‘রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক’
বাংলাদেশের সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যে বিরোধীতা দেশের মানুষ করছে তা যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক। এমন মন্তব্য করেছেন বাংলা ম্যাগাজিন সাপ্তাহিকের সম্পাদক গোলাম মোর্তজা। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরিবেশ দূষণ হবে তবে তার পরিমাণ শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ কম হতে পারে।
গোলাম মোর্তাজা বলেন, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের যে কাজ চলছে তা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। ভারতীয় কোম্পানীর সাথে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যে চুক্তি হয়েছে তা স্থগিত করা উচিত। তবে দু’দেশের তত্ত্বাবধানে বিষয়টি যাচাই করে এমন একটি জায়গা নির্বাচন করা উচিত যেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যায়।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ অংশীদারিত্বে রামপালে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ চুক্তিকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কেন এই বিরোধিতা? সম্ভাব্য যেসব আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেয়া হচ্ছে তা আসলে কতটা বাস্তব?
গোলাম মোর্তজা: ভারতের একটি কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে সেই চুক্তির সময় থেকেই যে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে বিরোধীতা দেশের মানুষের বিষয়টি আসলে তা নয়; চুক্তির আগ থেকেই বাংলাদেশের মানুষের বিরোধীতা ছিল। আর সেই বিরোধীতা থাকার খুব যুক্তিসঙ্গত কারণও ছিল।
সুন্দরবন হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট যেটি বাংলাদেশের আছে। প্রকৃতির একটা অকৃত্তিম উপহার বাংলাদেশের জন্য এই সুন্দরবন। আর যেকোনো বনেরই যত্ন নেয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে কোনো কিছুরই যত্ন নেয়া হয় না। বাংলাদেশ তার প্রকৃতির যত্ন নেয় না; এখানে শুধু ধ্বংসই হয়।
২০০ শ বছর আগে সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় সতের হাজার কিলোমিটার। অথচ সেই সুন্দরবনের আয়তন কমতে কমতে এখন হয়েছে ১০ হাজার কিলোমিটার। তারমধ্যে ছয় হাজার কিলোমিটার বাংলাদেশের মধ্যে আর বাকি ৪ হাজার কিলোমিটার ভারতের ভেতরে। সুন্দরবনের রক্ষণাবেক্ষণ বা এই বনকে টিকিয়ে রাখার জন্য যখন আমাদের জরুরি ব্যবস্থা নেয়া দরকার ঠিক তখন সুন্দরবনের কাছাকাছি রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। আর পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যতরকম আধুনিক প্রযুক্তি আছে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ হয়। তবে সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূষণের পরিমাণ শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ কম হতে পারে। আর এই হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ও পুরনো প্রযুক্তির মধ্যে পার্থক্য।
তো রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে সেটি ব্যবহার করলেও ভয়াবহ দূষণ হবে। আর সেই দূষণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে। যেহেতু সুন্দরবনের ক্ষতি হবে এবং অস্তিত্ব সংকটে পড়বে সে কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধীতা করছে বাংলাদেশের মানুষ। আর সেটি খুবই যৌক্তিক কারণে। আমি আবারও বলছি আজ পৃথিবীতে এমন কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হয় নি যার মাধ্যমে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে কিন্তু পরিবেশ দূষণ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ,জাপান, জার্মানি, জাপান বা ইউরোপের যাদের কথাই বলুন না কেন সব দেশের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। মূলত এই কারণেই বিরোধীতা আর পুরোটাই বৈজ্ঞানিক কারণ সম্মতভাবেই বিরোধীতা।
রেডিও তেহরান: দেশে দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য সরকার রামপাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। রামপাল প্রকল্প বাতিল করা হলে বাংলাদেশ কী বিদ্যুত খাতে আরো পিছিয়ে যাবে না।?
গোলাম মোর্তজা: দেখুন, রামপালই একমাত্র জায়গা না যেখানেই কেবল বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যাবে- অন্য কোথাও না! বাংলাদেশে আরো অনেক জায়গা আছে। আসলে এখানে সমস্যাটা অন্য জায়গায়। বাংলাদেশ ছোট জায়গা কিন্তু জনসংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কারণে যে বিষয়টি সামনে আসে সেটি হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি জায়গা লাগে। আর যখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে গেলে জনমানুষের পক্ষ থেকে একধরনের বাধা আসবে এবং একধরনের আন্দোলন হবে। তবে অন্য যেকোনো জায়গায় সেটা মাথার বাড়ি কিম্বা বাঁশখালি যেখানেই করা হোক না কেন সেখানকার মানুষ আন্দোলন করবে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তবে সেখানকার মানুষের সাথে আলোচনা করে তাদেরকে আস্থায় নিয়ে যদি তাদেরকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় তাহলে হয়তো তারা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মেনে নেবে।
তবে আপনার প্রশ্নের পরিস্কার উত্তর হচ্ছে- রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প যদি বাতিল করা হয়, বাতিল করার অর্থ এই নয় যে আর কোথায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না! বাতিল করার অর্থ হচ্ছে রামপাল থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সরিয়ে অন্য যে কোনো জায়গায় নেয়া হোক। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি হবে বা এধরনের বিষয় ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সরকার বা যারা এধরনের কথা বলছে তারা আসলে মানুষকে একধরনের ব্লাকমেইল করার মতো মানসিকতা নিয়ে কাজ করছে। এটা একেবারেই সঠিক সংবাদ নয় যে এই প্রকল্পটি বাতিল করলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট হবে। দেশের উন্নয়ন লাগবে, শিল্প কলকারখানা লাগবে তারজন্য বিদ্যুৎও লাগবে। সুতরাং বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে কিন্তু কুযুক্তি দিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে গিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয় থেকে সরে আসতে হবে বা ফিরে আসা উচিত।
রেডিও তেহরান: বলা হচ্ছে রামপাল বিদ্যুত প্রকল্পের কারণে সুন্দরবন তার অস্তিত্ব হারাবে। কিন্তু সরকার বার বার বলছে এ প্রকল্প জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে না। আমাদেরও প্রশ্ন- যদি এ প্রকল্প দেশের জন্য ক্ষতিকর হতো তবে সরকার কী তা বাস্তবায়ন করতে চাইত? আর সুন্দরবেনর ক্ষতির বিষয়টি কতটা বিজ্ঞানভিত্তিক?
গোলাম মোর্তজা: দেখুন, এটা কোনো ধর্মের ব্যাপার না যে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। এ বিষয়টি বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ এবং যুক্তির বিষয়। এখন রামপালে সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে- এতে সরকার দেশের ক্ষতি করবে কিনা; এটি একদমই কোনো গ্রহণযোগ্য বক্তব্য নয়। অতীতেও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং যেসব সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে তারা বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী অসংখ্য চুক্তি করেছে। যার কারণে আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। সুতরাং আমাদের সরকারগুলো সব নিয়ম-নীতি আইন কানুন মেনে কাজ করেন বা চুক্তি করেন এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। এসব কারণে যেহেতু সরকার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না আর তথ্য না দিতে পারার কারণে সরকার একটা প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছে যে আমরা কি দেশের ক্ষতি চাই; আমরা তো দেশের উন্নয়নের চেষ্টা করছি। সরকারের এসব কথার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রামপালে করেন আর যেখানেই করেন তাতে ক্ষতি হবে। তবে অন্য জায়গার ক্ষতিটা আমরা মেনে নিতে রাজি আছি কিন্তু সুন্দরবনের ক্ষতিটা মেনে নিতে রাজি নই। কারণ হচ্ছে অন্য জায়গায় তো সুন্দরবন নেই; রামপালে আছে সুন্দরবন। আর সেকারণেই মানুষের বিরোধীতা। ফলে অন্য কোথাও এই বিদ্যুৎ প্রকল্প করলে সেই অর্থে তেমন কোনো সমস্যা নেই।
রেডিও তেহরান: রামপালের যে জায়গায় বিদ্যুতকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা চলছে তার বিকল্প কী হতে পারত? এ নিয়ে আন্দোলনকারীদের কী কোনো বক্তব্য আছে?
গোলাম মোর্তজা: দেখুন, এটিও আরেকটি খুবই অযৌক্তিক প্রশ্ন এবং অযাচিত বক্তব্য যে আন্দোলনকারীরা তাহলে বলুক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কোথায় হবে। কোথায় হবে সেটা বলা আন্দোলনকারীদের কাজ নয়, এটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার ব্যাপার। বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে তথ্য প্রযুক্তি দিয়ে দেখতে হবে যে বাংলাদেশের সম্ভাব্য কোন জায়গাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে পারে। সেটি সরকারকে এবং বিদ্যুৎ বিভাগকে খুঁজে বের করতে হবে। এই খুঁজে বের করার কাজটি আন্দোলনকারীদের নয়। সরকার এই বক্তব্য দিয়ে একধরনের অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। কালকে যদি আন্দোলনকারীরা বলে যে ঢাকা শহরের গুলশান লেকের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রকল্প বানান তাহলে কি সরকার রাজি হবে! এইসমস্ত একেবারেই অযৌক্তিক কথা। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। এসব বক্তব্য একেবারেই আসা উচিত নয়। সরকার রামপাল খুঁজে বের করেছিল কিন্তু সেখানে যেহেতু যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক কারণে প্রতিবাদ হয়েছে ফলে সরকারকেই আবার খুঁজে বের করতে হবে আর কোথায় করা যায়। যেমন সরকার খুঁজে বের করেছে মাথারবাড়িতে একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প করবে। এভাবে সরকার আরো জায়গা খুঁজে বের করবে এটা সরকারের দায়িত্ব।
রেডিও তেহরান: জনাব গোলাম মোতর্জা, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে সর্বশেষ আপনি কি বলবেন?
গোলাম মোর্তজা: রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের যে কাজ চলছে তা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। ভারতীয় কোম্পানীর সাথে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যে চুক্তি হয়েছে তা স্থগিত করা উচিত। তবে দু’দেশের তত্ত্বাবধানে বিষয়টি যাচাই করে এমন একটি জায়গা নির্বাচন করা উচিত যেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যায়।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৪