মার্চ ১৪, ২০১৭ ১৪:১৭ Asia/Dhaka

এ পর্বে সূরা শুআরার ১৪ থেকে ২০ নম্বর আয়াতের তরজমা ও তাফসির উপস্থাপনা করা হবে। সূরায়ে শুআরার ১৪ এবং ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلَهُمْ عَلَيَّ ذَنْبٌ فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونِ (14) قَالَ كَلَّا فَاذْهَبَا بِآَيَاتِنَا إِنَّا مَعَكُمْ مُسْتَمِعُونَ (15)

“আর আমার বিরুদ্ধে তো তাদের একটি অভিযোগও আছে৷ তাই আমার আশংকা হয় তারা আমাকে হত্যা করে ফেলবে৷" (২৬:১৪)

আল্লাহ্ বললেন,"কক্ষনো না, তোমরা দু'জন যাও আমার নিদর্শনগুলো নিয়ে। (২৬:১৫)

আগের পর্বে আমরা ইঙ্গিত দিয়েছিলাম যে, আল্লাহ পাক হযরত মূসা (আ.) কে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন ফেরাউনের আধিপত্যের শৃংখল থেকে বনি ইসরাইলকে রক্ষা করার জন্য ফেরাউনের কাছে যেতে। এই আয়াতে বলা হয়েছে: এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটি সমস্যার কথা মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে বললেন।  সমস্যাটা হলো ইতোপূর্বে আমি একটা কাজ করে ফেলেছি। কাজটা হলো বনি ইসরাইলের এক লোক অত্যাচারী এক ফেরাউনের সাথে ঝগড়া করছিল। আমি মজলুম ওই বনি ইসরাইলকে সাহায্য করতে গিয়ে ওই জালেমকে মেরে ফেলেছি। এখন ভয় হচ্ছে তাদের মাঝে যদি আমি যাই তারা আবার আমাকে মেরে না ফেলে। কিংবা ওই লোককে মেরে ফেলার ঘটনাটা আমার কাজের বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এ কারণে ভয় হচ্ছে আমার ওপরে দেওয়া দায়িত্বটা সঠিকভাবে আঞ্জাম দিতে পারবো কিনা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর জবাবে বলছেন: চিন্তা কর না! উদ্বিগ্ন হয়ো না! কারণ তারা তোমার কোনোরকম ক্ষতি করতে পারবে না। অবশ্য একাকি যেওনা এ গুরুদায়িত্ব পালনের কাজে। তুমি যেমনটি আবেদন করেছ সেভাবেই তোমার ভাই হারুনকে নিয়ে যাও। আর মনে রেখ, আমি তোমাদের সাথে আছি এবং তোমাদের আর ফেরাউনের মাঝে যা ঘটবে বা ঘটছে তা আমি কেবল দেখছিই না বরং খুব কাছ থেকে শুনছি এবং তোমাদের সাহায্যে আছি।

এ দুই আয়াত থেকে আমরা শিখব:

১. শত্রুদের বিরুদ্ধে যে-কোনারকম পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে এবং অভিন্ন চিন্তার অধিকারী যারা তাদের সহযোগিতা নিতে হবে। তবেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আশা করা যায়।

২. যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে হবে কেননা তিনিই বিশ্বাসীদের পৃষ্ঠপোষক।

৩. আল্লাহ তায়ালা সবখানেই আছেন এবং সবকিছু দেখেন। তিনি আমাদের সকল কাজের ব্যাপারেই পুরোপুরি সচেতন।

৪. সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সত্যানুসারীদের সংখ্যাগত স্বল্পতা দেখে কিংবা শত্রুদের সংখ্যাধিক্য, শক্তি বা বিশাল আয়োজন দেখে ভয় পেলে চলবে না।

সূরা শু'আরার ১৬ এবং ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

فَأْتِيَا فِرْعَوْنَ فَقُولَا إِنَّا رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ (16) أَنْ أَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ (17)

“ফেরাউনের কাছে যাও এবং তাকে বলো, রাব্বুল আলামীন আমাদের পাঠিয়েছেন, (২৬:১৬)

“যাতে তুমি বনী ইসরাঈলকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দাও সে জন্য।” (২৬:১৭)

এই দুই আয়াতে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে হযরত মূসা (আ.) কে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোর লক্ষ্য উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়ে বলছেন: আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার কাছে এসেছি তোমাকে বলতে যে, বনি ইসরাইল গোত্রকে তোমার বন্দিদশা থেকে মুক্তি দাও! তাদেরকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে দাও!

এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে নবী রাসূলদের সংগ্রামী ভূমিকার বিষয়টি ফুটে ওঠে। সেইসাথে অত্যাচারীদের জুলুম অত্যাচার থেকে মানুষকে মুক্ত করার দায়িত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। একটি বিষয় এখানে লক্ষ্য করার মতো সেটা হলো তৌহিদ বা এক আল্লাহর ইবাদাতের দাওয়াত দেওয়ার আগে হযরত মূসা (আ.) সমকালীন তাগুতের অত্যাচার থেকে নিজের কওমকে উদ্ধার করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সেইসাথে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের জীবনের প্রতি সর্বপ্রকার ঝুঁকি মেনে নিতেও বলা হয়েছে তাঁকে।

এ দুই আয়াত থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হলো:

১. সত্যের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং নিজেদের রেসালাতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নবীরা অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল ছিলেন। আল্লাহ তাঁদের ওপর যেসব ওয়াহি অবতীর্ণ করতেন সেগুলোকে কোনোরকম কমবেশি না করে হুবহু শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতেন।

২. বিশ্বের সবকিছুই আল্লাহর পরিচালনাধীন। সুতরাং যারা খোদায়ি দাবি করে তাদের মোকাবেলায় দৃঢ়তার সাথে বলতে হবে: সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা একজনই এবং তুমিও সেই একক খোদারই শাসনের অন্তর্ভুক্ত।

সূরা শু'আরার ১৮, ১৯ এবং ২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

  قَالَ أَلَمْ نُرَبِّكَ فِينَا وَلِيدًا وَلَبِثْتَ فِينَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِينَ (18) وَفَعَلْتَ فَعْلَتَكَ الَّتِي فَعَلْتَ وَأَنْتَ مِنَ الْكَافِرِينَ (19) قَالَ فَعَلْتُهَا إِذًا وَأَنَا مِنَ الضَّالِّينَ (20)

"ফেরাউন বলল, আমরা কি তোমাকে আমাদের এখানে প্রতিপালন করিনি যখন ছোট্ট শিশুটি ছিলে? বেশ ক'টি বছর আমাদের এখানে কাটিয়েছো, (২৬:১৮)

"এবং তারপর তুমি যে কর্মটি করেছ তাতো করেছোই; তুমি বড়ই অকৃতজ্ঞ।” (২৬:১৯)

"মূসা জবাব দিল, সে সময় অজ্ঞতার মধ্যে আমি সে কাজ করেছিলাম।” (২৬:২০)

ফেরাউন মূসা (আ.) এর কথা শুনে মূসা (আ.) এর রেসালাত সম্পর্কে কিংবা তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে কথা না বলে হযরত মূসার অতীতের দিনগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছিল। এর কারণ হলো মূসা (আ.) কে অপমান করা এবং তিনি যে ফেরাউনের কাছে ঋণী সে কথা তুলে ধরা। প্রথমেই সেই সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছিল যখন ফেরাউনের কাছের লোকেরা নীলনদ থেকে মূসা (আ.) কে তুলে নিয়েছিল এবং বছরের পর বছর তাকে লালন পালন করে বড় করেছিল। যে সময় বনি ইসরাইলের ছেলে সন্তানদের মেরে ফেলা হচ্ছিল এবং কোনো একটি পরিবারও এই নিয়মের বাইরে ছিল না, সেই সময় আল্লাহর অনুগ্রহে মূসা (আ.) স্বয়ং ফেরাউনের প্রাসাদে অত্যন্ত আদর যত্নের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণ নিরাপত্তার সাথে বেড়ে উঠলেন।

ফেরাউনের এই ইতিহাসের প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলার চেষ্টা করেছিল: তুমি তো আমাদের খেয়েদেয়েই বড় হয়েছো! এখন কীভাবে আমার সাথে এভাবে কথা বলার মতো স্পর্ধা দেখাচ্ছো এবং এ ধরনের আবেদন জানাচ্ছ!?

দ্বিতীয় যে দিকটির প্রতি ফেরাউন ইঙ্গিত করেছিল তা হলো: মূসার হাতে এক সময় মারা গিয়েছিল এক কিবতি বা জিপসি। এটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মূসার অবস্থানকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল ফেরাউন। কারণ হলো এই প্রশ্ন তোলা যে, একজন খুনি কী করে নবী হতে পারে! অপরদিকে মূসার প্রতি এটা এক ধরনের হুমকিও ছিল যে তুমি যদি তোমার কাজ চালিয়ে যাবার চেষ্টা কর তাহলে কেসাস করা হবে এবং প্রাণ নিয়ে যেতে পারবে না।

কিন্তু মূসা (আ.) তো নবী। তিনি ফেরাউনের এ বক্তব্যের জবাবে বললেন: এক কিবতি আর এক বনী ইসরাইলের মাঝে যখন সংঘর্ষ লেগেছিল আমি তখন মজলুমের সাহায্যে এগিয়ে গিয়েছিলাম এবং জালেমকে আঘাত করেছিলাম। আমি জানতাম না যে আমার এক আঘাতেই ওর কাজ সারা হয়ে যাবে। তাকে মেরে ফেলার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। আমি চেয়েছি মজলুমকে জালেমের হাত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। কিন্তু কোনোরকম পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই অপ্রত্যাশিতভাবে আমার এক আঘাতই জালেমের মৃত্যুর কারণ হয়ে গিয়েছিল।

এ আয়াতগুলো থেকে শিক্ষণীয় হলো:

১. উপকার করে খোঁটা দেওয়া ফেরাউন অথবা শক্তিমানদের বৈশিষ্ট্য।

২. কারো সেবা করা বা উপকার করার মানে এই নয় যে তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করা যাবে। উপকার করার অজুহাত তুলে উপকৃতজনের কাছ থেকে গোলামি প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।

৩. সর্বাবস্থায় সরল সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা দেওয়া এবং সৎ কাজের আদেশ দেওয়া কর্তব্য। এমনকি যাকে নির্দেশনা দেওয়া হবে সে যদি পিতা-মাতা কিংবা অভিভাবকও হন কিংবা এমন কেউ যিনি দীর্ঘদিন সেবা দিয়েছেন।

৪. আল্লাহর খাস আওলিয়ারা যে পরিবেশেই বসবাস করে থাকুন না কেন ওই পরিবেশের প্রভাব তাঁদের ওপর পড়ে না। মূসা (আ.) ফেরাউনের প্রাসাদে বেড়ে ওঠার পরও ওই প্রাসাদের প্রভাব তাঁর ওপর পড়ে নি।#