পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (ষষ্ঠ পর্ব)
হিজরি প্রথম শতকের শেষের দিকে স্পেনে মুসলিম বিজয়ের ফলে অন্যান্য মুসলমানের মত দক্ষিণ ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে ইরানিরা। এখানেও ইরানিরা ধর্মীয়, প্রশাসনিক ও বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নানা পদ দখল করতে সক্ষম হয়েছিল।
ইরানের অনেক জ্ঞানী-গুণী দক্ষিণ ইউরোপে ও বিশেষ করে স্পেনের শহরগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। হিজরি পঞ্চম শতক পর্যন্ত স্পেনের নানা ক্ষেত্রে ইরানিদের প্রভাব বজায় ছিল। এ সময় স্পেনে দেড়শ জনেরও বেশি ইরানি জ্ঞানী-গুণী ও মনীষী বসবাস করতেন।
খোরাসান অঞ্চলের ইরানিরা আব্বাসিয় খলিফা মাহদির শাসনামল থেকে এই রাজবংশের শাসকদের আস্থাভাজন হিসেবে মিশর, উত্তর আফ্রিকা, মরোক্কো ও তুর্কি দ্বীপপুঞ্জসহ নানা অঞ্চলের সামরিক এবং রাজনৈতিক প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই যুগে মিশরে আবারও ইরানি সংস্কৃতি জোরদার হয়।
ইরানিরা ইসলামী যুগে সংস্কৃতি ও সভ্যতার পশরা নিয়ে সুদূর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও হাজির হয়। ফলে ইরানি সংস্কৃতি ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অঞ্চলেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কারণ এ অঞ্চলে ধর্ম-প্রচারকারী মুসলমানদের বেশির ভাগই ছিলেন ইরানি। মুসলমানদের মাধ্যমে মালয়ী ভাষায় যেসব বই অনূদিত হয়েছিল সেগুলোর বেশিরভাগই অনূদিত হয়েছিল ফার্সি বই থেকে।
ইরানিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর থেকে ইরানি সংস্কৃতির কেন্দ্র পশ্চিম ইরান থেকে পূর্ব ইরানে চলে আসে। ইরানি জ্ঞানী-গুণী ও মনীষীদের অনেকেই বসবাস করতেন মধ্য, দক্ষিণ ও পশ্চিম ইরানে। কিন্তু এইসব অঞ্চলে আরবদের সঙ্গে সামরিক সংঘাত চলতে থাকায় ইরানি জ্ঞানী-গুণী, মনীষী ও সংস্কৃতি-সেবীরা খোরাসান ও ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চলে চলে আসেন। ফলে এই অঞ্চলও ইরানি-ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বিকাশ-কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চলটি ইসলামী শাসনামলের প্রথম দিকে ছিল ইরানেরই অঞ্চল। আজো এ অঞ্চল ইরানি সংস্কৃতি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। অবশ্য সিইর দরিয়া বা সিহুন নদীর ওপারে ছিল যুদ্ধবাজ অমুসলিম জাতিগুলোর আস্তানা। সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে তাদের আগ্রাসন ও লুটপাট সব সময় লেগেই থাকত।
ইসলামী শাসনের প্রথম কয়েক শতকে উত্তর খোরাসান ও ট্রান্স-অক্সিয়ানা ছিল মুসলিম বিশ্বের সর্বশেষ প্রান্ত এবং এশিয়ার সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত। ইরানিরা মুসলমান হওয়ার পর খোরাসান ও ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চলের সীমান্ত রক্ষার এবং তুর্কি অমুসলিম জাতিগুলো ও সে যুগের বেদুইন বা ভবঘুরেদের সঙ্গে জিহাদের দায়িত্ব পালন করতেন। ইসলামী শাসনের প্রথম কয়েক শতকে মুসলমানরা ট্রান্স-অক্সিয়ানার সীমান্তগুলোতে তুর্কি জাতিগুলোর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এই জাতিগুলো মুসলিম জিহাদিদেরকে প্রতিরোধের প্রাথমিক চেষ্টার পর মুসলমান হয়ে যায়। তুর্কিরা ধীরে ধীরে মুসলিম শাসকদের দরবারগুলোতে স্থান করে নেয়। এদের অনেকেই সীমান্তের অন্য পাড়ে মুসলমানদের জিহাদের সময় বন্দী হয়েছিল। পরে এরা যোদ্ধা হিসেবে মুসলিম আমিরদের সেবায় নিয়োজিত হয়।
তুর্কি নও-মুসলিমরা ছিলেন চতুর, সাহসী ও দক্ষ যোদ্ধা। মুসলিম শাসকদের অনেকেই খুব কম সময়েই তাদের এইসব দক্ষতার কথা জানতে পেরেছিলেন। ফলে তারা যখন নিজ সেনাদের বিশ্বাস করতে পারতেন না তখন তারা এই তুর্কি দাস সেনাদের ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে এই তুর্কি দাস ও তাদের ছেলেদেরকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে ব্যবহার করতেন মুসলিম শাসকরা। আর তারাও আনুগত্য ও সামরিক দক্ষতা দেখিয়ে সমাজের উচ্চস্তরে নিজেদের জন্য স্থান করে নেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত সম্রাট বা বাদশাহ হতেও সক্ষম হন।
তুর্কি গোলাম সেনারা উচ্চতর সামরিক পদ পাওয়ার পর থেকে শাসকদের খুব একটা অনুগত থাকেনি। বরং তারা শাসকদের নানা কাজে হস্তক্ষেপ ও এমনকি শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করতে থাকে বা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করার কাজে প্রকাশ্যেই প্রভাব খাটাতে থাকে।
তুর্কি গোলামদেরকে প্রথমবারের মত ব্যবহার করে আব্বাসিয় খলিফা মো’তাসিম। অবশ্য এর আগেও ইরানি শাহজাদারা ও ট্রান্স-অক্সিয়ানা বা মধ্য-এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের মুসলিম শাসকরা যুদ্ধবাজ তুর্কি গোলামদেরকে ভাড়াটে সেনা এবং সীমান্ত-রক্ষী হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে ‘কেমব্রিজ হিস্টোরি অফ ইরান’ বইয়ে দাবি করা হয়েছে। এরপর সামানীয় ও সাফারি ইরানি শাসকরাও তুর্কি গোলামদেরকে ব্যক্তিগত গার্ড বাহিনীর সদস্য হিসেবে ব্যবহারের ধারা বজায় রাখেন। সম্রাট সুলতান মাহমুদ গজনভির বাবা সাবুক্তাগিন ছিলেন সামানিয় রাজ-দরবারের গোলাম। তিনি নিজ দক্ষতা ও যোগ্যতার বলে খোরাসানের প্রধান সেনাপতির পদে উন্নীত হয়েছিলেন। এভাবে ইরানে তুর্কি শাসনের সূচনা হয়।
গজনভিরা ইরানি সংস্কৃতির প্রভাব-বলয়ভুক্ত অঞ্চলে প্রাচীন ইরানি সাম্রাজ্যের মতই বিশাল এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এই দাস-বংশ নিজেদের জন্য ইরানি পরিচিতি অর্জন করতে চেয়েছিল। ইরানের অনেক পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ বা গুণীরা এই তুর্কি দ্বিগ্বিজয়ীদের সফরসঙ্গী হয়ে ইরান থেকে বহু দূরবর্তী নানা অঞ্চল সফর করেছেন। আবু রায়হান বিরুনি ছিলেন এমনই একজন ইরানি মনীষী। ‘তাহকিকে মিলালে হিন্দ’ শীর্ষক তার গবেষণামূলক বইটি ছিল এইসব সফরেরই ফসল।
গজনভিদের শাসনামলের শেষের দিক পর্যন্ত খলিফা ও ইরানি শাসকদের দরবারে উচ্চতর রাজনৈতিক এবং সামরিক পদে আসীন ছিল তুর্কি দাসরা। তাদের উঁচু পদ ও বাদশাহি লাভের ঘটনাগুলো কোনো সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার ফল ছিল না। বরং ব্যক্তিগত চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমেই তারা এইসব পদ অর্জন করেন। তাদের উন্নতির এই প্রক্রিয়ার সময় তারা নিজেদের মূল বা আসল গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন এবং ফার্সি ভাষা আর ইসলামী-ইরানি সংস্কৃতিকে বরণ করে নিতেন। যেমন, সুলতান মাহমুদ গজনভি নিজেই ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। গজনভি শাসকদের ওপর নিজ গোত্রের কোনো কর্তৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং বন্ধন ছিল না। ফলে তারা ইরানি শাসকদের মতই জীবন-যাপন করতেন। সুলতান মাহমুদ নিজেকে ইরানি বলে দেখানোর জন্য একটি জাল বংশ-তালিকাও বানিয়েছিলেন।
এরপর ইরানে শুরু হয় তুর্কি জাতিগুলোর সংঘবদ্ধ হামলা। সালজুক তুর্কিরাসহ অন্যান্য তুর্কি জাতিগুলো তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। ফলে তাদের দিক থেকে বিপদের কথা কেউ আর ভাবতো না।কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে সালজুক তুর্কিরা ট্রান্স-অক্সিয়ানা ও খাওয়ারেজমের সমৃদ্ধতর অঞ্চলগুলোতে চাপ ও হামলা বাড়িয়ে দেয়। এইসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল ইরানি সংস্কৃতি। সালজুকদের ক্রমবর্ধমান হামলার পরিণতিতে দুর্বল হয়ে পড়া গজনভিরা হেরে যায়। ফলে সালজুক সুলতান মাসউদ হন ইরান অঞ্চলের নতুন শাসক।#
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২