মার্চ ৩০, ২০১৭ ১৬:৪৩ Asia/Dhaka

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপদ সড়ক চাই বা নিসচা’র প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। রেডিও তেহরানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপনা করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

তিনি বলেন, সত্যিকারার্থে বাংলাদেশে যথাযথ সড়ক নীতিমালা করা হয়নি। বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাটা আসলে ইচ্ছাধীনভাবে গড়ে উঠেছে।

রেডিও তেহরান:  জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণগুলো কী?

ইলিয়াস কাঞ্চন: বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তারমধ্যে প্রধান কারণটি হচ্ছে- দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি।

তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে রাজনৈতিকভাবে এখানে সদিচ্ছাটা খুবই কম যে কারণে এখানে অপরিকল্পিতভাবে একটা সড়ক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে।

সত্যিকারার্থে বাংলাদেশে যে ধরনের সড়ক নীতিমালা দরকার ছিল সেটা হয়নি। পরিবহন খাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে এর সুস্থ ব্যবস্থাপনা করার বিষয়টি কখনও কোনো সরকার করেনি।

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাটা আসলে ইচ্ছাধীনভাবে গড়ে উঠেছে। এখানে চালকের একটা বিষয় আছে। সাধারণত সারা পৃথিবীতে এ বিষয়টা প্রযোজ্য যে চালককে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। গাড়ি চালানোর জন্য চালককে খুব ভালোভাবে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। আর সেই প্রশিক্ষণ শুধু গাড়ি চালানো নয়; একজন চালককে তার মানসিক অবস্থা, আচরণগত বিষয়সহ আরো অন্যান্য ব্যাপারে প্রশিক্ষণের যে বিষয়টি থাকে সেটি আমাদের এখানে গড়ে ওঠেনি। তাদের জন্য আমরা সেই ব্যবস্থাটি কখনও করিনি।

আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় সেটা হচ্ছে- আমাদের এখানে চালকের সংখ্যাও বেশ কম। বিআরটিএর নিবন্ধনকৃত ৩০ লাখ যানবাহনের  জন্য আমাদের চালকের সংখ্যা মাত্র ১৯ লাখ। এখানে ১১ লাখ চালকের বিরাট একটি ঘাটতি রয়েছে। অথচ হেভি যানবাহন চালানোর জন্য ২ জন চালক লাগে। সেখানে দুজন বাদ দিয়েও আমাদের ১১ লাখ চালকের ঘাটতি রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশে মোটরসাইকেলসহ যে ৩০ লাখ যানবাহন রয়েছে সেগুলো কিন্তু বসে থাকে না। সেগুলো কোনো না কোনোভাবে রাস্তায় চলছে। হয়তোবা হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো হচ্ছে অথবা অদক্ষ চালক দিয়ে চালানো হচ্ছে। আর এসব কারণে আমাদের এখানে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি। একইসাথে আমাদের সড়কের ডিজাইন সঠিক নয়; এবং এখানে ট্রাফিক রুলস মানা হয় না। তাছাড়া ট্রাফিক রুলস মেনে চলার জন্য যে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার সেরকমটি এখানে নেই। সড়ক মনিটরিংয়েরও কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। যে যারমতো চলছে, রাস্তায় গাড়ি নামাচ্ছে, আনফিট গাড়ি, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়িও এখানে চলছে।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র

আমাদের দেশে পরিবহন ব্যবস্থায় সামগ্রিক একটা অনিয়ম বিরাজ করছে। যার জন্য সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না।

আর সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে রিকশার লাইসেন্স করতে হয়। কিন্তু যিনি রিকশা চালাবেন তার কিন্তু লাইসেন্স করতে হয় না।

রেডিও তেহরান: ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে জাতিসংঘকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ অবস্থায় সরকার, দুর্ঘটনা কমাতে কি ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?

ইলিয়াস কাঞ্চন: দেখুন, আপনি যে প্রশ্নটি করলেন জাতিসংঘকে বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। সেটা মূলত আমাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। আমাদের চাপের কারণেই সরকার কিছু কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে।

তারমধ্যে রয়েছে- আমাদের যে দুই লেনের রাস্তা ছিল তারমধ্যে কয়েকটি হাইওয়েতে ফোর লেন করা হয়েছে। কিছু ব্লাক স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্লাক স্পট মানে হচ্ছে যেখানে বারবার দুর্ঘটনা ঘটে থাকে সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত  করা। এভাবে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

আমরা দাবি করেছিলাম হাইওয়ে পুলিশ দেয়ার। সরকার তাও কিছুটা করেছে। তবে হাইওয়ে পুলিশ যে পরিমাণ দেয়া দরকার এবং তাদের যতটা কাজ করা দরকার তারা তা করছে না। তারা অতটা শক্তিশালী হয়নি।

পাশাপাশি সরকার সড়ক ব্যবস্থা নিয়ে একটি জাতীয় কাউন্সিল গঠন করেছেন। সেখানে সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা পরামর্শ দেয়া হয় কিন্তু আসলে সেসব পরামর্শ কোনো কাজে আসে না এবং বাস্তবায়িত হয় না।

আমরা দাবি করেছিলাম স্কুলের পাঠ্যক্রমের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক ব্যবহারের বিধিগুলো সন্নিবেশিত করার। যাতে শিক্ষার্থীরা ছোটোবেলা থেকে সড়ক ব্যবহারের নিয়মগুলো শিখতে পারে এবং সেভাবে রাস্তা ব্যবহার করতে পারে। সেটিও চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে  সন্নিবেশিত হয়েছে তবে পরিপূর্ণভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

রেডিও তেহরান: জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন, আপনি প্রায়ই সচেতনতার অভাবেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে বলে বিভিন্ন সভা সেমিনারে বলে থাকেন। তো সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য বাংলাদেশ সরকারসহ বিভিন্ন মহল কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে?

ইলিয়াস কাঞ্চন: দেখুন, বিভিন্ন মহল কি করছে সেটা আমি বলতে পারব না তবে আমরা যে কাজটি করছি সেটা হচ্ছে- আপনি জানেন যে আমি একজন শিল্পী। আমার ঝুলিতে এমন এমন ছবি আছে যেটি রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা করেছে। যার রেকর্ড এখনও কেউ ভাঙতে পারেনি। আমার এতটাই জনপ্রিয়তা আছে দেশের মাটিতে। তাছাড়া আমার একটা গ্রহণযোগ্যতাও আছে। যে কারণে আমি যখন দেশের যেকোনো অঞ্চলে সমাবেশ বা সভা সেমিনার করার জন্য যাই তখন সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। তখন সব শ্রেণির মানুষদেরকে আমরা সচেতন করার চেষ্টা করি। সবাইকে আমরা সড়ক দুর্ঘটনাসহ এসব ব্যাপারে বোঝানোর চেষ্টা করি, র‍্যালি করি। এমনকি আমরা অশিক্ষিত চালক যারা আছেন এবং এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন তাদেরকে দক্ষ করার চেষ্টা করে থাকি।

পাশাপাশি আমার যতটুকু সামর্থ্য আছে তারমধ্যে থেকে খুব ছোটো পরিসরে একটা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করেছি। সেখানে শিক্ষিত  বেকারদের বিনা পয়সায় ট্রেনিং দিচ্ছি। তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের টাকাটাও আমরা দিচ্ছি। এভাবেই সর্বত্র আমরা মানুষকে সচেতন করার কাজ করে যাচ্ছি।

রেডিও তেহরান:  সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কমাতে আপনি আমাদের শ্রোতা ও পাঠকদেরকে কি পরামর্শ দেবেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন: দেখুন, আমি সব সময় একটা কথা বলে থাকি সেটা হচ্ছে অন্যকে সচেতন করার চেয়ে নিজে আগে সচেতন হোন। আমি দেখেছি একটা দুর্ঘটনা ঘটলে গাড়িতে থাকা যাত্রীরা বলে থাকেন চালক এই করেছিল- সেই করেছিল ইত্যাদি। তবে এ বিষয়ে বুঝানোর কাজটা কিন্তু কেউ করি না। সে কারণে আমি মনে করি যারা যাত্রী হবেন তারা যেন তাদের নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করেন। যারা পথচারী হবেন তারাও যেন তাদের দায়িত্ব পালন করেন। কেবলমাত্র চালককে দোষী না করে আমরা পথচারীরা যদি আমাদের নিজেদের দোষ দূর করতে পারি তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩০