জানুয়ারি ০১, ২০১৭ ১৬:৪৩ Asia/Dhaka

জেলা পরিষদ তৈরির ফলে স্থানীয় প্রশাসনে টানাপড়েন সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। রেডিও তেহরানের সাথে সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

অন্যান্যদের মতো তিনিও জেলা পরিষদ নির্বাচনকে মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। তিনি বললেন এটি এইজন্য মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে এখানে জনগণের  সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। 
রেডিও তেহরান: বাংলাদেশে ২৮ ডিসেম্বর বুধবার জেলা পরিষদ  নির্বাচন হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এ নির্বাচনে যেসব জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলেন তাদের কাছ থেকে জনগণ কী সেবা পাবে?

ড.বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, জেলা পরিষদ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কতগুলো দায়িত্ব আছে। দায়িত্বগুলোর মধ্যে কিছু আছে বাধ্যতামূলক এবং কিছু আছে ঐচ্ছিক। আর জেলা পরিষদের অনেক সম্পদ আছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ বড় বড় জেলা পরিষদগুলোর সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। শুধু তাই নয় জেলাপরিষদগুলো সরকারি বরাদ্দও পায়। আর জেলা পরিষদের নিজস্ব সম্পদ ও সরকারি বরাদ্দের অর্থ দিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হাতে নিতে পারে। তবে এর আগে যখন জেলা পরিষদে অনির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছিলেন তখন দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে এমপিদের সাথে যোগসাজশ করে সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে।  সে সময় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আবার এমপি ও  জেলাপ্রতিনিধিদের দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয়নি। ফলে সার্বিকভাবে বলা যায় জেলা পরিষদের প্রতিনিধিরা অবকাঠামো এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে জনকল্যাণ করতে পারে। তবে এসবই নির্ভর করবে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। তাছাড়া তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা সেটা আরো একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে সেটা হচ্ছে সম্ভাব্য  দ্বন্দ্বের ওপর।

রেডিও তেহরান: এরশাদ সরকারের আমলে জেলা পরিষদ ছিল। মাঝে দীর্ঘদিন জেলা পরিষদ বিলুপ্ত ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে- নতুন করে জেলা পরিষদ তৈরির ফলে স্থানীয় প্রশাসনে কোনো রকম টানাপড়েন সৃষ্টির আশংকা রয়েছে কিনা?
 
ড.বদিউল আলম মজুমদার:  আপনি খুব চমৎকার একটি প্রশ্ন করেছেন। অবশ্যই জেলা পরিষদ তৈরির ফলে স্থানীয় প্রশাসনে টানাপড়েন সৃষ্টির আশংকা রয়েছে, এটি হওয়ারই কথা। কারণ সংসদ সদস্যদেরকে এখানে উপদেষ্টা করা হয়েছে। আর এমপিদের উপদেষ্টা করার কারণে তারা অনেক সময় মনে করে তাদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমপিদের কোনো ভূমিকা থাকার নয়, সংবিধানে এরকম কোনো বিধান নেই। তাছাড়া এটি নিয়ে আদালতের একটি রায়ও আছে। আর আদালতের সেই রায় অমান্য করে এমপিদেরকে জেলা উপদেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তাই উপদেষ্টার পরামর্শ মানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে এমপিদের সাথে একটা দ্বন্দ্বের এখানে পুরোপুরি সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া কর্মকর্তাদের সাথেও দ্বন্দ্ব সৃষ্টির হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কর্মকর্তাদের সাথে কি সম্পর্ক হবে, তাদের ভূমিকা কি হবে সেটা আইনে সুস্পষ্ট করা হয়নি। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি স্তরে নির্বাচিতদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আর এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম হবে।

যদিও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নির্বাচিতদের শাসন ব্যবস্থা আমাদের কর্মকর্তারা মেনে নেয় কিন্তু স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে তারা এটি মেনে নিতে চায় না বা মানে না। ফলে এটি সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ফলে এখানেও একটা দ্বন্দ্ব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এসব দ্বন্দ্ব নিরসনে সরকারের উদ্যোগী ভূমিকা না থাকলে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন না।
একইসাথে আমি বলতে চাই, আমাদের এসব প্রতিষ্ঠান আসলে এক ব্যাক্তিকেন্দ্রিক। যেভাবে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রভাবশালী বা দাপট আছে সেখানে তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব। আর যেখানে তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল এমপিরা অনেক বেশি দাপটের সেখানে তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয় না। ফলে এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে সরকারের ওপর। 
   
রেডিও তেহরান: যে জাতীয় পার্টির আমলে জেলা পরিষদ শুরু হয়েছিল সেই জাতীয় পার্টি এবারের নির্বাচনে অংশ নেয় নি; পাশাপাশি বিএনপিও নির্বাচন বর্জন করেছে। শুধু তাই নয়- বিএনপি এ নির্বাচনকে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেছে। বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছেন?
 
ড.বদিউল আলম মজুমদার:  হ্যাঁ আপনি যথার্থই প্রশ্ন করেছেন। আসলে এটা সেই মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখানে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই জেলা পরিষদের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। ফলে এখানে জনগণের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা ছিলই না। বিএনপির এ বক্তব্য ঠিক।
এ নির্বাচন সম্পর্কে বলব- এটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়নি। নির্বাচন হয়েছে সেটা ইতিবাচক। কারণ আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে- প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধির শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এ নির্বাচনের মাধ্যমে সেটা করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এবং যে আইনের অধীনে নির্বাচন হলো সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া নির্বাচনে ব্যাপক টাকার খেলা হয়েছে এবং কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। এক অর্থে  নির্বাচন মানে বিকল্পের মধ্যে থেকে বেছে নেয়া। কিন্তু এখানে তো কোনো বিকল্পই তো ছিল না। ২১ টি জেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন প্রতিনিধিরা। অন্যগুলোতে নামকাওয়াস্তে প্রতিযোগিতা হয়েছে। তবুও বলা চলে একটা নির্বাচনের মাধ্যমে তারা প্রতিনিধি হয়ে দায়িত্বে গিয়েছেন।   

রেডিও তেহরান: বিএনপি আরো একটি অভিযোগ করেছে-দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এ নির্বাচন অসাংবিধানিক এবং বেআইনি। কতটা যৌক্তিক এসব অভিযোগ?

ড.বদিউল আলম মজুমদার: বিএনপি মহাসচিব যে কথা বলেছেন যে এ নির্বাচন অসাংবিধানিক-তবে আমি মনে করি না এটা সংবিধান পরিপন্থি। এটাও একটা পদ্ধতি। আইন করে এ পদ্ধতিটা করা হয়েছে। তবে আমাদের সংবিধানের চেতনা হচ্ছে সরাসরি প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন হবে।  তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আইনসিদ্ধ কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়।

রেডিও তেহরান: আমরা সব শেষে যে বিষয়টি জানতে চাইব সেটি হচ্ছে সম্প্রতি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন বা নাসিক নির্বাচন হয়ে গেল।অথচ এরপর জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড.বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, এ সম্পর্কে কি বলব বলুন! এক্ষেত্রে আমি বলব- এ ধরনের বিষয়কে একদিকে বলব আমাদের নির্বাচনি সংস্কৃতি অর্থাৎ যে কোনো উপায়ে নির্বাচনে জিততে হবে। আর অন্যদিকে রয়েছে আমাদের ফায়দা তন্ত্রের রাজনীতি। অর্থাৎ রাজনীতিতে ফায়দা দেয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে রয়েছে। আর সে কারণে যে কোনো পদ ও পদবী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ একটা পদে গেলেই বিভিন্নরকম সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। আর এসব কারণে সহিংসতা, কারচুপি ও টাকার খেলার মতো বাড়াবাড়ি হয়ে থাকে। আগের নির্বাচনগুলোতে সরকারি দলের লোকজন বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু নাসিক নির্বাচনে তারা বাড়াবাড়ি করেনি তাই সেখানে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। ফলে নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের ওপর নির্ভর করে। সরকার চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে, আর সরকার না চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা দুরূহ।#


পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩১