এপ্রিল ০৪, ২০১৭ ১৩:৩৯ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৩৬ থেকে ৪০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 فَلَمَّا جَاءَ سُلَيْمَانَ قَالَ أَتُمِدُّونَنِ بِمَالٍ فَمَا آَتَانِيَ اللَّهُ خَيْرٌ مِمَّا آَتَاكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُونَ (36) ارْجِعْ إِلَيْهِمْ فَلَنَأْتِيَنَّهُمْ بِجُنُودٍ لَا قِبَلَ لَهُمْ بِهَا وَلَنُخْرِجَنَّهُمْ مِنْهَا أَذِلَّةً وَهُمْ صَاغِرُونَ (37)

"অতঃপর যখন দূত সুলায়মানের কাছে আগমন করল, তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি ধনসম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদেরকে প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাক।" (২৭:৩৬)

"তোমরা ফিরে যাও তাদের কাছে। এখন অবশ্যই আমি তাদের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব, যার মোকাবেলা করার শক্তি তাদের নেই। আমি অবশ্যই তাদেরকে অপদস্থ করে সেখান থেকে বহিষ্কৃত করব এবং তারা হবে লাঞ্ছিত।" (২৭:৩৭)

আগের আয়াতের ব্যাখ্যায় আমরা বলেছি, চিঠির উত্তরে সাবার রানি উপহার সামগ্রীসহ কয়েক জন দূতকে হজরত সুলায়মান (আ.)'র কাছে পাঠান। সাবার রানি সম্ভবত: হজরত সুলায়মান (আ.)'র কাছে দামী উপহার পাঠিয়ে এটা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন যে, সুলায়মান প্রকৃতই আল্লাহর নবী নাকি যুদ্ধ করে ধন-সম্পদ ও দেশ দখলই তার উদ্দেশ্য। কারণ সাবার রানি বিলকিস জানত, আল্লাহর নবীগণের ধন-সম্পদের লোভ নেই এবং তাঁরা কখনোই কোন কারণে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করা থেকে ক্ষান্ত হন না। কিন্তু দুনিয়াপুজারী রাজারা সব কিছু করেন ব্যক্তিগত স্বার্থে ও ক্ষমতার জন্য।

এরই ধারাবাহিকতায় সূরা নমলের ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে,  সাবার রানির পাঠানো উপহার সামগ্রী পৌঁছার পর হজরত সুলায়মান (আ.) সেগুলো দেখে খুশি হননি বরং তিনি উপহার সামগ্রীকে ঘুষ ও প্রতারণা হিসেবে গণ্য করে বলেন: তোমরা কি ভেবেছো আমি লোভী এবং ধন-সম্পদ অর্জনই আমার লক্ষ্য। আর এজন্যই কি তোমরা এসব উপহার সামগ্রী আমার জন্য এনেছ? কিন্তু আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের এসব উপহারের চেয়ে অনেক উত্তম।

হজরত সুলায়মান বলেন-আমি চাই, তোমরা আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পন কর। কিন্তু তোমরা যদি তা না কর, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী নিয়ে উপস্থিত হব। আমি অবশ্যই তোমাদেরকে অপদস্থ করে সেখান থেকে বহিষ্কৃত করব এবং তোমরা হবে লাঞ্ছিত। আমি ভেবেছিলাম, আমার চিঠি পড়ে তোমরা তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা শুরু করবে এবং আমার কাছে নবুয়্যত সংক্রান্ত প্রশ্ন করবে। কিন্তু তোমরা তা না করে আমাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য উপহার সামগ্রী নিয়ে এসেছ।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নবী-রাসূলগণ (স.) কখনোই বৈষয়িক স্বার্থে কাজ করেন না এবং অর্থ-সম্পদের মাধ্যমে তাদেরকে লক্ষ্যচ্যুত করা যায় না।

২. বিরোধীদের মোকাবেলার ক্ষেত্রেও অবশ্যই যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। তবে কেউ যদি যুক্তি না মানে এবং আল্লাহকে অস্বীকার করে, তাহলে প্রয়োজনে তাদের সামনে শক্তি প্রদর্শন করতে হবে।

৩. অতীতেও জিহাদের সংস্কৃতি ছিল।

সূরা নমলের ৩৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ (38)

"সুলায়মান বললেন, হে আমার পারিষদবর্গ, তারা আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকিসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?" (২৭:৩৮)

সুলায়মান (আ.)'র সঙ্গে দেখা করে সাবার রানির দূতেরা সুলায়মানের প্রতিক্রিয়া সাবার রানির কাছে পৌঁছে দেয়। এরপর রানি তার মন্ত্রীদের নিয়ে সুলায়মান (আ.)'র সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা যে সুলায়মান (আ.)'র সঙ্গে যুদ্ধ করতে চান না, সে কথাও ওই বৈঠকে জানিয়ে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন সাবার রানি। হজরত সুলায়মান (আ.) ঐশী জ্ঞানের মাধ্যমে সাবার রানির আগমনের খবর জানতে পারেন এবং রাজ দরবারে উপস্থিত সবাইকে বলেন, হে আমার পারিষদবর্গ, তোমাদের মধ্যে কে আছ যে, বিলকিস আমার দরবারে পৌঁছার আগেই তার সিংহাসন ইয়েমেন থেকে সিরিয়ায় নিয়ে আসতে পারবে?

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. আল্লাহর নবীগণ অনেক বিষয়েই আগাম সংবাদ পেয়ে থাকেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

২. অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব। এ কাজ নবী-রাসূলদের বাইরে অন্যরাও করতে পারে। এ কারণে হজরত সুলায়মান (আ.) তার দরবারের লোকদের কাছে এ প্রশ্ন করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে সিংহাসনটি অতি স্বল্প সময়ে এনে দিতে পারবে?

সূরা নমলের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَ عِفْريتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آَتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ (39) قَالَ الَّذِي عِنْدَهُ عِلْمٌ مِنَ الْكِتَابِ أَنَا آَتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ فَلَمَّا رَآَهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهُ قَالَ هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ (40)

"এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বে আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিমান, বিশ্বস্ত।" (২৭:৩৯)

"ঐশী গ্রন্থের জ্ঞানসম্পন্ন একজন বলল, আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলায়মান যখন সিংহাসনটি তার সামনে দেখতে পেলেন, তখন বললেন এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, নাকি অকৃতজ্ঞ হই। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিশ্চিতভাবে তার নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে (তার নিজেরই ক্ষতি করে)। আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত ও কৃপাশীল।" (২৭:৪০)       

হজরত সুলায়মান (আ.) অল্প সময়ের মধ্যে বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেন থেকে  সিরিয়ায় আনতে বললে দরবারে উপস্থিত দু'জন এ কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরমধ্যে একজন ছিল জিন এবং ওই জিন হযরত সুলায়মান (আ.)'র দরবারে কাজ করতে। সে বলে, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার আগেই বিলকিসের সিংহাসন আপনার সামনে এনে দেব।

অন্য একজন ছিলেন সুলায়মান (আ.)'র মন্ত্রী, যিনি সুলায়মান (আ.)'র মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। তিনি চোখের পলকে বিলকিসের সিংহাসন আনতে পারবেন বলে জানান। সুলায়মান(আ.) ওই মন্ত্রীর প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং মন্ত্রীকে বিলকিসের সিংহাসন আনার নির্দেশ দেন। আর ওই মন্ত্রী অল্প সময়ের মধ্যেই বিলকিসের সিংহাসন সুলায়মান (আ.)'র দরবারে হাজির করেন।

কাজটি কঠিন হলেও সুলায়মান (আ.)'র মন্ত্রী তা সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন। আর এজন্য সুলায়মান (আ.) আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। যাতে কারো মধ্যে এ কঠিন কাজ করার জন্য অহংকার চলে না আসে। সবাই যেন মনে রাখে এ ধরনের সাফল্য শুধুমাত্র আল্লাহর সাহায্যেই অর্জন করা সম্ভব।  তাই সবসময় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হবে। যদিও আল্লাহতায়ালা আমাদের কৃতজ্ঞতার মুখাপেক্ষী নন। তিনি এসবের অনেক উর্ধ্বে।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১.  মানুষ ঐশী জ্ঞান ব্যবহার করে প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

২. মানুষ এখন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো বস্তুর শব্দ ও ছবি একই সময়ে বিশ্বের সর্বত্র পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু বস্তু স্থানান্তরের ক্ষেত্রে স্থান ও কালের গন্ডিকে পুরোপুরি উপেক্ষা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে তা অসম্ভব কিছু নয়।

৩. জ্ঞান ও ক্ষমতা নিয়ে কারোরই গর্ব করা উচিত নয়।  কারণ আমাদের কাছে যে জ্ঞান ও ক্ষমতা রয়েছে, তা পরম দয়ালু মহান আল্লাহর প্রদত্ত নেয়ামত। #