জানুয়ারি ১১, ২০১৭ ১৩:১৩ Asia/Dhaka

এ পর্বে সূরা শুআরার ২৭ থেকে ৩৩ নম্বর আয়াতের তরজমা ও তাফসির উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

قَالَ إِنَّ رَسُولَكُمُ الَّذِي أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ لَمَجْنُونٌ (27) قَالَ رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ (28)

“ফেরাউন (তার পারিষদবর্গকে) বলল- তোমাদের প্রতি যে রাসূল পাঠানো হয়েছে সে দেখছি একটা বদ্ধ পাগল।”  (২৬:২৭)

“মুসা বলল- তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং ওদের মধ্যবর্তী সব কিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা বুঝতে।” (২৬:২৮)

আগের পর্বে ফেরাউনের পারিষদবর্গের সামনে তার সঙ্গে হযরত মুসা (আ.)-এর কথোপকথনের কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ফেরাউন তার সহযোগীদের সামনে হযরত মুসাকে অপমানজনক কথা বলে। আজকের আসরে তার পরবর্তী ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। দাম্ভিক রাজা ফেরাউন চরম ধৃষ্ঠতাপূর্ণ ভাষায় হযরত মুসাকে উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করে এবং তার পারিষদবর্গকে বলে: সৃষ্টিকর্তা তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করার জন্য যে ব্যক্তিকে পাঠিয়েছেন তার তো দেখি বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। এ অবস্থায় হযরত মুসা (আ.) অত্যন্ত ভদ্রোচিত ভাষায় দরবারের লোকজনকে উদ্দেশ করে বলেন: আপনাদেরতো বিবেক-বুদ্ধি আছে, আপনারা একটুখানি চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন আপনাদের সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন তিনি- যিনি গোটা বিশ্ব এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রতিপালক। ফেরাউন কখনোই আপনাদের প্রতিপালক নয়। সে আপনাদের মিথ্যা স্রষ্টা সেজে বসে আছে। ফেরাউন মহান আল্লাহর তৈরি বিশাল সৃষ্টিজগতের একটি অংশ অর্থাৎ মিশরের শাসনক্ষমতায় বসে আছে। বিশ্বের বাকি অংশের উপর তার কোনো কর্তৃত্ব নেই।

ফেরাউন হযরত মুসাকে বদ্ধ উন্মাদ বলে যে গালি দিয়েছিল তার জবাব দিতে গিয়ে আল্লাহর নবী এরকম যুক্তিপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য তুলে ধরে দেখিয়ে দেন, তিনি তো উন্মাদ ননই পাশাপাশি ফেরাউনের চেয়েও গভীর জ্ঞান রাখেন। বরং উন্মাদ হচ্ছে ফেরাউন যে মহান আল্লাহর এতসব সৃষ্টি ও নিদর্শন দেখার পরও তাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তার সামনে মাথা নত করে না।

এ দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১.  দাম্ভিক ও সত্যবিমুখ ব্যক্তিরা চিন্তা ও গবেষণার পরিবর্তে আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের বিরুদ্ধে অপমান ও ঠাট্টা-মস্করাকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়।

২. নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণকারীরা সব সময় আল্লাহর এসব প্রিয় বান্দাকে পাগল আখ্যায়িত করেছে।

৩. মহাবিশ্ব পরিচালনার যে একক নিয়ম চালু রয়েছে তা থেকে বোঝা যায় একজন মহাজ্ঞানী প্রতিপালক এসব সৃষ্টি ও পরিচালনা করছেন।

সূরা শুয়ারার ২৯ থেকে ৩১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

قَالَ لَئِنِ اتَّخَذْتَ إِلَهًا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ (29) قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُبِينٍ (30) قَالَ فَأْتِ بِهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ (31)

“ফেরাউন বলল-(হে মুসা) তুমি যদি আমি ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করো, তবে আমি তোমাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করব।” (২৬:২৯)

“মুসা বলল-(এমনকি) আমি তোমার কাছে স্পষ্ট কোনো নিদর্শন আনলেও (তুমি আমাকে শাস্তি দেবে)?” (২৬:৩০)

“ফেরাউন বলল- যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে তা উপস্থিত কর।” (২৬:৩১)

ফেরাউন যখন দেখল ঠাট্টা-মস্করা বা অপমান করে হযরত মুসাকে কাবু করা যাবে না তখন তাঁকে বন্দি করে নির্যাতন করার ভয় দেখাল। বলল: তুমি ভেব না তুমি যা বলছ তা আমি নীরবে সহ্য করে যাব আর তুমি নবুওয়াতের দাবি করে জনগণকে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। হে মুসা! তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ কর এবং মানুষকেও তাঁর দিকে আহ্বান কর তাহলে এ প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না। তোমাকে বন্দি করে এমন নির্যাতন করবো যার ফলে তুমি নবুওয়াতের দাবি থেকে সরে আসবে। কিন্তু হযরত মুসা (আ.) ফেরাউনের এই হুমকির মোকাবিলায় মহান আল্লাহর ক্ষমতার কথা তুলে ধরে বললেন: আমি যে স্রষ্টার প্রতি ঈমান এনে তাঁর ইবাদত করছি তার পক্ষ থেকে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শন। এমন নিদর্শন তুমি কিংবা তোমার পারিষদবর্গের কেউ আনতে পারবে না। ফেরাউন হযরত মুসার এমন কথার জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেনি। সে বলে: যদি পার তাহলে দেখাও তো সে নিদর্শন যা দেখানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়!

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী শাসকদের একটি হাতিয়ার হলো জনগণের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন চালানো। তারা সমাজে সত্য প্রচারে বাধা দেয় এবং কেউ সত্য প্রচার করে ফেললে তাকে বন্দি করে তার ওপর নির্যাতন চালায়।

২. দাম্ভিক রাজা-বাদশাহদের কাজই হলো হুমকি দেয়া। কাজেই যারা সত্যের বাণী প্রচার করতে চান তাদেরকে এ ধরনের কঠিন বাধা-বিপত্তি ও নির্যাতন সহ্য করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

৩. মহান আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য নবী-রাসূলগণ অলৌকিক নিদর্শন দেখাতেন।

সূরা শুয়ারার ৩২ ও ৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَأَلْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُبِينٌ (32) وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّاظِرِينَ (33)

“অতঃপর মুসা লাঠি নিক্ষেপ করল- তৎক্ষণাৎ তা এক সাক্ষাৎ অজগরে পরিণত হলো।” (২৬:৩২)

“এবং মুসা হাত বের করল- আর তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র-উজ্জ্বল প্রতিভাত হলো।” (২৬:৩৩)

মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত মুসা (আ.) নিজের নবুওয়াতের প্রমাণ দেখানোর জন্য নিজের হাতের লাঠিটি ফেরাউন ও তার পারিষদবর্গের সামনে মাটিতে নিক্ষেপ করেন। আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছায় সেটি বিশাল ও ভয়ঙ্কর এক অজগরে পরিণত হলো। ফেরাউন যাতে হযরত মুসাকে বন্দি ও নির্যাতন করার ভয় না দেখায় এবং নিজেকে মুসার সামনে মহাপ্রতাপশালী হিসেবে জাহির না করে সেজন্য এই ব্যবস্থা নিলেন মহান আল্লাহ।

ভয়ঙ্কর সাপ দেখে ফেরাউন ও তার পারিষদবর্গ যখন ভয়ে-আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে তখন আশার আলো হিসেবে আরেকটি নিদর্শন ফুটে উঠল হযরত মুসার হাতে। তাঁর হাতের তালু থেকে এমন আলোকরশ্মি প্রস্ফুটিত হতে থাকলো যে সবাই তা দেখে হতবাক হয়ে গেল। এ দু’টি অলৌকিক নিদর্শন দেখানো হলো এমন এক প্রতাপশালী রাজার সম্মুখে যার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কখনো মাথা তুলে কথা বলার সাহস পায়নি। হযরত মুসার অকাট্য দু’টি নিদর্শন ফেরাউনের শক্তি ও ক্ষমতার দম্ভকে চূর্ণ করে দিল এবং পারিষদবর্গের সামনে লজ্জায় এই অত্যাচারী শাসকের মাথা নিচু হয়ে গেল। এ অবস্থায় উপায়ন্তর না দেখে ফেরাউন হযরত মুসার বিরুদ্ধে নতুন অপবাদ আরোপ করল। কী সেই অপবাদ- তা জানব আমরা পরবর্তী আসরে।

এবারে এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেব:

১. অত্যাচারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিদের সামনে এমন অস্বাভাবিক কিছু করতে হবে যাতে সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।

২. দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণকারী অদ্ভুত কোনো কাজ করা হচ্ছে মহাসত্যের পথে দাওয়াতের অন্যতম কৌশল। হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর ইচ্ছা এবং তাঁরই নির্দেশে এ কাজ করেছিলেন।#