ডিসেম্বর ২৪, ২০১৬ ১৫:২৫ Asia/Dhaka

মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার অবস্থান শেষ করার কাজটি ত্বরান্বিত করবে- ইরান, রাশিয়া ও তুরস্কের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। আর ট্রাম্পের শাসনামলেই মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অবস্থান শেষ হয়ে যাবে। রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত বাম রাজনীতিক, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও লেখক বদরুদ্দিন ওমর।

তিনি বলেন, মানবতার সবচেয়ে বড় দুশমন হচ্ছে আমেরিকা। আর আইএসআইএল সন্ত্রাসী সৃষ্টি করেছে আমেরিকা ও পশ্চিমারা। তারা কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের মাধ্যমে আইএসআইএলকে সহযোগিতা করেছে।
পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব বদরুদ্দিন ওমর, গত কয়েক বছর ধরে সিরিয়ার পূর্ব আলেপ্পো সন্ত্রাসীদের দখলে থাকার পর সম্প্রতি সরকারি বাহিনী তা পুনরুদ্ধার করেছে। বিষয়টিকে সিরিয়ার সরকারের জন্য বড় বিজয় এবং সন্ত্রাসীদের জন্য বড় রকমের বিপর্যয় বলে গণ্য করা হচ্ছে। এ ঘটনা সরকারকে কতটা সুবিধা দেবে আর সন্ত্রাসীরা আসলে কতটা বিপর্যয়ের মুখে পড়ল বলে আপনি মনে করেন?  

বদরুদ্দিন ওমর: সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন সিরিয়ায় একটা স্থিতিশীল সরকার ছিল, ছিল একটি স্থিতিশীল সমাজ। কিন্তু আমেরিকা- সিরিয়ার সেই স্থিতিশীল সরকার ও সমাজকে একেবারে বিধ্বস্থ করে দিয়েছে। তারা ইরাক এবং লিবিয়ায় যেভাবে বোম্বিং করেছে, এয়ার রেড করেছে ঠিক সিরিয়ার ক্ষেত্রে সেভাবে করতে চেয়েও পারেনি কারণ জাতিসংঘ সেই অনুমতি দেয় নি। তার কারণ হচ্ছে সিরিয়ার ব্যাপারে রাশিয়া ও চীন ভেটো দিয়েছে। সিরিয়ায় যদি আমেরিকা সেভাবে সিরিয়াল বোম্বিং ও এয়ার রেড করতে পারতো তাহলে ইরাক ও লিবিয়ার মতো পরিস্থিতি হতো। 

সিরিয়ায় সেটা না করতে পেরে আমেরিকা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিল। সেখানকার বিদ্রোহী ও আইএসআইএলকে দিয়ে ব্যাপকভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। আর এতে সরাসরি ও ব্যাপকভাবে জড়িত ছিল আমেরিকা, ইসরাইল ও ইউরোপীয়রা। ফলে সিরিয়ায় ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। 
তবে সিরিয়ার আসাদ সরকারের বিরোধী বিভিন্নগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক অনৈক্য থাকায় আমেরিকা তাদের সেই লক্ষ্যে পুরোপুরি এগুতে পারেনি।

সিরিয়ার আলেপ্পো দখল করে নিয়েছিল বিদ্রোহী ও আইএসআইএল সন্ত্রাসীরা। তারা সিরিয়ার আসাদ সরকারকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করেছে। সেখানে ব্যাপক যুদ্ধের পর এখন মুক্ত হলো। এক্ষেত্রে রাশিয়ার সহযোগিতা খুবই গুরুত্ব ভূমিকা পালন করেছে। রাশিয়ার সহযোগিতা ছাড়া সিরিয়ার পরিস্থিতির উন্নতি হতো না- আলেপ্পোও মুক্ত করা সম্ভব হতো না। রাশিয়ার অস্ত্র-শস্ত্র পাঠানো এবং ব্যাপক বিমান হামলার ফলে বেকায়দায় পড়ে আইএসআইএল সন্ত্রাসীরা ও অন্যান্য বিদ্রোহীরা ওই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ইরাকেও কিন্তু একই অবস্থা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা-সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়াসহ সর্বত্র আইএসআইএলসহ সন্ত্রাসী যে গোষ্ঠীগুলো কাজ করছে তারা এই শতাব্দীর প্রথম দিকে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারাই গড়ে উঠেছে। বর্তমানেও আমেরিকা, ইউরোপ ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের সাহায্য সহযোগিতায় তারা চলছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা মনে করছে এভাবে আর সন্ত্রাসীদেরকে সাহায্য দেয়া যাবে না। তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রত্যাহারের ফলেই একরকম বলা চলে সিরিয়ায় ও ইরাকে আইএসআইএলের বিপর্যয় হচ্ছে।

রেডিও তেহরান: আলেপ্পোর পতনের পর আরব ও পশ্চিমা বিশ্বে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। এসব দেশ তো বলে আসছে তারা সন্ত্রাসীদের সমর্থন করে না, তাহলে কেন এই অস্বস্তি? 

বদরুদ্দিন ওমর: দেখুন, মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো যতই অস্বীকার করুক বাস্তবতা হচ্ছে তারাই আইএসআইএলকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে। আমেরিকাও সন্ত্রাসীদের যে সাহায্য সহযোগিতা করেছে সেটাও আরব দেশগুলোর মাধ্যমে। আরবদের সাথে তুরস্কও জড়িত ছিল। তুরস্ক জড়িত ছিল বলেই আইএস সন্ত্রাসীরা সেখানে যাওয়ার প্যাসেজ পেয়েছে।

তাছাড়া রজব তাইয়্যেব এর্দোগান তো প্রকাশ্যে দীর্ঘ দিন ধরে সিরিয়ার বাসার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন দেখা গেছে আরবদের সাথে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না।
তবে কিছুদিন আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এর্দোগানকে উৎখাতের যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল- তার পেছনে আমেরিকার হাত ছিল বলে তিনি মনে করেন। তারপর থেকেই এর্দোগান কিছুটা মার্কিন বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। 
আর মানবতার যত কথাই বলা হোক না কেন-মানবতার বড় দুশমন আমেরিকার চেয়ে বড় আর কে আছে?
তাছাড়া সৌদি আরব হচ্ছে চরম প্রতিক্রিয়াশীল একটি দেশ। শুধু সৌদি আরব নয় উপসাগরীয় আরো কিছু দেশ রয়েছে যারা চরম প্রতিক্রিয়াশীল। আর সৌদি আরবসহ এসব আরব দেশ আমেরিকার সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় কর্তৃত্ব করত। মার্কিনের সাথে বর্তমানের এই দ্বন্দ্বের ফলে সেটাও কিন্তু স্পষ্ট হয়ে যাবে।

রেডিও তেহরান: আলেপ্পোর পতনের পর তুরস্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রে কার্লভকে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যাকারীর সর্বশেষ যে পরিচয় তুর্কি গণমাধ্যম তুলে ধরেছে তাতে দেখা যাচ্ছে- হত্যাকারী তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের নিরাপত্তা রক্ষী ছিলেন। এ ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন? 
   
বদরুদ্দিন ওমর: দেখুন, রজব তাইয়্যেব এর্দোগানের ওই নিরাপত্তারক্ষী যদি আইএসআইএলের লোক হয়ে থাকে তাহলে তারপক্ষে রুশ রাষ্ট্রদূত কার্লভকে হত্যা করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে আমি ভারতের উদাহরণ দিতে পারি।  যেমন ইন্দ্রিরা গান্ধীকে হত্যা করেছিল তার নিরাপত্তারক্ষী। শিখদের স্বর্ণমন্দির আক্রমণ করার ফলে তাদের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে তারা ইন্দ্রিরা গান্ধীকে হত্যা করেছিল।
এখানেও রজব তৈয়্যেব এর্দোগানের গার্ডদের মধ্যে যদি আইএসআইএল মনোভাবাপন্ন লোক থাকে তাহলে সেতো গুলি করতে পারে। এর্দোগানের ওই নিরাপত্তারক্ষী গুলি করার সময় তো আলেপ্পো আলেপ্পো করে চিৎকার করেছিল। এ থেকে বোঝা যায় সে আইএসআইএলের সদস্য হতে পারে।

রেডিও তেহরান: গত ২০ ডিসেম্বর মস্কোয় ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন এবং সেখান থেকে আইএসআইএল এবং আন-নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তুর্কি সরকার দীর্ঘদিন ধরে বাশার আসাদ সরকারের  বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে থাকলেও এখন অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এই পরিবর্তন?

বদরুদ্দিন ওমর: তুরস্কের পরিবর্তনের কারণ তো রয়েছে। প্রেসিডেন্ট এর্দোগানের বিরুদ্ধে যে ক্যু হয়েছিল সেক্ষেত্রে আমেরিকার হাত ছিল বলে তারা মনে করে। এ কারণে এর্দোগানের একটা মার্কিন বিরোধী অবস্থান তৈরি হয়েছে। ক্যু’র আগ পর্যন্ত তুরস্কের এই অবস্থান ছিল না। আর এই মার্কিন বিরোধী অবস্থান নেয়ার পর থেকে রাশিয়া ও ইরানের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। এই বিষয়টাই তুরস্কের পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তনের একটা বড় পয়েন্ট বলে আমি মনে করি। সিরিয়ার সাথেও তুরস্কের যে বৈরি সম্পর্ক ছিল নতুন এই পলিসি ফ্রেমওয়ার্কের কারণে তাদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হচ্ছে।

রেডিও তেহরান: অনেকে বলছেন- ইরান, রাশিয়া ও তুরস্কের সাম্প্রতিক ঐক্যবদ্ধ অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধারা সৃষ্টি করবে? এর ফলে আসলে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন আপনি?

বদরুদ্দিন ওমর: ইরান, রাশিয়া ও তুরস্কের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নতুন ধারা সৃষ্টি করবে একথা সত্য। কারণ এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যে অবস্থান ছিল এখন আর সেই অবস্থা নেই। আমেরিকার প্রধান মিত্র সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় কিছু দেশের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক খারাপের দিকে। তুরস্কের সম্পর্কও খারাপ হয়েছে। সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামীতে আরো যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তাতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অবস্থান আরো দুর্বল হবে।

তাছাড়া এখন আমেরিকার নতুন যিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন-ডোনাল্ড ট্রাম্প- তার কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু আছে বলে তো মনে হয় না। ঘটনাচক্রে এখন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন। তার শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কার্যকরভাবে শেষ হয়ে যাবে। ইরান, রাশিয়া ও তুরস্কের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শেষ করার কাজটি ত্বরান্বিত করবে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৪