পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (পর্ব-৯)
পাঠক! গত কয়েক পর্বে আমরা বিশ্বের নানা অঞ্চলে ইরানি সংস্কৃতির প্রভাব ও ফার্সি ভাষা ছড়িয়ে পড়ার পটভূমি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। গত পর্বে আমরা ফার্সি ভাষার পরিবর্তন ও বিবর্তন নিয়েও কিছু কথা বলেছি।
আমরা এও বলেছি যে সাসানিয় যুগে ও ইসলামী যুগের প্রথম কয়েক শতকে পাহলভী ভাষা ছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় ভাষা। কিন্তু প্রাচীন এই ফার্সি ভাষা জটিল হওয়ায় তা আন্তর্জাতিক ভাষার রূপ নিতে পারেনি। ফলে ইরানিরা আরবী ভাষাকে একটি গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক ভাষায় রূপান্তরিত করে এবং এই আরবী ভাষার মাধ্যমেই বিশ্বের নানা অঞ্চলে সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালাতে থাকে। এখানেও এ বিষয়ে আলোচনার প্রয়াস পাব।
ইরানিরা আরবী ভাষাকে সাহিত্য ও জ্ঞান-চর্চার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং এই ভাষার সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে হিজরি চতুর্থ শতক পর্যন্ত আরবী ভাষার একচেটিয়া কর্তৃত্ব বজায় ছিল। তবে এরপর থেকে দারি ফার্সি নামক ফার্সি ভাষার বিবর্তিত ও সহজ রূপটি ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়। ইরানি বিশেষজ্ঞরা এই ভাষাকে নানা দিকে সমৃদ্ধ করে একে এক আন্তর্জাতিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন। ফলে আরবী ভাষার বিস্তৃতি ও ক্ষমতা ক্রমেই সীমিত হতে থাকে, বিশেষ করে ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরবীর প্রাধান্য বিলুপ্ত হয়।
ফার্সিয়ে দারি বা দারি ফার্সি ভাষাটি ছিল ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই ইরানিদের মুখের ভাষা বা কথ্য ভাষা। সাসানিয় যুগে ও ইসলামী যুগের প্রথম কয়েক শতকে পাহলভী ভাষা ছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় ভাষা। আর এই ভাষায় ও সুরিয়ানি ভাষায় চর্চা করা হতো জ্ঞান চর্চা ও ধর্ম চর্চা।আর ইসলামী যুগে শিক্ষিত মহলের প্রধান ভাষা ছিল আরবী। অর্থাৎ শিক্ষিত মহলের ও ধর্মীয় মহলের প্রধান কথ্য এবং লিখিত ভাষা ছিল আরবী।
হিজরি চতুর্থ শতক থেকে ইরানের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার পুনর্জাগরণ শুরু হয়। আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া ইরানি জাতি কথ্য দারি ফার্সি ভাষাকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ব্যবহার করতে থাকে। ক্রমেই এই ফার্সি ভাষা ইরানের পূর্বাঞ্চলে এবং মধ্য-এশিয়া অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এ অঞ্চলে প্রচলিত সুগ্বদি ও খাওয়ারেজমি ভাষাও ফার্সির কারণে কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে।
সাসানি যুগে পাহলভী ভাষা ছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় ভাষা তথা অফিস-আদালতের এবং জ্ঞান ও ধর্ম চর্চার ভাষা। কিন্তু কয়েক শতক পর ইসলামী শাসনামলে দারি ফার্সি ভাষাকে সব ক্ষেত্রেই লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। এতে ব্যবহার করা হয় আরবী বর্ণমালা। ফলে অপেক্ষাকৃত সহজতর এই ভাষাই হয়ে পড়ে ইরানের দরবার থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনসহ সব ক্ষেত্রেই ইরানি জনগণের প্রধান ভাষা।
দারি ফার্সি ভাষা প্রথম থেকেই বিদেশি শব্দ গ্রহণে ছিল উদার। আরবী বর্ণমালা গ্রহণের পর এই ভাষায় বহু আরবী শব্দ গৃহীত হয়। অবশ্য আরবী ভাষায় এইসব শব্দের বেশিরভাগই উদ্ভাবিত হয়েছিল ইরানি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমেই। ফলে শব্দগুলো সহজেই নিজের ঘরে ফিরে আসে। ইরানের নানা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর অনেক শব্দও দারি ফার্সিতে ঢুকে পড়ে। ফলে দারি ফার্সি ভাষা সহজেই আন্তর্জাতিক ভাষায় রূপান্তরিত হয়।
ইরানের ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর দিক হলো এটা যে, অনেক ইরানি রাজবংশ বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোয় প্রভাবশালী ইরানি পরিবারগুলো ইরানি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভাষা হিসেবে দারি ফার্সিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া সত্ত্বেও তারা এই ভাষাকে রাষ্ট্র-ভাষা ও আইন-আদালতের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেননি, বরং তারা আরবী ভাষা ভালোভাবে না জানা সত্ত্বেও এই ভাষাকেই রাষ্ট্র-ভাষা হিসেবে বজায় রেখেছেন। যেমন, তাহেরিয়ান ও সামানিয়ান রাজবংশ এবং ক্ষমতাধর আলে-বুয়ায়িদ ইরানি হওয়া সত্ত্বেও তারা আরবী ভাষাতেই দরবার ও আইন-আদালত করতেন এবং এ ভাষাতেই সংশ্লিষ্ট লেখালেখি করতেন।
মাসউদির লেখা ইতিহাস অনুযায়ী হিজরি চতুর্থ শতক পর্যন্ত তৎকালীন ইরানের পশ্চিমাঞ্চল তথা আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, অরান, বিলক্বান ও ককেশাসের দারবান্দ থেকে শুরু করে পূর্ব ইরানের খোরাসান ও সিস্তান অঞ্চলের ইরানিরা ফার্সি ভাষাতেই কথা বলতেন। বিখ্যাত মুসলিম ভূগোলবিদ মুকাদ্দাসিও পুরো পারস্য অঞ্চলের জনগণের ভাষাকে ফার্সি বলে উল্লেখ করেছেন। তুর্কি সালজুক রাজবংশই প্রথমবার ফার্সি ভাষাকে ইরানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। এর একটা বড় কারণ এটা হতে পারে যে এই যুগে বিশেষজ্ঞ আর জ্ঞানী-গুণিদের সুবাদে ফার্সি ভাষা যথেষ্ট পরিপক্কতা অর্জন করায় এই ভাষা কেবল তখন থেকেই রাষ্ট্রীয় ভাষা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
ইরানে তুর্কি ও মোঙ্গলদের প্রবেশের ফলে ফার্সি ভাষার উন্নয়ন ব্যহত হয়নি, বরং ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তুর্কি ও মোঙ্গল মুহাজিরদের আকর্ষণ দিনকে দিন বেড়েছে।
হিজরি ষষ্ঠ শতকে মুসলিম বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলই তুর্কি শাসনাধীনে চলে আসে এবং তারা ইরানি সংস্কৃতি ও ফার্সি ভাষায় প্রভাবিত হয়ে এই ভাষাকেই অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে চীন ও ভারত থেকে শুরু করে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে দেন। মোঙ্গল শাসনের প্রথম থেকেই ফার্সি ছিল সরকারি বা রাষ্ট্রভাষা। গিয়ুক খান ক্যাথলিক বিশ্বের প্রধান ধর্মগুরু পোপের কাছে ফার্সি ভাষায় চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠির মূল কপি গিয়ুক খানের সিল-মোহরসহ এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। বিশ্বখ্যাত ইতালিয় পর্যটক মার্কোপোলো ফার্সি ভাষা জানতেন এবং তিনি চীনের বেশিরভাগ ভৌগোলিক নাম ফার্সি ভাষাতেই লিখেছিলেন। হিজরি অষ্টম শতকের বিশ্ববিশ্রুত পর্যটক ইবনে বতুতার যুগে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফার্সির ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। তিনি মোঙ্গল শাসনাধীন চীন থেকে শুরু করে ভারত পর্যন্ত যেখানেই গেছেন সেখানেই জনগণ ফার্সি ভাষায় তার সঙ্গে কথা বলেছেন।
ইবনে বতুতা গোটা মুসলিম ও অমুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন। তার যুগে মধ্য এশিয়া, ভারতবর্ষ, এশিয়া মাইনর ও ইরানের আজারবাইজান অঞ্চলে মানুষের কথোপকথনের প্রাত্যহিক ভাষা ছিল তুর্কি, কিন্তু এইসব অঞ্চলে মুসলিম জাতিগুলোর রাষ্ট্রীয় তৎপরতা এবং শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চার ভাষা ছিল ফার্সি। এই যুগে ভারতের ক্ষমতায় ছিলেন তুর্কি খিলজি রাজবংশ। কিন্তু তাদের দরবারি ভাষা ছিল ফার্সি।
তুর্কি খিলজি সুলতানদের বেশিরভাগ উপকরণ ও রসম-রেওয়াজের নাম ছিল ফার্সি। যেমন, দিল্লিতে সুলতানের ঘরকে বলা হতো ‘দারসারা’। আর জল্লাদ বা 'মিরগাজব'কে বলা হতো 'দেজখিম'। সোনা ও রূপার টুকরাকে বলা হতো খেশত। ভারতে সমস্ত বিদেশিকে বলা হতো 'খোরাসানি'। রাজপ্রাসাদের হল-রূমকে বলা হতো 'বরগহ'। #
পার্সটুডে/এআর/৩১