ইরানের কাছে আমরা অন অ্যারাইভাল ভিসা চাই: রাশেদ খান মেনন
ইরানের সাথে বাংলাদেশের পর্যটন সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আমরা ইরানের কাছে অন অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। ইরানের তাবরিজে এশিয়া কো- অপারেশন ডায়ালগ বা এসিডি’র মন্ত্রী পর্যায়ের চুতর্দশ সম্মেলন শেষে রেডিও তেহরানের সাথে সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।
তিনি বলেন, পর্যটনে দুদেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে আমরা ইরানিদের বৃষ্টি ও নদী দেখাতে পারব।
তেহরান-ঢাকা সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে তবে ইরানের সাথে আমাদের চুক্তি রয়েছে এবং এ ব্যাপারে ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূতের সাথে আমার আলোচনা হয়েছে। এখানে সক্ষমতার একটা বিষয় আছে। বাংলাদেশ বিমানের পক্ষে সেটা আপাতত সম্ভব নয়। কারণ আমাদের বিমানের সেই সক্ষমতা নেই। তবে ইরানের পক্ষে সেটা করা সম্ভব।
পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব রাশেদ খান মেনন, ইরানে অনুষ্ঠিত হলো এশিয়া কো- অপারেশন ডায়ালগ বা এসিডি’র মন্ত্রী পর্যায়ের চুতর্দশ সম্মেলন। এতে সদস্য দেশগুলোর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের বিষয়ে জোর দেয়া হলো। পাশাপাশি পর্যটনের বিষয় তো ছিলই। সামগ্রিকভাবে এ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ কীভাবে কতটা লাভবান হবে?
রাশেদ খান মেনন: দেখুন, এশিয়া-কো অপারেশন ডায়ালগ বা এসিডি বহু আগে থেকেই আছে। ২০০২ সাল থেকে এর কার্যক্রম চলছে। তবে এই প্রথম ইরানের উদ্যোগে পর্যটন সংক্রান্ত মন্ত্রীদের সভা অনুষ্ঠিত হলো। এর একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে পর্যটনকে সামনে নিয়ে আসা। বিশ্ব পর্যটনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা এবং পর্যটকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে এ সম্মেলন হয় ইরানের তাবরিজে।
এখন পর্যটন শুধুমাত্র বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আগে যেমনটি ছিল কোথায় বেড়াতে যাওয়া। কিন্তু বর্তমানে পর্যটনের বহু ভাগ রয়েছে। বর্তমানে ইকো ট্যুরিজম অর্থাৎ প্রকৃতি ও পরিবেশ বহাল রেখে পর্যটন শিল্পের উৎকর্ষ সাধন করা হচ্ছে।
এখন কম্যুনিটি বেজ ট্যুরিজম, রিলিজিয়াস ট্যুরিজম, কালচারাল ট্যুরিজম ও অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমসহ নানাবিধ ট্যুরিজম রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ব ট্যুরিজমের শতকরা ৩৫ ভাগ হচ্ছে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের অংশ। যেমন ধরুন- পাহাড়ে ওঠা বা পাহাড় থেকে নামা, ডাইভিং করা, নদীতে বোটিং করা ইত্যাদি। আর এসব পর্যটনের খাতকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করাই হলো এসিডির একটি অন্যতম লক্ষ্য।
রেডিও তেহরান: এ সম্মেলনে সংস্থার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আপনি কী একটু সুনির্দিষ্ট করে রেডিও তেহরানকে বলবেন- বাংলাদেশ এখান থেকে কী কী সহযোগিতা পেতে পারে?
রাশেদ খান মেনন: দেখুন, বিশ্ব পর্যটনের একটা অবয়ব আছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত পর্যটনের ক্ষেত্রে তেমন বড় কোনো স্থানে নেই। বলতে পারেন আমরা পর্যটনে এখনও প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছি। ফলে বাংলাদেশকে পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে পরিচিত করানোই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কাজ। এবারের এসিডি সম্মেলনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শুধু তাই নয় এবার এসিডির এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছে ১৯১৮ সালে যে মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন হবে- সেটা হবে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পর্যটনকে আমরা এখন থার্ড সেক্টর হিসেবে নিয়েছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা পর্যটনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আর আমরা ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করেছি। তবে এটা কেবলমাত্র ২০১৬ সালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ; ২০১৭ ও ১৮ সাল পর্যন্ত এটি বিস্তৃত হবে।
আমি আরো একটি বিষয় বলতে চাই যে, ২০১৬ সালের মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক ট্রাভেল এসোসিয়েশনের পার্টনার হিসেবে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের বিষয়টি আমরা বাংলাদেশ করতে যাচ্ছি। তাছাড়া ওআইসির ট্যুরিজম সম্মেলন আমরা বাংলাদেশ করতে যাচ্ছি। অর্থাৎ এখন সবার নজরটা বাংলাদেশের দিকে পড়ছে। আমরা বিশ্বের সেই নজরটাকে আরো বেশি করে বাড়াতে চাই। কেবল নজরই আমি বলব না; যাতে পর্যটনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ গঠিত হয় সেদিকেও আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।
রেডিও তেহরান: বলা হয়- বাংলাদেশ পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সে সম্ভাবনার স্ফূরণ কতটা ঘটানো সম্ভব হয়েছে এবং এর পূর্ণ বিকাশে আরো কী করা যেতে পারে? এ ক্ষেত্রে সরকারের সামনে কী কোনো ধরনের বাধা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
রাশেদ খান মেনন: দেখুন এতদিন পর্যন্ত কিন্তু বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বাজেটের দিক থেকে খুব বড় কোনো স্থান পেত না। তবে এবারই আমাদের পর্যটন খাতে বিশেষভাবে ১০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় পর্যটন খাতে বেসরকারিভাবে যাতে আরো বেশি ইনভেস্টমেন্ট করা হয় সেজন্য নানারকম সুবিধা দেয়া হয়েছে। পর্যটনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় যে রাস্তাঘাট, ব্রিজ তৈরি করা প্রয়োজন, যে কানেকটিভিটি দরকার সেগুলো করা হচ্ছে। এজন্য নতুন নতুন বিমান বন্দর তৈরি হচ্ছে।
রেডিও তেহরান: জনাব মেনন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও বাংলাদেশ ভ্রাতৃপ্রতীম এবং বন্ধুপ্রতীম দেশ। তো, দু দেশের মধ্যে পর্যটন খাতে সহযোগিতা কেমন? এ সহযোগিতা আরো বাড়ানো সম্ভব কিনা এবং এ নিয়ে সরকারের হাতে তেমন কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
রাশেদ খান মেনন: এখন পর্যন্ত পর্যটন খাতে ইরানের সাথে বাংলাদেশের তেমন কোনো সহযোগিতা নেই। বাংলাদেশ থেকে ইরানে এবং ইরান থেকে বাংলাদেশে পর্যটকদের যাওয়া-আসার জন্য তেমন কোনো সুযোগ সুবিধা বা উদ্যোগ তৈরি হয়নি। এখন পর্যন্ত ইরানের সাথে বাংলাদেশের যেটুকু সম্পর্ক হয়েছে সেটা খুবই প্রান্তিক। তবে আমরা এখন চেষ্টা করছি দুই দেশের ট্যুর অপারেটর মধ্যে যদি একটা যোগসূত্র তৈরি করতে পারি এবং সুযোগ সুবিধাগুলোর যদি উন্নয়ন ঘটানো যায় তাহলে আমি মনে করি পর্যটনের ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়বে।
ইরানের সাথে আমাদের পর্যটনের সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে আমরা ইরানকে বর্ষা দেখাতে পারব যেটা ইরানে খুব একটা দেখা যায় না। আমরা ইরানি পর্যটকদের নদী দেখাতে পারব। বাংলাদেশে যে ইসলামিক ঐতিহ্য আছে সেগুলো আমরা ইরানিদের দেখাতে পারব। বাংলাদেশ পর্যটনের ক্ষেত্রে ইরানিদের আকৃষ্ট করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
আর আমাদের সাথে ইরানের সম্পর্ক আজকের নয়। কয়েকশ বছর আগ থেকেই আমাদের সাথে ইরানের সম্পর্ক। সেদিক থেকে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কটি পর্যটনের মধ্য দিয়ে আরো বিস্তৃত হবে।
রেডিও তেহরান: আপনার এই সফরের সময় তেহরান-ঢাকা সরাসরি বিমানের ফ্লাইট চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এ সম্ভাবনা কতটা এবং এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বা আপনার মন্ত্রণালয়ের হাতে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
রাশেদ খান মেনন: দেখুন, তেহরান–ঢাকা সরাসরি বিমানের ফ্লাইট চালুর বিষয়ে আলোচনাটা আসলে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বহু আগ থেকেই আমাদের সাথে ইরানের বিমান সার্ভিসের চুক্তি রয়েছে। ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত আমার সাথে দেখা করেছেন। তারা চান যে ঢাকা- তেহরান সরাসরি নিয়মিত ফ্লাইট চালু হোক। তবে বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে আমরা এখনও সেটা করতে সক্ষম নই। কারণ আমাদের বিমান সেই পর্যায়ের নেই। তবে ইরানের পক্ষে এটা করা সহজ হবে বলে আমি মনে করি।
আমি এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই সেটি হচ্ছে যে, ইরান বিশ্বের ১৯০ টি দেশকে অন অ্যারাইভাল ভিসা দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ তার বাইরে। শুধুমাত্র বাইরে না যে ১১ টি দেশকে অন অ্যারাইভাল ভিসা দেয়া হবে না তারমধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। এটা কেন তা আমরা জানি না। আমি তাবরিজের গভর্নরের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছি। সেখানে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত বিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন। তারা বলেছেন, এ বিষয়টি যাতে সহসা সমাধান হয় তা খতিয়ে দেখবেন। ইরান সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান –আমরা অন অ্যারাইভাল ভিসা চাই।
রেডিও তেহরান: আমরা সর্বশেষ যে বিষয়টি আপনার কাছে জানতে চাইবো সেটি হচ্ছে, আপনি জানেন যে সারা বিশ্বে এখন অবশ্যই সন্ত্রাসবাদ একটি বড় এবং বৈশ্বিক সমস্যা। ইরান সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছে। আপনি জানেন বিশ্বের বহু দেশে তাকফিরি সন্ত্রাসীরা হামলা চালাতে সক্ষম হলেও ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর দক্ষতার কারণে সন্ত্রাসীরা তাদের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ইরান একটি নিরাপদ দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। এ অবস্থায় সন্ত্রাস দমনে ইরানের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন? বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে এক্ষেত্রে কি ধরনের সহযোগিতা হতে পারে?
রাশেদ খান মেনন: আপনি ঠিকই বলেছেন, বৈশ্বিক সন্ত্রাস বিশ্বের সব দেশের জন্য ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সন্ত্রাসবাদ পর্যটনের ক্ষেত্রে আরো বড় ধরনের সংকট হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাসবাদের কারণে এ খাতের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আর এই সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এ বিষয়টা নিশ্চয়ই আপনারা লক্ষ্য করেছেন। আমাদের জিরো টলারেন্স নীতির ফলে এরইমধ্যে আমরা জঙ্গি দমনে সক্ষম হয়েছি।
আর এ জঙ্গিদমন ও সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে ইরান আমাদেরকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। কারণ জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের এখনকার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে ইরানের পাশাপাশি দেশগুলো থেকে। ফলে তারা আমাদেরকে তথ্যসহ বিভিন্ন দিক থেকে সহায়তা করতে পারে। আর এক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আমাদের সবার জন্য কাম্য।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৫