জানুয়ারি ১১, ২০১৭ ১৪:০৪ Asia/Dhaka

এ পর্বে সূরা শুআরার ৪১ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতের তরজমা ও তাফসির উপস্থাপনা করা হবে। এই সূরার ৪১ ও ৪২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 جَاءَ السَّحَرَةُ قَالُوا لِفِرْعَوْنَ أَئِنَّ لَنَا لَأَجْرًا إِنْ كُنَّا نَحْنُ الْغَالِبِينَ (41) قَالَ نَعَمْ وَإِنَّكُمْ إِذًا لَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ (42)

“জাদুকররা ফেরাউনের নিকট এসে বলল- আমরা যদি বিজয়ী হই আমাদের জন্য (বড় ধরনের) পুরস্কার থাকবে তো?” (২৬:৪১)

“ফেরাউন বলল- হ্যাঁ, তখন তোমরা (অবশ্যই) আমার পারিষদবর্গের শামিল হবে।” (২৬:৪২)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, ফেরাউন ও তার দরবারের লোকেরা হযরত মুসা (আ.)-এর অলৌকিক নিদর্শন দেখে তাঁকে জাদুকর আখ্যায়িত করে। তারা আল্লাহর নবীকে তাদের ধারণায় জাদুবিদ্যায় পরাজিত করার জন্য সারা মিশর থেকে দক্ষ জাদুকরদের রাজধানীতে ডেকে নিয়ে আসে। এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে:  জাদুকররা রাজধানী সমবেত হয়ে হযরত মুসাকে জব্দ করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। তারা নিজেদের জাদুর কার্যকারিতার ব্যাপারে এতটা নিশ্চিত ছিল যে জাদুর যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই ফেরাউনের কাছে তার পুরস্কার চেয়ে বসে। তারা ফেরাউনকে বলে: আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী আমরা মুসাকে পরাস্ত করতে পারলে আমাদের কি পুরস্কার দেবেন? স্বাভাবিকভাবেই পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, হযরত মুসাকে পরাজিত করা তখন ফেরাউনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজকাজ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে সে  জাদুকরদের বলে: তোমাদেরকে শুধু নগদ অর্থই দেবো না সেইসঙ্গে দরবারে আমার উপদেষ্টা হিসেবেও নিয়োগ দেব। তোমরা শুধু মুসাকে পরাজিত করো যাতে সে আমার শাসনব্যবস্থার ভিত টলাতে না পারে।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. বস্তুবাদী ও দাম্ভিক ব্যক্তিরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝার ধার ধারে না। তারা শুধুমাত্র নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায়ে ব্যস্ত থাকে। মিশরের জাদুকররা একবারও ভেবে দেখার সময় পায়নি, তারা যে কাজটি করতে যাচ্ছে তা সঠিক নাকি ভুল। তারা শুধু রাজা ফেরাউনের কাছ থেকে বড় ধরনের পুরস্কার লাভের চিন্তায় মত্ত ছিল।

২. অত্যাচারী শাসকরা আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জাদু-টোনাসহ সব ধরনের অস্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

সূরা শু'আরার ৪৩, ৪৪, ৪৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ لَهُمْ مُوسَى أَلْقُوا مَا أَنْتُمْ مُلْقُونَ (43) فَأَلْقَوْا حِبَالَهُمْ وَعِصِيَّهُمْ وَقَالُوا بِعِزَّةِ فِرْعَوْنَ إِنَّا لَنَحْنُ الْغَالِبُونَ (44) فَأَلْقَى مُوسَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُونَ (45)

“(নির্ধারিত দিনে জাদুকররা বিশাল প্রান্তরে সমবেত হলো) মুসা ওদের বলল- তোমাদের যা নিক্ষেপ করার তা নিক্ষেপ করো।” (২৬:৪৩)

“অতঃপর ওরা ওদের দড়ি ও লাঠি নিক্ষেপ করল এবং বলল- ফেরাউনের ইজ্জতের শপথ, আমরা নিশ্চিত বিজয়ী হবো।” (২৬:৪৪)

“অতঃপর মুসা তার লাঠি নিক্ষেপ করল, সহসা তা (বিশাল সাপে পরিণত হলো এবং) ওদের অলীক সৃষ্টিগুলোকে গ্রাস করতে লাগল।” (২৬:৪৫)

অবশেষে নির্ধারিত দিনে রাজধানীর বিশাল এক চত্বরে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হলো জাদুকরদের সঙ্গে হযরত মুসা (আ.)-এর কথিত জাদুর লড়াই দেখার জন্য। হযরত মুসা ও তাঁর ভাই হারুন জনতাকে ভ্রুক্ষেপ না করে সাহসিকতার সঙ্গে ময়দানে উপস্থিত হলেন। তারা নির্ভীক চিত্তে জাদুকরদের প্রতি আহ্বান জানালেন তাদের যার যা সামর্থ্য আছে তা মাটিতে নিক্ষেপ করতে। সারাজীবন জাদুর ভেল্কি দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করতে অভ্যস্ত  জাদুকররা তাদের হাতে থাকা শত শত দড়ি ও লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করে সেগুলোকে সাপে পরিণত করে।  এসব লাঠি ও দড়ি ছোট-বড় নানা আকৃতির সাপে পরিণত হয়ে হযরত মুসা ও তার ভাইয়ের দিকে তেড়ে আসতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষ অসংখ্য সাপ দেখে ভয় পেয়ে যায়।

কিন্তু একই সঙ্গে ফেরাউনের অনুগত এসব মানুষ এই ভেবে খুশি হয় যে, এখনই এ লড়াইয়ে মুসার পরাজয় ঘটবে। তবে এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। হযরত মুসার হাতের লাঠি নিক্ষেপ করার সঙ্গে সঙ্গে বিশাল অজগরে পরিণত হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে জাদুকরদের সব দড়ি ও লাঠিকে গিলে ফেলে। এ দৃশ্য দেখে ফেরাউন, তার পারিষদবর্গ এবং জনগণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। তারা নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।  সারা মিশরের শ্রেষ্ঠ জাদুকররা যে এক নিমিষে পরাভূত হতে পারে তা ছিল তাদের কাছে অবিশ্বাস্য!

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তাঁর ওপর নির্ভর করে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হন এবং প্রতিপক্ষের সংখ্যাধিক্য ও শক্তিমত্তায় তারা মোটেও ভয় পান না।

২. ঈমানদার ব্যক্তিদের হাতে এমন হাতিয়ার থাকা উচিত যা দিয়ে তারা প্রতিপক্ষকে কার্যকরভাবে ঘায়েল করতে পারেন।

৩. ভ্রান্ত পথের কোনো ভিত্তি নেই। তাই এ পথের অনুসারীদের মানসিক অবস্থা থাকে দোদুল্যমান। মিশরের জাদুকরদের অবস্থাও ছিল তাই। এ কারণে হযরত মুসা (আ.)-এর অলৌকিক ক্ষমতা দেখে তারা ভড়কে যায়।

সূরা শু'আরার ৪৬, ৪৭ ও ৪৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ (46) قَالُوا آَمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ (47) رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ (48)

“তখন জাদুকররা সেজদাবনত হলো।”(২৬:৪৬)

“(এবং) বলল- আমরা বিশ্বাসস্থাপন করলাম বিশ্বজগতের প্রতিপালকের প্রতি।” (২৬:৪৭)

“(যিনি) মুসা ও হারুনেরও প্রতিপালক।” (২৬:৪৮)

নগরীর ময়দানে সমবেত হাজার হাজার মানুষ দেখল, একদল জাদুকরের তৈরি করা সাপ দৃশ্যত আরেকজন জাদুকরের তৈরি বিশাল অজগর সাপ খেয়ে ফেলল। কিন্তু সেখানে উপস্থিত সুদক্ষ জাদুকররাই কেবল বুঝল, হযরত মুসা (আ.) যে অজগর তৈরি করেছেন তা কোনো জাদুবিদ্যা নয় বরং অলৌকিক কোনো শক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন একটি দৈব ঘটনা। কোনো মানুষের পক্ষে এ ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়- সে যত বড় জাদুকরই হোক না কেন। আল্লাহর নবীর এ মুজিযা বা অলৌকিক ঘটনার প্রভাবে সব জাদুকর নিজেদের অজান্তেই আল্লাহর সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। সেজদা থেকে উঠে তারা মহাসত্যের সামনে নিজেদের আত্মসমর্পনের ঘোষণা দেয়। কিছুক্ষণ আগেও যারা ফেরাউনের কাছ থেকে পুরস্কার লাভের আশা করছিল এবং নিজেদের জাদুবিদ্যা ফেরাউনের নাম নিয়ে শুরু করেছিল তাদের মধ্যে এমন মহা পরিবর্তন দেখা দেয় যে, তারা ফেরাউনের উপস্থিতির কথা ভুলে গিয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার ঘোষণা দেয়।

শুধুমাত্র মহাসত্যকে উপলব্ধি করার মাধ্যমেই জাদুকরদের মধ্যে এই তড়িৎ পরিবর্তন ঘটে। তারা এ নিশ্চিত বিশ্বাসে উপনীত হয় যে, হযরত মুসা (আ.) যা দেখিয়েছেন তা মহা অলৌকিক ঘটনা এবং কোনো মানুষের পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়। এ বিষয়টি উপস্থিত জনতাকে বোঝানোর জন্য তারা তাদের উপলব্ধিকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করে।

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. বিবেক যা উপলব্ধি করে অন্তর যদি তার কাছে আত্মসমর্পন করে তখনই মানুষ ঈমান আনে।

২. আল্লাহ মানুষকে যেকোনো কিছু করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। ভুল করার পর তা উপলব্ধি করার ক্ষমতাও আল্লাহই দিয়েছেন। এটি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য একটি বড় পুরস্কার।#