আগস্ট ২৪, ২০১৬ ১১:০০ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে যে গলদ রয়েছে এবং মানে যে ধস নেমেছে সেটা আমাদের স্বীকার করে নেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আরে বলেন, কোনো সমস্যাকে স্বীকার না করলে সমাধান পাওয়া যায় না।

এবারের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল বিষয়ে তিনি বলেন, ছাত্রছাত্রীরা বেশী পাস করলে সেটা খুবই আনন্দের বিষয়। কিন্তু দেশের শিক্ষার মান নিয়ে শিক্ষাবিদদের মাঝে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তবে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ও শিক্ষার মান সম্পর্কে আরো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। আশার দিক হচ্ছে- গত বছরের চেয়ে এবার পাসের হার ৫.১ ভাগ বেশি। কীভাবে দেখছেন পাসের এ হারকে?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ:  দেখুন, ছাত্রছাত্রীরা যদি সঠিকভা এবং ভালোভাবে পাস করে তাহলে নিঃসন্দেহে তা খুবই আনন্দের বিষয়। কিন্তু সারাদেশে শিক্ষাবিদদের পক্ষ থেকে দেশের শিক্ষার মান নিয়ে  প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষার মান যে ক্রমেই নেমে আসছে সে ব্যাপারে সবাই কিন্তু একমত। এছাড়া আরো একটি প্রশ্ন উঠছে সেটি হচ্ছে যেসব ফলাফল প্রকাশিত হয় এবং সেই ফলাফলের পেছনে যেসব পরীক্ষা থাকে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

এমনও বলা হচ্ছে অনেক সময় কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দেয় বেশি করে নাম্বার দেয়ার জন্য। আর এসব প্রশ্নের যদি স্বচ্ছ কোনো সমাধান না হয় তাহলে নিছক পাসের হার বেশি হয়েছে বলে আমরা কতটা পরিতৃপ্তবোধ করতে পারি, কতটা আশ্বস্ত বোধ করতে পারি! একইসাথে এই পরিস্থিতিতে আমরা কিভাবে জাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে আশাবাদী হতে পারি তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

রেডিও তেহরান: আপনার নিশ্চয় খেয়াল আছে- বেশ কয়েক বছর পাসের হার শতকরা ৯০ ভাগ ছাড়িয়েছিল কিন্তু গত বছর দুই/তিন পাসের হার কিছুটা কমেছে। এর কারণ কী?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ:  দেখুন, পাসের হার নিয়ে সম্ভবত ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। তাছাড়া পরীক্ষার প্রক্রিয়া, নম্বর দেয়া সম্পর্কেও নানারকম সমালোচনা হয়েছে। এসব কারণে হয়তো পরীক্ষকরা বা শিক্ষার সাথে যারা জড়িত আছেন তারা কিছুটা রক্ষণশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। আর সে কারণে হয়তো পাসের হার কিছুটা কম দেখছি।             

রেডিও তেহরান: এবারের ফলাফলেও দেখা যাচ্ছে- দেশের ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারে নি। এরই বা কারণ কী? বিষয়টি কী খুব স্বাভাবিক?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন, দেশের ২৫ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীর পাস করতে না পারার বিষয়টি মোটেই স্বাভাবিক নয়। আসলে পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে যেটা হওয়া উচিত সেটা হচ্ছে- সাধারণভাবে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী মাঝারি ধরনের ফলাফল করবেন। পরিসংখ্যনবিদরা বলেন, মাঝারি ফলাফলে শতকরা পরিমাণ হচ্ছে ৩৫ ভাগ। খুব ভালো ফল করবেন শতকরা বড়জোর ৩ ভাগ। আর খুব খারাপ ফলাফল করবে শতকরা বড়জোর ৩ ভাগ।এই যে বিন্যাসের কথা ধরা হয় সেটা সাধারণভাবে আমাদের দেশের কোনো পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। এই যে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একেবারেই পাস করল না- কেন পাস করল না তার একটা অনুসন্ধান হওয়া উচিত।

আমরা জানি পৃথিবীর সভ্য দেশগুলোর সমাজে যখন কোনো অকল্পনীয় বা অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে তখন সেসব বিষয় নিয়ে তদন্ত ও গবেষণা করা হয় এবং জানার চেষ্টা করা হয়। খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় আসলে ক্রটিটা কোথায়? কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

এই যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একেবারেই কেউ পাস করতে পারেনি- কেন পারেনি তা খুঁজে বের করতে হবে। তবে কেন পাস করতে পারেনি তা নিয়ে অনুমান নির্ভর কিছু কথা বলতে পারি। যেমন-ওইসব জায়গায় হয়তো শিক্ষক নেই, হয়তো ক্লাস হয়নি। এমনও হতে পারে ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন জায়গায় অবস্থিত-যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম বা হাওড় অঞ্চল যেখানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। এসব কারণে ফলাফল খারাপ হতে পারে। কিন্তু আসল কারণটা কি সেটা নিয়ে অবজেকটিভ বা বস্তুনিষ্ট পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। আর তাহলেই আমরা সামনের দিকে এগোতে পারব।

রেডিও তেহরান: সরকার দাবি করছে- দেশে শিক্ষার মান বেড়েছে। তবে অনেকে আজকালের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নানা সমালোচনা করে থাকেন। আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের শিক্ষার মান কেমন?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ:  দেখুন আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সব সময় যারা ক্ষমতায় থাকে তারা দাবি করে যে তাদের সব কাজে সাফল্য এসেছে। সমস্ত কাজ তারা সুচারুভাবে সম্পন্ন করছে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে। যারা ক্ষমতায় থাকেন এটা তাদের একটা দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছুই বুঝতে পারে এবং উপলব্ধি করতে পারে। ফলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মানের যে ধস নেমেছে সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণের খুব একটা সুযোগ নেই। কারণ এত শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায় কিংবা গোল্ডেন জিপিএ পায় অথচ তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে পারে না। এবার আমি দেখলাম একটি মেয়ে বলছে এত ভালো ফলাফল করার পরও যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারি সুযোগ না পাই তাহলে এরচেয়ে দুঃখের কিছু থাকতে পারে না। কাজেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে যে গলদ রয়েছে এবং মানে যে ধস নেমেছে সেটা আমাদের স্বীকার করে নেয়া উচিত। কোনো সমস্যাকে স্বীকার না করলে সমাধান  পাওয়া যায় না।

রেডিও তেহরান: শিক্ষার মানকে বাড়ানোর জন্য আসলে সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো কী কী করা যায়?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন, আমাদের স্কুল কলেজের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বেড়েছে। অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে সবকিছুরই বিকাশ হয়েছে। আমরা এটাও জানি যখন কোনো কিছু সংখ্যাগত দিক থেকে বিকশিত হয় তখন গুণগত মানে একটা টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। সেজন্য আমার যেটা মনে হয় আজকের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা সেটা প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যোগ্য শিক্ষকের যথেস্ট অভাব রয়েছে। আর যারা মেধাবী তারা শিক্ষার দিকে খুব একটা আকৃষ্ট হচ্ছে না। অবশ্য এরজন্য নানারকম কারণ চিহ্নিত করা হয়। একসময় শিক্ষকতা ছিল একটা নিষ্ঠার পেশা। এখন বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ভোগবাদের প্রভাবে সমাজে এমন একটা উথাল-পাথাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে পুরাতন মূল্যবোধগুলো ধরে রাখা যাচ্ছে না। বর্তমানে সাধনা, চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মূল্য ও স্বীকৃতি কমে গেছে। পাশাপাশি অর্থের উপাসনা বেড়ে গেছে।

একসময় আমরা আমাদের শিক্ষকদের দেখেছি তারা খুব ভালো বেতন না পেলেও ছাত্ররা কতটা শিখছে-জানছে সে বিষয়টি তারা  অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে দেখতেন। তারা ক্লাসে সেভাবেই পড়াতেন। তবে আজকাল সম্ভবত এ ব্যাপারে যথেস্ট বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে। আমার মনে হয় বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষার মান সম্পর্কে আরো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৪