ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৭ ১২:০০ Asia/Dhaka

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মানুষের জাগরণ, অধিকার ও স্বাধীনতাকে অবজ্ঞা করছেন ঠিক তখন ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা বা গণজাগরণের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি জানানোর জন্য তেহরানে যে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হলো তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেডিও তেহরানের সাথে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে একথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার মুহা. রুহুল আমীন।

অধ্যাপক রুহুল আমীন বলেন, আরব দেশগুলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। তাদের যে প্রবণতা এখনও দেখা যাচ্ছে তাতে তারা পরাজিত হতে যাচ্ছে। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব, অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন- ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা বা গণজাগরণের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি জানানোর জন্য ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনের গুরুত্ব কতটা?

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতে তেহরানে আন্তর্জাতিক সম্মেলন

অধ্যাপক রুহুল আমীন: দেখুন, ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা বা গণজাগরণের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি জানানোর জন্য ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে  ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিডিয়া এবং সাংবাদিকদেরকে বিশেষ সন্দেহের চোখে দেখছেন।

তিনি মানুষের জাগরণ, অধিকার ও স্বাধীনতা- এ তিনটি বিষয়কে অবজ্ঞা করছেন। আর এ প্রেক্ষাপটকে বর্তমান পরিস্থিতিকে  মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটাপন্ন সময় বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। আর সেই সংকটাপন্ন মুহূর্তে ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষের পক্ষে সংহতি জানানোর জন্য তেহরানে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে হলে এবং তাদের নিজ ভূমি ফিরিয়ে দিতে হলে অবশ্যই বিশ্ব জনমতের সংহতি প্রকাশের বিষয় রয়েছে।

আমেরিকার সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যদিও চেয়েছিলেন ফিলিস্তিনের মুক্তি এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের দিকে যেতে কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট সে বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয় ফিলিস্তিনের ভূমি জবরদখল করে ইসরাইলিরা সেখানে নিত্যনতুন বসতি গড়ে তুলছে এবং ডোনল্ড ট্রাম্প তাদেরকে প্রতিনিয়ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ফিলিস্তিনি জাতিকে সমূলে বিনাশ করার ইসরাইলি ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করতে যেসব রাষ্ট্র গণতন্ত্রে ও মানবাধিকারে বিশ্বাসী তাদের এগিয়ে আসা উচিত। আর সেলক্ষ্যে ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা বা গণজাগরণের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি জানানোর জন্য ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যে সম্মেলনের আয়োজন করেছিল তা অত্যন্ত সঠিক। ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি ফিরিয়ে দেয়া এবং তাদের অধিকার আদায়ের জন্য বিশ্ব সংহতি প্রকাশের জন্য ওই সম্মেলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

রেডিও তেহরান: সম্মেলন শেষ হয়েছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানানোর মধ্যদিয়ে। এর আগেও এ ধরনের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এই আহ্বান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের সামনে বাধা কী?

অধ্যাপক রুহুল আমীন: দেখুন, আমার কাছে মনে হয়েছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর যে আহ্বান এবারের সম্মেলনে জানানো হলো এবং আগেও জানানো হয়েছে তা বাস্তবায়নে বাধার মূল কারণ হচ্ছে- এ আহ্বান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কেন জানাচ্ছে। অর্থাৎ তাদের কাছে সমস্যাটা হচ্ছে ইরান। যদি এ আহ্বান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান না জানিয়ে- ফিদেল কাস্ট্রো জানাতো অথবা মস্কো থেকে পুতিন জানাতো তাহলে বিশ্ব বিষয়টিকে অন্যভাবে নিত।  সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাছে ইরান একটি  অ্যালার্জীর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি খুবই দুঃখজনক বিষয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান পৃথিবীর একটি উদীয়মান শক্তি।

ইরান- বিশ্বের অবহেলিত মানুষের অধিকার, মানবতা ও গণতন্ত্রের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করছে। ইরানের যে আভিজাত্য, যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং মানবাধিকারবোধ সেটি সত্যিই অনন্য। বিশ্বের অন্যান্য জাতির প্রতি অখণ্ডতা ও অধিকার রক্ষার প্রতি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের যে সম্মান প্রদর্শন তা থেকে বলা যায় দেশটি অসাধারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আর সেই অন্যতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার জন্য তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

আর আরব দেশগুলো মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তারা ইহুদিদের পক্ষে এবং ফিলিস্তিনিদের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

রেডিও তেহরান:  ফিলিস্তিন ইস্যুকে মুসলিম বিশ্বের এক নম্বর সমস্যার স্থান থেকে সরিয়ে দিতে কিছু আরব দেশ চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানতে চাইছি- কেন আরব দেশগুলো এমনটা করছে?

অধ্যাপক রুহুল আমীন: আসলে আরব দেশগুলো নিজেদেরকে নিয়ে স্টাডি করে না। তারা ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নেয়নি। তারা আত্মগ্লানিতে ভোগে। এটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়। একটা সময় আসবে যখন আরব দেশগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হবে। তারা এ বিষয়টি আজও অনুধাবন করতে পারছে না। কারণ বিশ্ব রাজনীতি এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে যখন আরব দেশগুলো পুরোপুরি ছিটকে পড়বে।

অবাক হওয়ার বিষয় আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানসহ ৭ টি মুসলিম দেশের অধিবাসীদেরকে তার দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সমালোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। অথচ মার্কিনপন্থি কোনো আরব দেশকে এই তালিকায় রাখা হয়নি। আমার ধারনা খুব শিগগিরই মার্কিনপন্থি এসব আরব দেশগুলো নিজেদের ফাঁদে নিজেরা পড়বে এবং বিশ্ব থেকে ছিটকে পড়বে।

রেডিও তেহরান: লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর উপ মহাসচিব শেইখ নায়িম কাসেম বলেছেন, ফিলিস্তিনকে মুক্ত করবে ইরান।আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- তার এই আশা কতটা যৌক্তিক? ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইরানের ভূমিকার আলোকে যদি আপনি বিষয়টি আলোচনা করেন।  

অধ্যাপক রুহুল আমীন:  দেখুন, বলা চলে হিজবুল্লাহ নেতা যথার্থই বলেছেন। লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর সাথে ইরানের আঞ্চলিক রাজনীতির ঐক্য আছে। আঞ্চলিক রাজনীতি এবং মতাদর্শের ক্ষেত্রে হিজবুল্লাহ সবসময় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে। আর সেক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য ইরানের সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরান–হিজবুল্লাহ সেখানে একসাথে কাজ করবে।

রেডিও তেহরান: কয়েকবার আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়েছে অথচ এখন আরব দেশগুলোর বেশিরভাগই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে এবং অবৈধ এ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত। কেন পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটলো?

অধ্যাপক রুহুল আমীন: আরব দেশগুলোর বেশিরভাগাই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে এবং অবৈধ এ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত এর কারণ হচ্ছে পাওয়ার পলিটিক্স  বা ক্ষমতার রাজনীতি। আরব দেশগুলো প্রথম থেকেই অসচেতন। বিশ্ব রাজনীতিতে তারা সুপার পাওয়ারকে তেল দেয়ার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। আর সেই মাইন্ড সেট থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারেনি। আরব দেশগুলো ভুল করছে এখনও। এখন আর স্নায়ূযুদ্ধের ঝুঁকি নেই। এখন বিশ্ব রাজনীতি নতুন একটু যুগে প্রবেশ করেছে। সাম্প্রতিক সময় নিশ্চয়ই আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন- এখন পাশ্চাত্যের বাইরে একটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে চলে যাচ্ছে বিশ্ব। অথচ আরব দেশগুলোর প্রধানরা এখনও সেই স্নায়ুযুদ্ধের মাইন্ড সেটে থেকেই তাদের চিন্তাভাবনা এগিয়ে নিচ্ছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরবদেশগুলো পরাজিত হতে যাচ্ছে। তাদের এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে আরো বেশি করে পরাজিত হবে। আপনাদেরকে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি ফিলিস্তিনিদেরকে কখনই তাদের ভুমি থেকে উৎখাত করা যাবে না। কারণ ফিলিস্তিন ভূখণ্ড তাদের। তারাই এখানকার মূল অধিবাসী এবং এ মাটি তাদের।

ফিলিস্তিনে-ইসরাইলি আগ্রাসন

পৃথিবী যদি ঠিক থাকে, বাস্তবতা যদি ঠিকপথে এগোয় তাহলে আজ হোক বা কাল হোক–ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূমি উদ্ধার করবেই। বিশ্ব রাজনীতি যেভাবেই চলুক না কেন আমি আশাবাদী ফিলিস্তিনিরা তাদের জাতীয় অধিকার ফিরে পাবে। এমন একদিন আসবে যখন আরব দেশগুলো আপসোস করবে। ফলে এখনও সময় আছে আরব দেশগুলোর উচিত তাদের নীতি পর্যালোচনা করা।

ইরান, রাশিয়া, সিরিয়া, মিশর ও তুর্কি মিলে যে নতুন একটা বলয় বিশ্ব রাজনীতিতে তৈরি হচ্ছে তারা তো সামনের দিনগুলোতে থেমে থাকবে না। তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে আগামী দিনগুলোতে কঠোর অবস্থানে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। আমি আল্লাহর কাছে দুয়া করি ফিলিস্তিনিরা যাতে শিগগিরিই তাদের মাতৃভূমি ফিরে পায়।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৫