব হতো যদি মিডিয়া সরাসরি সম্প্রচার করতে পারত।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, গুলশান ঘটনার পর সরকার যেসব নির্দেশাবলী জারি করেছেন সেটা অনেকটা অস্থির চিত্তের  শামিল। আর এরকম অস্থিরচিত্তের মধ্য দিয়ে কিন্তু জটিল যেসব ঘটনা ঘটে তার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, গুলশানের ঘটনা দেশের শুধুমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরই নয় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ওপরও একধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান:  বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গুলশানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সম্প্রচারের বিষয়ে বাংলাদেশের বেশকিছু টেলিভিশন চ্যানেলের পর ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বলা হচ্ছে- অভিযান সম্পর্কিত সরকারের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করে দিচ্ছিল মিডিয়া। আসলেই কী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভুল করেছে নাকি মিডিয়া সম্পর্কে সরকারের ভুল নীতি প্রকাশ পাচ্ছে?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: আমি ওই ঘটনার সময় যতদূর মিডিয়া দেখেছি তাতে আমার কাছে খুব একটা মনে হয়নি যে মিডিয়া ভুল করেছে। সেদিন যখন ঘটনা ঘটেছিল তারপর প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যেভাবে প্রচার করছিল তাতে সন্ত্রাসীদের বরং সুবিধাই হয়েছে। কখন কি করতে হবে এবং বাইরে কি ঘটছে সেটা তারা জানতে পারছে। আর সে কারণেই দেখা গেল সেসময় ইলেকট্রনিক মিডিয়া তাদের সরাসরি প্রচার বন্ধ করে দিল। তবে মিডিয়া প্রচার বন্ধ করে দিলেও কিন্তু ট্রাজেডি থামানো যায়নি।

যদি সরাসরি প্রচার হতো তাহলে মানুষ ওই ঘটনাটি সম্পর্কে আরো ভালো ধারনা করতে পারত। শুধু তাই নয় সাধারণ মানুষ ওই ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কেও জানতে পারত। আর এরকম পরিস্থিতি প্রতিরোধে সাধারণের মধ্যে চেতনাবোধ ও উপলব্ধি আরো বেশি করে সৃষ্টি করা সম্ভব হতো যদি মিডিয়া সরাসরি সম্প্রচার করতে পারত।

 রেডিও তেহরান:  গুলশান ঘটনার পর সরকার নির্দেশ জারি করেছে- যেসব ছাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০ দিনের বেশি অনুপস্থিত রয়েছে তাদের বিষয়ে সরকারকে অবহিত করতে হবে। কতটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এটি?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: সরকারের এই ধরনের  নির্দেশ দেয়ার পর বিষয়গুলো সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সরকারে পেলেই যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ হ্রাস পাবে এমনটি মনে করার কারণ নেই।

আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা নানাকারণে অনুপস্থিত থাকতে পারে। অসুস্থতার জন্য বা অন্য যেকোনো কারণে ছাত্র-ছাত্রী অনুপস্থিত থাকতে পারে। কাজেই কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলেই  তারা জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ত এমনটি ধারনা করা সঠিক নয়।

তবে একথাও ঠিক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা বিশেষ করে যারা ছাত্র ছিল তাদের কেউ কেউ গুলশান হামলার সাথে জড়িত  ছিল এবং কেউ কেউ তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এক পর্যায়ে চলে গেছে।

তবে বাস্তব তথ্য হলো তারা বেশ আগে থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিল সেটা কোনো ক্ষেত্রে একবছর কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। তবে আমি এটা জানিনা যে দশদিন অনুপস্থিত থাকার যে তথ্য নিতে চায় সরকার তা নিলে তারা এদেরকে খুঁজে বের করতে পারবে এবং তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে নতুন কোনো তথ্য বের করতে পারবে এমনটি খুব নিশ্চয়তার সাথে বলা যায় না।

আমার কাছে মনে হচ্ছে এই ঘটনার পর সরকার যেসব নির্দেশাবলী জারি করেছেন সেটা অনেকটা অস্থির চিত্ততার শামিল। আর এরকম অস্থিরচিত্ততার মধ্য দিয়ে কিন্তু এরকম জটিল যেসব ঘটনা ঘটে তার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব নয়।

রেডিও তেহরান:  গুলশানের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পর খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, ঢাকায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে দ্রুত; তারা দেশ ছাড়ছে। এছাড়া, কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে বলে খবর আসছে। তাহলে কী বলা যায়- গুলশান হত্যাকাণ্ড দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন গুলশানের ঘটনা দেশের শুধুমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরই নয় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ওপরও একধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ এ ধরনের ঘটনার ফলে যারা নিহত হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই বিদেশি। আর বিদেশিদের সাথে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে- সেই সহযোগিতামূলক সম্পর্কের সাথে তারা জড়িত ছিল। এরফলে ভবিষ্যতে বিদেশিরা বাংলাদেশে কতটা  আস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারবে  সে ব্যাপারে কিন্তু একটা প্রশ্ন রয়েছে। আর এ ধরনের ঘটনার যদি পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর যেমন করাল ছায়া পড়বে ঠিক তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের  ওপরও অস্থিরতা অবশ্যই দেখা দেবে।

রেডিও তেহরান: গুলশান হত্যাকাণ্ডের পর মার্কিন কর্মকর্তা নিশা দেশাই বিসওয়াল ঢাকা সফর করে গেলেন। তার এ সফরের মূল উদ্দেশ্য কি ছিল এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কী বিশেষ কোনো ভূমিকা পালন করবে?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদের মতো ঘটনা  যখন ঘটে তখন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার সমস্যা বলে মনে করে। আর সে কারণেই মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে নিশা দেশাই বিসওয়াল বাংলাদেশে এসেছিলেন। আমরা সংবাদপত্রে যতদূর পড়েছি তাতে দেখেছি কিছু কারিগরী সহায়তা এবং প্রয়োজনে  জনসম্পদ দিয়েও  বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব কতটা গ্রহণযোগ্য এবং প্রয়োজনীয় সরকার তা বিবেচনা করছে। তবে সরকার বলেছে এসব ব্যাপারে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এবং সরকারের বিবেচনায় আছে।

নিশা দেশাইয়ের সফরের পর পরই দেখা গেল রুশের  যে দূত বাংলাদেশে আছে তিনিও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে রাশিয়ার পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। এ থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন বড় বড় শক্তির নজর রয়েছে। অবশ্য এতে কিছুটা শঙ্কারও কারণ আছে। কারণ আমাদের মত দেশের ওপর যখন বড় বড় শক্তিগুলোর বেশি বেশি উৎসাহ দেখা যায় তাছাড়া আমরা এটাও জানি যে এইসব শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও রয়েছে এবং আমাদের দেশটি বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে প্রতিদ্বিন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হয় কি না সেটাও একটা প্রশ্ন। আর এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

আমাদের সমগ্র জাতিকে মনে রাখতে হবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা এবং জনগণের ঐক্য হচ্ছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। আর এগুলো যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সরকারকেও সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে একইসাথে জনগণকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।

রেডিও তেহরান: সবশেষ যে বিষয়টি আমরা জানতে চাইব তা হচ্ছে- বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নানা দুর্ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে একটি কথা ছড়িয়ে পড়েছে তা হলো- আগের ঘটনা চাপা দিতে পরের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে আপনি  কী বলবেন?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন আগের ঘটনা চাপা দিতে পরের ঘটনা ঘটছে আমি ঠিক বিষয়টিকে এভাবে দেখি না। আমার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে আগের একটা ঘটনার চেয়ে যদি পরের ঘটনার পরিধি এবং গভীরতা যদি একটু বেশি হয় তাহলে আগের ঘটনাটির আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। মিডিয়ার ঔৎসক্য কমে যায়। আর তাৎক্ষণিকভাবে যে ঘটনাটি ঘটছে সেটা নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশ হচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা আরেকটা হচ্ছে জঙ্গিবাদের সমস্যা। আর দুটো সমস্যার প্রকৃতি ও ধরন কিন্তু আলাদা। আর সমস্যার ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়েই কিন্তু এগুলোর সমাধানের জন্য চেষ্টা চালাতে হবে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২০