পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (সপ্তম পর্ব)
গত কয়েক পর্বের আলোচনায় আমরা ইরানিদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ পরবর্তী যুগে ইরানি সংস্কৃতির প্রভাব এবং এ অঞ্চলে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে তুর্কি শাসকরা ইরানি সম্রাটদের মতোই আচরণ করতেন এবং এমনকি তারা তুর্কি হওয়ার সত্ত্বেও নিজেদের ইরানি বলেই পরিচয় দিতেন।
সালজুক তুর্কম্যান মুসলমানরা প্রথম দিকে তাদের পশুর জন্য খাদ্যের অভাব দূর করতে ও উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য ইরানে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু পরে তারা নানাভাবে শক্তি সঞ্চয় করে ও প্রভাব খাটিয়ে খাওয়ারিজম ও ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চলসহ তৎকালীন বিশাল ইরানি সাম্রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে।
গজনভিদের শাসনামলের শেষের দিক পর্যন্ত খলিফা ও ইরানি শাসকদের দরবারে উচ্চতর রাজনৈতিক এবং সামরিক পদে আসীন ছিলেন তুর্কি দাসরা। তাদের উঁচু পদ ও বাদশাহি লাভের ঘটনাগুলো কোনো সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার ফল ছিল না। বরং ব্যক্তিগত চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমেই তারা এইসব পদ অর্জন করেন। তাদের উন্নতির এই প্রক্রিয়ার সময় তারা নিজেদের মূল বা আসল গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন এবং ফার্সি ভাষা আর ইসলামী-ইরানি সংস্কৃতিকে বরণ করে নিতেন।
তুর্কি গজনভিদের দুর্বলতার সুযোগে তুর্কি সালজুকরা শক্তিশালী হতে থাকে এবং এরপর তারা খাওয়ারেজম ও ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চলে বার বার হামলা চালিয়ে এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। অবশেষে তারা গজনভিদের পরাজিত করে বিশাল-বিস্তৃত ইরান অঞ্চলের শাসকে পরিণত হয়।
সালজুক তুর্কম্যানরা ক্ষমতা গ্রহণের পরও মন্ত্রী ও গভর্নরসহ দেশের বেশিরভাগ উঁচু পদে ইরানিদের নিয়োগ বহাল রাখে। সালজুকরা তাদের নিজস্ব গোত্রগুলোকে ইরানের সমৃদ্ধ অঞ্চলে লুট-পাট চালানো থেকেও বিরত রাখে। এই গোত্রগুলোর লোকদেরকে একই অঞ্চলে থাকতেও বাধা দেয় সালজুকরা। কিন্তু তাদের অনেকেই শহর ও গ্রামে বসবাসের মত সামাজিক জীবনে অভ্যস্ত হতে পারেনি। তাই এরা যাতে ইরান অঞ্চলে কোনো অঘটন না ঘটায় সে জন্য সালজুক শাসকরা এশিয়া মাইনর ও বাইজান্টাইন অঞ্চলের অমুসলিমদের সঙ্গে জিহাদের কাজে এদেরকে ব্যস্ত রাখেন। আর এই জিহাদের কার্যক্রম ট্রান্স-অক্সিয়ানার সীমানা ও এশিয়া মাইনরের সীমানার বাইরে ভারতের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল, এশিয়া মাইনর ও ট্রান্স-অক্সিয়ানার বেশির ভাগ তুর্কি জাতিগুলো ততদিনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে পড়েছিল।
সালজুক তুর্কম্যানরা ধীরে ধীরে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ অঞ্চলই দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কেবল কনস্টান্টিনোপল তথা বর্তমান যুগের ইস্তাম্বুল ও তার আশপাশের কিছু অঞ্চলে সীমিত হয়ে পড়ে। তুর্কম্যানরা সালজুক ও খাওয়ারেজমের শাসকদের পতনের পরও এশিয়া মাইনর অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই তুর্কম্যানরা নিজেদেরকে (তুরস্কের রুম অঞ্চলের) রুমি-সালজুক বলে উল্লেখ করতো। ওসমানি বা অটোম্যান তুর্কিদের শাসনের আগ পর্যন্ত তারা তাদের ওই স্বাধীন রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
রুমি সালজুকরাও ইরানের সালজুকদের মতই ইরানি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের দরবারি ভাষাও ছিল ফার্সি। এমনকি তাদের সম্রাটরাও ফার্সি নাম বেছে নিয়েছিলেন নিজেদের জন্য। যেমন, তাদের একজন সম্রাটের নাম ছিল আলাউদ্দিন কায়কোবাদ।
হিজরি পঞ্চম শতকের পর থেকে ইরানি রাজ্য ও রাষ্ট্রগুলো একের পর এক বিলুপ্ত হতে থাকে। সেই থেকে আধুনিক যুগের শাহের শাসনামল পর্যন্ত ইরানে সব সময়ই সামরিক কর্তৃত্ব ছিল তুর্কি সুলতানদের হাতে। ইরানিরা তুর্কিদের হাতে তরবারি দিয়ে নিজেদের হাতে তখনও কলম ধরে রাখে।
এভাবে সালজুকদের পর থেকে বিশ্বের সভ্য অঞ্চলে তথা ভারত থেকে শুরু করে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত অঞ্চল শাসন করেছে তুর্কিরা। প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত টিকেছিল তাদের শাসন। কিন্তু এ সময়ও তাদের রাষ্ট্রের সব অঞ্চলেই প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উঁচু পদগুলোতে আসীন ছিল ইরানিরাই। যদিও সালজুকদের পর ইসলামী-ইরানি সাম্রাজ্যের মত বিশাল কোনো সাম্রাজ্য আর কখনও গড়ে ওঠেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তুর্কি শাসনাধীন যেসব ছোটো ছোটো সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল সেইসব সাম্রাজ্যের তুর্কি শাসকরাও ইরানি সংস্কৃতি ও ফার্সি ভাষাকেই গ্রহণ করেছিলেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে মিশরের মামালিক সাম্রাজ্য, ইরান অঞ্চলে ইলখানানদের সাম্রাজ্য, ভারতে মোগোলদের সাম্রাজ্য ও রুমি-সালজুকদের সাম্রাজ্যের কথা উল্লেখ করা যায়। সে সময় ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতি আফ্রিকা ও ইউরোপ এবং চীনের গভীর অঞ্চল ছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তুর্কি সালজুকরা ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে এতোদূর এগিয়ে গিয়েছিল যে তারা ইরানের সিংহ ও সূর্যকে তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
ইরানি সংস্কৃতি ও ভাষার ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ফার্সি ভাষা ভারত থেকে শুরু করে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত বিশাল অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় বা দরবারি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছিল। তুর্কিদের শাসনের এই যুগেই ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতির এই গভীর প্রভাব দেখা গেছে যা অতীতে আর কখনও দেখা যায়নি। এমনকি সাসানি ও হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের যুগেও প্রাচীন ফার্সি ভাষা এতোটা ছড়ায়নি। এতে বোঝা গেল যে সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়াও সংস্কৃতির প্রভাব ছড়িয়ে দেয়া যায়। বিশ্বের যেসব অঞ্চলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটানো সম্ভব সেইসব অঞ্চলেই ইরানি ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। হিজরি অষ্টম শতকের পর্যটক ইবনে বতুতা যেসব শহরে সফর করেছিলেন সেই সব শহরেরই গুরুত্বপূর্ণ পদ ও সাংস্কৃতিক আসনগুলো ছিল ইরানিদের দখলে। ইবনে বতুতার সফরের পরিধি ছিল মার্কোপোলোর সফরের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত।
খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবনে বতুতার সফর-নামা পড়লে দেখা যায় তিনি যেইসব গুরুত্বপূর্ণ শহরেই গেছেন সেখানেই বিখ্যাত ইরানি ব্যবসায়ী, ফকিহ, আলেম, সুফি, শিক্ষক, নাবিক, রাজনীতিবিদ ও আরেফের উপস্থিতি দেখা গেছে। তাদের নামের প্রথম অংশে ইরানি পরিচিতি না থাকলেও নামের শেষাংশে ইস্ফাহানি, সমরকন্দি, খাওয়ারেজমি, তাবারেস্তানি বা খোরাসানি থেকে ইরানি পরিচিতি ঠিকই ফুটে ওঠে। ইরানিরা খ্রিস্টিয় সপ্তম থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত কেনিয়া, আবিসিনিয়া, মধ্য আফ্রিকা ও তাঞ্জানিয়ার মত আফ্রিকান দেশগুলোতে উপস্থিত থেকে ইরানি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ অঞ্চলে এমন কিছু শহরের কথা জানা যায় যেসব শহর এখন থেকে ৩০০ বছর আগেও ইরানিদের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ছিল।
মোঙ্গলরাই ছিল প্রথম অ-ইরানি জাতি যারা ইরান অঞ্চলে হামলা চালিয়েছিল কেবল লুটপাট ও ইরানি সভ্যতা-সংস্কৃতিকে ধ্বংসের জন্য। মোঙ্গলরা প্রথম দফায় ইরানে ব্যাপক হামলা, গণহত্যা ও লুটপাটের পর মঙ্গোলিয়ায় ফিরে যায়। এর আগের আগ্রাসী জাতিগুলো ইরানে থেকে যাওয়া বা স্থায়ী দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য হামলা চালিয়েছিল। এইসব জাতি ইরান জয়ের কিছুকাল পরই ইরানি সংস্কৃতি ও সভ্যতা গ্রহণ করতো।
মঙ্গোলদের প্রথমবারের প্রবল আগ্রাসনে ইরানের বস্তুগত সম্পদ ছাড়াও সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিধ্বস্ত হয়। ওই আগ্রাসনের ধাক্কায় বিধ্বস্ত ইরানি সভ্যতা আর কখনও তার কোমর সোজা করতে পারেনি। এরপর ইরান অঞ্চলে দ্বিতীয় দফায় আগ্রাসন চালায় মোঙ্গল রাজা হালাকু খান। পুরো ইরান দখল করা ছিল তার উদ্দেশ্য। এ পর্যায়ে তুর্কি মঙ্গোলরা স্থায়ীভাবে ইরানে থেকে যায়। প্রথম থেকেই তারা কোনো কোনো ইরানি কর্মকর্তা ও ইরানি পরিবারকে মন্ত্রীসহ নানা উঁচু পদে নিয়োগ দেয়। এ যুগে মোঙ্গলের মাধ্যমে ইরানি সংস্কৃতি চীনেও ঢুকে পড়ে। ইরানিরা ঢুকে পড়ে চীনে। #
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১৪