‘বিশ্বের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র'
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জঘন্যভাবে বিশ্ববাসীর মানবাধিকার লংঘন করেছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এর দায়-দায়িত্ব আমেরিকাকে বহন করতে হবে। রেডিও তেহরানের সাথে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার তারেক ফজল।
তিনি বলেন, বিশ্বের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে মূল্য দিতে হবে।
বিশিষ্ট এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, বিশ্বের অন্য সব দেশের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে বলা উচিত যে আমেরিকায়ও মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে। আর ছয়টি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়া জঘন্যভাবে মানবাধিকারের লংঘন।
পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক তারেক ফজল, সম্প্রতি আমেরিকা তাদের বার্ষিক মানবাধিকার বিষয়ক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানসহ নানা দেশের মানবাধিকারের সমালোচনা করা হয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে- বহু দেশ এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, খোদ আমেরিকাতেই তো মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে ব্যাপকভাবে। তারা কী করে অন্য দেশের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে? কথাটি কতটা যৌক্তিক?
অধ্যাপক তারেক ফজল: দেখুন, আমেরিকার বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ নিয়ে বহু দেশ তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, খোদ আমেরিকাতেই তো মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে ব্যাপকভাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এই যে প্রশ্নটি তোলা হয়েছে সেটি খুবই ন্যায্য কথা। মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ বিশ্ব পর্যায়ের নেতৃত্বের একটি দায়িত্ব বলে মনে ক’রে যুক্তরাষ্ট্র এ কাজটি করছে এমন একটি বিবেচনা আছে। তবে আমেরিকার নিজস্ব জনগণের মানবাধিকার লংঘনের যে ঘটনাগুলো ঘটছে তাকে ছোটো করে দেখা উচিত নয়। এটাকে অবশ্যই বড় করে দেখার সুযোগ আছে।
তবে আমেরিকা যে নিজেকে একসময় বড় পরাশক্তি বলে মনে করত; মি: ডোনাল্ড ট্রাম্প সে অবস্থা থেকে ঘোষিতভাবে নিজেদেরকে অবনমিত করছেন। এটার ভালো-মন্দ দুটো দিকই থাকতে পারে। শেষ কথা হিসেবে যেটা বলা যেতে পারে সেটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের মানবাধিকার বিষয়ে কথা বলার অধিকার ক্রমশই হারাচ্ছে এবং গুরুতরভাবে হারাচ্ছে।
আর অন্যসব দেশের পক্ষ থেকে যে প্রশ্নটি তোলা হয়েছে যে কিভাবে আমেরিকা অন্য দেশের মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করছে। এ বিষয়টি এভাবেও বলা যেতে পারে যে, অন্য সব দেশের পক্ষ জোরালোভাবে বলা উচিত যে আমেরিকায়ও মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে। এ বিষয়টিও বিশ্ববাসীর সামনে আনা উচিত। তবে সে কাজটি অন্যরা করছে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে নিয়ে যে কাজটি করছে অন্য দেশগুলোরও উচিত সেই কাজটি করা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে সে বিষয়টি তুলে ধরে বিশ্বের অন্য দেশগুলো রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারে এবং বলতে পারে এই হচ্ছে তাদের দেশে মানবাধিকার লংঘনের রিপোর্ট এবং বাস্তবতা। তাহলে বোধহয় তাদের বিরুদ্ধে একটি ভালো জবাব হতে পারে।
রেডিও তেহরান: মানবাধিকার ইস্যুকে বেশিরভাগ সময় আমেরিকা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বলে বহু দেশ অভিযোগ করে। এ অভিযোগকে আপনি কীভাবে দেখবেন?
অধ্যাপক তারেক ফজল: এ বিষয়ে বোধহয় সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ আমেরিকা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বব্যাপী তাদের নিজের রাজনৈতিক প্রাধান্য রক্ষার জন্য অন্যান্য দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে তারা উপস্থাপন করছে। সুতরাং বিশ্বের মানবাধিকার ইস্যুকে বেশিরভাগ সময় আমেরিকা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বলে বহু দেশ অভিযোগ করে আসছে তা প্রায় শতভাগ সত্য বলে মনে করার সুযোগ আছে।
রেডিও তেহরান: আমেরিকায় আজকাল বর্ণবৈষম্যের পাশাপাশি খুন-রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কল্যাণে আমরা তা প্রতিদিনই জানতে পারছি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এ অবস্থার অবনতি হবে বলে অনেকেই আশংকা করছেন। কী হতে যাচ্ছে আসলে?
অধ্যাপক তারেক ফজল: দেখুন, আমার অনুমান হচ্ছে আমেরিকার ভেতরগত যে সংহতির কথা আমরা বাইরে থেকে অনুভব করতাম অথবা তারা ফলাও করে প্রকাশ করত মি. ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই অবস্থার গুরুতর অবনমন ঘটাবে এবং সমস্যা তৈরি করবে। আমেরিকায় এরইমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গদের জাগরণ,পুনর্জাগরণ অথবা নেতিবাচক অর্থে জাগরণ ঘটছে। আর সেই জাগরণের ফলে অন্যদের বিরুদ্ধে ঘৃণা এবং সহিংসতা সৃষ্টি হবে। এরইমধ্যে সেই ঘৃণা ও সহিংসতার পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। এটি আরো ভয়ংকর হতে পারে। কেউ কেউ এমনও মনে করেন যে এই ভয়ংকর বাস্তবতার ধারাবাহিকতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংহতি, ভৌগোলিক সংহতিও সংকটে পড়তে পারে এবং ছিন্নভিন্ন হতে পারে। সুতরাং যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুভাকাঙ্ক্ষী তারা মনে করেন যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের সংহতি টিকিয়ে রাখতে চায় তবে অবশ্যই তাদের সংযত হতে হবে।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছয়টি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এটা কতটা মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জেইদ রা’দ আল-হোসেইন বলেছেন, আমেরিকা থেকে অভিবাসী বের করে দেয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আপনার মতামত কী?
অধ্যাপক তারেক ফজল: মি. ট্রাম্প ছয়টি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মানবাধিকারের লংঘন করেছেন। এ বিষয়ে কথা এবং কাজ উভয় দিক থেকেই তিনি দম্ভের সাথেই এগিয়েছেন। তিনি মনে করছেন তার রাজনৈতিক সমর্থন মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বাড়াতে হলে এই রাজনৈতিক কৌশল তাকে অবম্বন করতে হবে। আর তিনি তার রাজনৈতিক এই অস্ত্রকে সচেতনভাবেই ব্যবহার করছেন।
তবে ছয়টি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়া জঘন্যভাবে মানবাধিকারের লংঘন। এ বিষয়ে দ্বিমতপোষণ করার সুযোগ খুব কম। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যারা মোটামুটি শুদ্ধতা রক্ষা করতে চায় তারা মি. ট্রাম্পকে তার এ কাজের জন্য ঘৃণা করেছেন। প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন এবং সেখানকার আদালত বিষয়টি দেখছে। সম্ভবত একটি পর্যায়ে এ উদ্যোগ তার জন্য বুমেরাং হবে। আমরা যারা সব মানুষের মানবাধিকারে বিশ্বাস করি তারা মনে করি মি. ট্রাম্পের এই উদ্যোগ অবশ্যই ব্যর্থ হবে। সুতরাং ছয়টি মুসলিম দেশের ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মি. ট্রাম্প মানবাধিকার লংঘন করেছেন বলে যে দাবি উঠেছে সে বিষয়ে দ্বিধার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্যই এটি খুব খারাপভাবে মানবাধিকারের লংঘন।
রেডিও তেহরান: জনাব তারেক ফজল, সর্বশেষ যে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিতে চাই তা হচ্ছে- আমেরিকার সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের কারণে সারা বিশ্বে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে- বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে। এ বক্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখবেন?
অধ্যাপক তারেক ফজল: আমি মনে করি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যয্য হস্তক্ষেপ ও কতৃত্বের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আর তার দায় সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহন করা উচিত। আর এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে মূল্য দিতেও হবে। তবে মূল্য পরিশোধের পরিমাণটা কত হবে সে ব্যাপারে হয়ত বিবেচনার বিষয় থাকতে পারে। হয়ত এ ব্যাপারে ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে জঘন্যরকমভাবে বিশ্ববাসীর মানবাধিকার লংঘন করেছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ কারণে বর্তমানে বিশ্ববাসী ব্যাপকভাবে মাশুল দিয়ে চলেছে। এর দায়-দায়িত্ব আমেরিকাকে বহন করতে হবে।
বিশ্বের সব মানুষের উচিত এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা এবং তার কাছ থেকে সেই মূল্য আদায় করা। #
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৩