আগস্ট ২৪, ২০১৬ ১৪:৩৫ Asia/Dhaka

ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতি বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। গত কয়েক পর্বের আলোচনায় আমরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানি ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার কিছু পটভূমি তুলে ধরেছি। আজও আমরা এ বিষয়ে, বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফার্সি ভাষা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব।

মঙ্গোলদের প্রথমবারের প্রবল আগ্রাসনে ইরানের বস্তুগত সম্পদ ছাড়াও সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিপর্যস্ত হয়। ওই বিপর্যস্ত ইরানি সভ্যতা আর কখনও তার কোমর সোজা করতে পারেনি। এরপর ইরান অঞ্চলে দ্বিতীয় দফায় আগ্রাসন চালায় মোঙ্গল রাজা হালাকু খান। পুরো ইরান দখল করা ছিল তার উদ্দেশ্য। এ পর্যায়ে  তুর্কি মঙ্গোলরা স্থায়ীভাবে ইরানে থেকে যায়। প্রথম থেকেই তারা কোনো কোনো ইরানি কর্মকর্তা ও ইরানি পরিবারকে মন্ত্রীসহ নানা উঁচু পদে বহাল রাখে। এ যুগে ইরানি বিশেষজ্ঞরা চীনে প্রবেশ করে এবং চীনে এই ইরানি ও এমনকি মোঙ্গলদের মাধ্যমেও ইরানি সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে। ইলখানদের রাজদরবারের ইরানি কর্মকর্তারাও এই মঙ্গোল তুর্কিদের ইরানি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে ফেলে। বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা যায় ইরানিরাই চীনে সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচার করেন এবং সেখানে ফার্সি ভাষাও চালু করেন।

ফরাসি অধ্যাপক শেফারের মতে, চীনের বেশিরভাগ মুসলমানরাই ইরানি বংশোদ্ভুত। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সংখ্যক ইরানি সেনা-কর্মকর্তা, শিক্ষক ও আলেমের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক মার্কোপোলো। 

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানি সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সামরিক বিজয় ছাড়াও ইরানি সুফি সাধকদের অবদানও কম নয়। ইরানের বেশিরভাগ সুফি সাধকরাই মারা গেছেন ভিন দেশে। ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারেও ব্যাপক অবদান রেখেছেন ইরানি সুফিরা। ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সুফিদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। ইরানি আলেম ও শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা ও চিন্তাগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনে বহু দূরের দেশে যেতেন। তাবারি, ফারাবি ও ইবনে সিনার মতো জগৎ-বিখ্যাত মহান ইরানি মনীষীরা জ্ঞান অর্জনের জন্য জন্মভূমি ছেড়ে বহু দূরের শহরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

যাই হোক, এবার আমরা বিশ্বে ফার্সি ভাষা ছড়িয়ে পড়ার পটভূমি নিয়ে কিছু কথা বলবো। ইরানি সংস্কৃতির মতো ফার্সি ভাষাও সহিষ্ণু ও পরিবর্তশীল ভাষা হিসেবে বিকশিত হয়েছে গত কয়েক হাজার বছরে। প্রাচীন ফার্সি ভাষা তথা আবেস্তা ও পাহলভী ভাষার সঙ্গে বর্তমান ফার্সির তেমন কোনো মিল নেই। তবুও ফার্সি ভাষা আজও ইরানি সংস্কৃতির পরিচয় ধারণ করছে।  ইরানিদের সংস্কৃতির মতোই উদার ও সহনশীল ফার্সি ভাষাও যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন  সংস্কৃতি আর ভাষার সংস্পর্শে সাংস্কৃতিক লেনদেনের মতই। ইরানি জাতিগুলোর যুদ্ধ ও শান্তির সময় এইসব পরিবর্তন ঘটলেও ফার্সির মূল পরিচিতি এবং ঐতিহ্য কখনও ক্ষুণ্ন হয়নি। ফার্সি ভাষার কাঠামো ও শব্দসহ নানা দিকের পরিবর্তন এই ভাষার কোনো ক্ষতি করেনি, বরং এই ভাষাকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। বিদেশি নানা শব্দকে উদার-চিত্তে গ্রহণ করায় ফার্সি ভাষা মধ্যযুগেই বিশ্বের এক বিশাল অঞ্চলের জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষায় রূপান্তরিত হয়।

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের সদস্য ফার্সির অনেক শব্দ তিন হাজার বছরের চেয়েও বেশি পুরোনো। ভারতীয় জাতিগুলোসহ আর্য জাতিগুলোর ভাষায় এখনও ফার্সি শব্দের সমার্থক ও সমোচ্চারিত অভিন্ন বহু শব্দ দেখা যায়। যেমন,  পেদার (পিতা, ফাদার), মদার, বারোদার (ভ্রাতা), দোখতার (ডটার), লাব (লিপ বা ঠোঁট), আবরু (ভ্রু), গরি (ঘোড়ার গাড়ি), অব (পানি) ইত্যাদি। ভারতীয় ভাষাগুলোর মতো ফার্সি ভাষার ইন্দো-ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্য এখনও বজায় রয়েছে। তাই এ ভাষার বাক্যের প্রথমে এখনও ব্যবহৃত হয় নাম বা বিশেষ্য এবং পরে আসে ক্রিয়া। এখনও এইসব ভাষার মতোই ফার্সি ভাষার মূল শব্দগুলোয় যুক্ত হয় উপসর্গ ও অনুসর্গ এবং বচনভেদে শব্দ বা ক্রিয়ার রূপগুলোর পরিবর্তনও লক্ষ্যনীয়।  ইরানে আর্য জাতিগুলোর আগমনের পর থেকেই ইরানি ভাষাগুলোর সঙ্গে বড় বড় ভাষাগুলোর সংমিশ্রণ শুরু হয়েছিল। ইরানের প্রথম সুপরিসর সাম্রাজ্য তথা বিশাল হাখামানেশীয় সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার সময় আর্মেনিয় ভাষা ছিল মেসোপটেমিয় অঞ্চলের জাতিগুলোর ভাষা। সেই প্রাচীন যুগে এই ভাষা ছিল বিশ্বের এক বিশাল অঞ্চলের ভাষা।  হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যে নানা জাতির নানা ভাষার মধ্যে সম্পর্ক ও লেনদেন বা যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

আলেক্সান্ডারের ইরান জয়ের সুবাদে ইরানিরা গ্রিক ভাষার সংস্পর্শে আসে। এই গ্রিক নৃপতির উত্তরসুরি গ্রিক ভাষাকে আর্মেনিয় ভাষার স্থলাভিষিক্ত করেন। সেই যুগে তথা হাখামানেশীয় ও আশকানি শাসনামলে স্থানীয় পাহলভী, দারি ও প্রাচীন ফার্সি বা আবেস্তার পাশাপাশি গ্রিক ও আর্মেনিয় ভাষারও ব্যবহার ছিল। তবে ইরানিরা প্রাত্যহিক জীবনে ও পথ-ঘাট এবং বাজারে স্থানীয় ভাষাগুলোতেই কথা বলতো। সাসানি রাজবংশের যুগে সরকারি ভাষা ছিল পাহলভী। কিন্তু এর আগে বিদেশী ভাষাগুলোই ছিল ইরানের সরকারি ভাষা। হাখামানেশীয়রা বিদেশী বইগুলো অনুবাদের প্রথা চালু করেছিল। এই ধারা সাসানি যুগেও অব্যাহত ছিল। ফলে খোদ গ্রিসে যখন গ্রিস সংস্কৃতির অবনতি ঘটে তখন এই অনুবাদের সুবাদেই গ্রিক সংস্কৃতির বড় বড় অর্জনগুলো হারিয়ে যেতে পারেনি। এরপর এইসব বই ইসলামী যুগে পাহলভী থেকে আরবীতে অনূদিত হয়ে ইউরোপে পৌঁছে।।               

ইসলামী শাসনের প্রথম কয়েকটি যুগে ইরানিদের এমন কোনো পরিপক্ব ও সচল বা বহুল প্রচলিত ভাষা ছিল না যা দিয়ে তারা মুসলিম বিশ্বে সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালাতে পারতো। পাহলভি ভাষা ছিল দরবারি ও ধর্মীয় ভাষা মাত্র। এই ভাষার কথ্য ও লিখিত রূপ ছিল বেশ জটিল। ফলে তা আন্তর্জাতিক পরিসরে জনপ্রিয় হওয়ার সুযোগ ছিল না। এ অবস্থায় ইরানি বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতরা আরবী হরফে ফার্সি লেখার রীতি চালু করেন এবং এরই মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও মুসলিম বিশ্বে সাংস্কৃতিক তৎপরতা শুরু করেন।

হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের বিখ্যাত ইরানি মনীষী আবু রায়হান বিরুনির মাতৃভাষা খাওয়ারেজমি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে তথা খাওয়ারেজমে জন্ম নেয়া এই বিজ্ঞানী বলেছেন, খাওয়ারেজমি অন্যতম ইরানি ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে তুলে ধরার ক্ষমতা এই ভাষার নেই। এই ভাষায় বৈজ্ঞানিক তথ্য নথিবদ্ধ করা হবে বিস্ময়কর। তিনি খাওয়ারেজমি ছাড়াও আরবী, দারি ফার্সি, সংস্কৃত, সুরিয়ানি বা সিরিয় ভাষা ও গ্রিক ভাষা জানতেন এবং এইসব ভাষাই ব্যবহার করতেন।  

ইরানিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর বড় বড় ইসলামী শহরগুলোতে প্রথম কয়েক শতকে আরবি ও ফার্সি- এই উভয় ভাষাই প্রচলিত ছিল। এমনকি বসরা ও কুফায় ফার্সি ভাষাই ছিল বেশি প্রচলিত ।  অবশ্য এই দুই শহরের বেশিরভাগ অধিবাসীই এই দুই ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন।

ইরানিরা আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর খুব দ্রুত এই ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন ঠিক যেভাবে তারা আশকানি যুগে গ্রিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিল। আরবদের চেয়ে ইরানিদের সংস্কৃতি ছিল বেশি সমৃদ্ধ ও উন্নত। আরব সংস্কৃতি ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কথ্য ভাষা-ভিত্তিক এবং তারা কোনো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা লিখে রাখার ওপর জোর দিত না। বরং তারা যে কোনো কাহিনী বা বৃত্তান্ত মুখস্থ রাখার ওপর জোর দিত।  

লেবাননি লেখক জর্জ জিদান ‘ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস’ নামক বইয়ে লিখেছেন: ‘আরবী ভাষা ইরানিদের জন্য বিদেশী ভাষা হওয়া সত্ত্বেও তারা এই ভাষায় শিক্ষকতা করার মতো পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন এবং এমনকি আরবী ভাষার প্রথম অভিধান চালু হয়েছিল ইরানের খোরাসানে এবং আরবী নাহু বা বাক্য-প্রকরণ শাস্ত্র প্রথমবারের মতো বই আকারে প্রকাশ করেন ইরানি পণ্ডিত সিব’বেই। এ ছাড়াও পরবর্তীকালে আরবী সাহিত্য হিসেবে সুপরিচিত বেশিরভাগ রচনাই রচিত হয়েছে ইরানি পণ্ডিতদের মাধ্যমে।’

হিজরি চতুর্থ শতকের প্রখ্যাত ভূগোলবিদ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ মুকাদ্দিসি বলেছেন, তিনি মুসলিম দেশগুলো সফর করার পর দেখতে পেয়েছেন যে খোরাসানের অধিবাসীরাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ আরবী ব্যবহার করতেন। ‘কেমব্রিজের ইরানের ইতিহাস’ শীর্ষক বইয়ে বলা হয়েছে, আরবী সাহিত্যের মূল লেখক ও অনুবাদক ছিল ইরানিরাই। বেশিরভাগ লেখক ও পণ্ডিতই হলেন ইরানি।

ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শতক তথা হিজরি প্রথম শতক থেকেই আরবী ভাষার ভেতরে ফার্সি শব্দ ও ফার্সির ভেতরে আরবী শব্দের প্রবেশ ছড়িয়ে পড়েছিল। আরব কবি জাহেজ বাদশাহ হারুন আর রশিদের প্রশংসায় রচিত একটি কবিতার কথা উল্লেখ করেছেন যার প্রতিটি লাইনের ছন্দ মেলানো হয়েছিল ফার্সি শব্দ দিয়ে। ওই কবিতার কবি ছিলেন ওমানি নামের এক ব্যক্তি।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২৪