সুরা বনি ইসরাইল ও মহানবী (সা.)'র মে'রাজ
ভাইবোনেরা, সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আসমানি সুরার ধারাবাহিক আলোচনার এ সপ্তা'র পর্ব পরিবেশন করছি। আজ আমরা সুরা 'আসরা' বা বনি ইসরাইলের প্রাথমিক পরিচিতি ও এই সুরায় উল্লেখিত মহানবীর (সা.) মে'রাজ সম্পর্কিত আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরবো।
পবিত্র কুরআনের ১৭ নম্বর সুরা 'আসরা' বা 'বনি-ইসরাইল'-এ রয়েছে ১১১ টি আয়াত ও ১২ টি রুকু। মহানবী (সা.)'র মেরা'জ-যাত্রার সূচনার কথা উল্লেখের কারণে এই সুরাকে আসরা এবং বনি-ইসরাইলের নানা ঘটনা তুলে ধরার কারণে সুরাটিকে বনি-ইসরাইলও বলা হয়। মক্কায় অবতীর্ণ সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে:
'পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি নিজ বান্দাকে এক রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত-যার চার দিককে আমি সব ধরনের বরকত বা প্রাচুর্যতায় সমৃদ্ধ করেছি যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সব কিছু দেখেন।'
সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)'র মেরা'জ-যাত্রার সূচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই আয়াতে। মাত্র এক রাতে সংঘটিত এমন সফর কখনও কোনো সাধারণ উপায়ে সম্ভব নয়। তাই এটি একটি মু'জিজা বা অলৌকিক ঘটনা। কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী মহানবী (সা.)'র মে'রাজ একটি সুনিশ্চিত ঘটনা। মাত্র এক রাতেই মহান আল্লাহ বিশ্বনবীকে (সা.) মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসায় এবং সেখান থেকে আকাশগুলোতে ভ্রমণ করিয়েছেন।
তিনি এই ভ্রমণে উর্ধ্বজগত ও সৃষ্টি-জগতের নানা বিস্ময় দেখেন এবং অনেক অসাধারণ জ্ঞান অর্জন করেছেন।
বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী মহানবী (সা.) হযরত ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা (আ.)' র মত নবীগণের সঙ্গে নামাজ আদায় করেছেন। আর বিশ্বনবীই ছিলেন নামাজে তাঁদের ইমাম। এরপর মহানবীর আকাশ সফর শুরু হয়। তিনি সপ্ত আকাশ অতিক্রম করেন একের পর এক।
মহানবী (সা.) আকাশগুলোতে নানা নতুন দৃশ্য দেখেন ও নবী-রাসূল এবং ফেরেশতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি এই সফরে বেহেশত ও জাহান্নামও দেখেন। বেহেশতিদের অবস্থান ও তাদের জন্য রাখা অফুরন্ত নানা নেয়ামত এবং দোযখীদের জন্য রাখা খাবারগুলোও দেখেন। বিশ্বনবী (সা.) সেই আলোকময় বিশ্বে আধ্যাত্মিক পরিদর্শনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ও মহান আল্লাহর নৈকট্য বা বিশেষ সান্নিধ্যেও উপনীত হন। মহান আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বা হাবিবকে সম্বোধন করে কথা বলেন ও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান দান করেন। কুরআন বহির্ভূত বেশিরভাগ বাণী বা হাদিসে কুদসি তিনি এই সময়ই লাভ করেন। ৫ ওয়াক্ত নামাজ এ সময়ই ফরজ করা হয় এবং জিবরাইল ফেরেশতাকে সঙ্গে নিয়ে মহানবী (সা.) এইসব নামাজ আদায় করেন।
এভাবে নানা বিস্ময়কর বিষয় দেখার পর ও ইবাদতের পর মহানবীর সেই বিস্ময়কর সফর শেষ হয়। তিনি সে রাতেই ফজরের সূর্যোদয়ের আগে মক্কায় ফিরে আসেন এবং ফজরের নামাজ পবিত্র মক্কায় আদায় করেন।
মহানবী (সা.)’র মে'রাজ সফর স্বপ্নযোগে হয়েছিল বলে কেউ কেউ ভুল ধারণা করেন। কিন্তু বাস্তবে এই সফরে মহানবী (সা.) ছিলেন সম্পূর্ণ সচেতন এবং তিনি সশরীরেই এই সফর করেছিলেন। মহানবীর মহান আত্মা যাতে মহান আল্লাহর নানা নিদর্শন দেখে আরও মহামহিম হয় এবং মানুষকে সুপথ দেখানোর ব্যাপারে তাঁর প্রস্তুতি বৃদ্ধি পায় সে জন্যই এই সফর রাতের বেলায় সংঘটিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
কোনো কোনো মুফাসসির মনে করেন মসজিদুল আকসা বলতে বায়তুল মোকাদ্দাসকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক তাফসির থেকে প্রমাণিত যে, মসজিদে আকসা বলতে সেই মসজিদকে বোঝানো হয়েছে যা রয়েছে কা’বা ঘরের উপরস্থ আকাশে। এ ব্যাপারে সব মুসলমানই একমত যে, রাসূলের মে'রাজ হয়েছিল এবং তা হয়েছিল কা’বা ঘরের ওপরে আকাশে অবস্থিত বায়তুল মামুরের উদ্দেশে, যাকে আয়াতে মসজিদুল আকসা বলা হয়েছে। রাসূল (সা.)-এর মেরাজ সশরীরী ছিল, শুধু আত্মিক ছিল না। যারা এতে বিশ্বাস করে না তারা কাফির বলে গণ্য হবে।
মে'রাজ কোন তারিখে হয়েছিল তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন ১৭ রবিউল আউয়াল, কেউ বলেন ২৭ রজব, কারও মতে ১৭ রমজান এবং কেউ বলেন ২১ রমজান তারিখে তা হয়েছিল। আবার এ নিয়েও মতভেদ আছে যে, কোন স্থান থেকে মেরাজ হয়েছিল। কারও মতে তা শুরু হয় মসজিদুল হারামের হুজরা থেকে, আবার কেউ বলেন উম্মে হানীর ঘর থেকে। মুসলমান হওয়ার সুবাদে আমাদের দায়িত্ব হল আল্লাহ যা বলেছেন এবং যা মহানবী (সা.) অবহিত করেছেন তা মনে-প্রাণে মেনে নেওয়া এবং এ ব্যাপারে বিতর্কে জড়িত না হওয়া।
বস্তুজগত সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানো ও নতুন কিছু দিগন্ত খুলে দেয়া মে'রাজের অন্যতম উদ্দেশ্য। মে'রাজ সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন, ' মহান আল্লাহ স্থান ও সময়ের ঊর্ধ্বে। কিন্তু তিনি চেয়েছেন রাসূল (সা.)-কে আকাশের অধিবাসী ও ফেরেশতাদের মধ্যে এনে তাঁকে সম্মান দেবেন এবং মহান আল্লাহর চির-বিস্ময়কর ও অপার মহিমার কিছু নিদর্শন তাঁকে দেখাবেন যাতে তিনি পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে মানুষকে এসব বিষয়ে অবহিত করতে পারেন।
কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী মহানবী (সা.) মে'রাজ শেষে বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং এরপর মক্কার দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে তিনি কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলাকে এ অবস্থায় দেখতে পান যে তারা একটি হারিয়ে যাওয়া উটকে খুঁজছে। মহানবী (সা.) মক্কার লোকজনের কাছে মে'রাজ সফরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ নানা ঘটনার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু কুরাইশ কাফিররা তাদের চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী এই সফরের সত্যতাকে অস্বীকার করে। এরপর মহানবী (সা.) মে'রাজের দুই স্থান বায়তুল মুকাদ্দাস ও মক্কার মধ্যে সংঘটিত কিছু ঘটনা এবং ওই কাফেলার উট হারানোর কথাও কুরাইশদের জানান। এর কিছুক্ষণ পরই আবু সুফিয়ানের কাফিলা হাজির হয়।মহানবী (সা.) যেসব নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেন তা সত্য বলে স্বীকৃতি দেয় এই কাফেলা।
সুরা বনি ইসরাইলের ২ থেকে ৮ নম্বর আয়াতে বনি ইসরাইলের ঘটনাবহুল ইতিহাসের কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। ৪ নম্বর আয়াতের পর থেকে ইহুদিদের দু'টি দুর্নীতি ও বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
'(৪) এবং আমরা বনি ইসরাইলকে (তাওরাত) গ্রন্থে এ সংবাদ দিয়েছিলাম, ‘তোমরা ভূপৃষ্ঠে অবশ্যই দু’বার অরাজকতা সৃষ্টি করবে এবং অতিশয় উদ্ধত
অহংকারমত্ত হবে।'
ইহুদিদের প্রথমবারের অরাজকতা হল নবী আরমীযার আদেশ অমান্য করা এবং নবী আশয়ীয়াকে হত্যা করা এবং দ্বিতীয়বারের অরাজকতা হল হযরত জাকারিয়া ও ইয়াহ্ইয়া (আ.)-কে হত্যা করা এবং হযরত ঈসা (আ.)-কে হত্যার সঙ্কল্প করা। অবশ্য ইহুদিদের দুই দফা অরাজকতা কী ছিল তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক বা মতভেদ রয়েছে।
এরপরের আয়াতে ইহুদিদের উত্থান-পতনের দুই পর্যায়ের কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে:
'(৫) এরপর যখন দুই প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রথমটির সময় আসন্ন হবে তখন আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে আমাদের কতক কঠোর শক্তিশালী (রণনিপুণ) বান্দাদের পাঠাব এবং তারা তোমাদের ঘরগুলোতে তোমাদের (দমনের উদ্দেশ্যে) তন্ন তন্ন করে খুঁজবে এবং এ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। (৬) এরপর তোমাদের জন্য পুনরায় তাদের ওপর আক্রমণ করার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেব এবং ধন-সম্পদ দিয়ে ও পুত্রসন্তান দিয়ে তোমাদের সহায়তা দেব এবং জনসংখ্যায় তোমাদেরকে শত্রুদের চেয়ে বাড়িয়ে দেব (৭) তোমরা সৎকর্ম করলে তা তোমাদেরই জন্য এবং অসৎকর্ম করলে তাও তোমাদেরই জন্য। এরপর যখন দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতির সময় সমাগত হবে তখন (আমরা অপর এক জাতিকে পাঠাব) যাতে তারা তোমাদের চেহারাকে বিমর্ষ করে দেয় এবং মসজিদে (বায়তুল মোকাদ্দাস) সেভাবেই প্রবেশ করবে যেভাবে প্রথমবার প্রবেশ করেছিল এবং যা কিছুর ওপর তারা আধিপত্য লাভ করবে তাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে। (৮) আশা করা যায়, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের করুণা প্রদর্শন করবেন, কিন্তু তোমরা যদি আগের আচরণের পুনরাবৃত্তি কর, তবে তিনিও তাঁর আচরণের পুনরাবৃত্তি করবেন; এবং আমরা জাহান্নামকে অবিশ্বাসীদের জন্য সংকীর্ণ (কারাগার) করে রেখেছি।'
ইহুদিদের একটি গোষ্ঠী এখনও চরম বিভ্রান্ত যারা তথা ইহুদিবাদীরা বর্তমানে ফিলিস্তিন দখল করে রেখেছে। এরা ফিলিস্তিনি নারী, শিশু ও পুরুষদের ওপর গণহত্যা চালানোসহ নানা ধরনের অরাজকতা ও আগ্রাসনে লিপ্ত এবং কোনো নিয়ম-নীতির ধার ধারে না।
ইহুদিদের নানা অনাচার ও তাদের ওপর খোদায়ী শাস্তি মানব সমাজের সব জাতির জন্যই এ শিক্ষা বহন করছে যে জালিম যারাই হোন না কেন তাদেরকে আল্লাহ শাস্তি দেবেন। যারাই সৎ পথে চলবে ও সৎকাজ করবে তারাই হবে সফল ও গৌরবের অধিকারী। আর খোদাদ্রোহীতার পরিণাম হবে খুবই মন্দ। অন্য কথায় ভালো ও মন্দ আচরণ জাতিগুলোর পরিণতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
সুরা বনি ইসরাইলের নয় ও দশ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে যে কুরআন সঠিক পথের দিশা দেয়ার সবচেয়ে জোরালো ও স্থায়ী মাধ্যম। যারা সৎকাজ করে তাদের মহাপুরস্কারের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এখানে আরও বলা হচ্ছে, যারা পরকালে বিশ্বাসী নয় তারা শাস্তি পাবে।
সুরা বনি ইসরাইলের ১১ নম্বর আয়াতে মানুষের তাড়াহুড়া-প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলছেন, মানুষ যেভাবে ভালো কিছু অর্জনের জন্য তাড়াহুড়া করে ঠিক তেমনি অজ্ঞতার কারণে অকল্যাণকেও পেতে তাড়াহুড়া করে। মানুষকে প্রকৃতিগতভাবেই তাড়াহুড়াপ্রিয় বলে উল্লেখ করেছেন মহান আল্লাহ। তাড়াহুড়া করা বা খুব দ্রুত কিছু পেতে চাওয়া মানুষের জন্য এক মহাবিপদ। আর এটা করতে গিয়ে মানুষ কোনো কিছুর সব দিক যাচাই-বাছাই করে দেখে না। ফলে অনেক সময় মানুষ প্রকৃত কল্যাণকে চিহ্নিত করতে পারে না, বরং অনেক সময় আবেগপ্রবণতা ও খেয়ালীপনার কারণে বাস্তবতাকে ভিন্নরূপে দেখে এবং বাহ্যিক চাকচিক্যে মোহিত হয়ে কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ চেয়ে বসে। মানুষের ঈমানহীনতার অন্যতম কারণ হল ধীর-স্থিরভাবে চিন্তাভাবনা না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া। পরবর্তী আয়াতে দিন ও রাতের সময়ের পরিমাণ বৃদ্ধির উপকারিতা এবং বিশ্বজগতের হিসাব-কিতাব থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, এসব বিষয় আল্লাহকে চেনার মাধ্যম। তাই মানুষের উচিত তার কাজকর্মের পরিণতি সম্পর্কে ভেবে দেখা ও সতর্ক থাকা।
সুরা বনি ইসরাইলের ১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:
'(১২) এবং আমরা রাত ও দিনকে দু’টি নিদর্শন করেছি। পরে আমরা রাতের নিদর্শনকে মুছে ফেলি এবং দিনের নিদর্শনকে করি সমুজ্জ্বল যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ-সংখ্যা ও হিসাব নির্ণয় করতে পার। এবং আমরা প্রত্যেক জিনিসকে বিশদভাবে বিবৃত করেছি।'
দিন ও রাত হচ্ছে প্রাকৃতিক ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা। এর মাধ্যমে মানুষ নানা হিসাব-নিকাশ ও পরিকল্পনা যথাযথভাবে প্রণয়ন করতে পারে।#