ঢাকা ঘোষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের একান্ত সাক্ষাৎকার
আইপিইউ সম্মেলন শেষে ঢাকা ঘোষণায় যে কথাগুলো বলা হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে বিশ্বের নতুন সার্বভৌমত্ব মতবাদের পুরো বিপরীত। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি'র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ ইস্যুত পশ্বিমারা দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে। জঙ্গিবাদ দমনের অজুহাতে সাম্রাজ্যবাদীরা বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ করছে। শুধু হস্তক্ষেপ এ অজুহাতে অনেক দেশকে তাদের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে বাধ্য করছে।
পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: ঢাকা ঘোষণার মধ্যদিয়ে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন বা আইপিইউ সম্মেলন শেষ হয়েছে। স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বন্ধসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৮ দফা খসড়ার প্রস্তাব ও পারস্পরিক সহায়তার আশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। শক্তিধর ও প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে অন্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়? আইপিইউ'র এ প্রস্তাবে ওইসব দেশ কি সাড়া দেবে বলে আপনার মনে হয়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেখুন, ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন বা আইপিইউ সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়াটা এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিরাট বড় একটি ঘটনা। বলা চলে বহু বছর পর এরকম একটি সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো। আর সেই সম্মেলন থেকে ঢাকা ঘোষণা গ্রহণ করা হয়েছে। যেখানে ১৮ দফা-প্রতিশ্রুতি বা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এই ‘আইপিইউ’ নি:সন্দেহে খুবই বড় একটি ফ্রন্ট। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অনেক বড় আন্তর্জাতিক সমাবেশ। অন্তত তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে এতে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়েছে-এমনটি ধরে নেয়া যায়। কিন্তু প্রথমেই একটি বড় প্রশ্ন অনেকেই তুলছে সেটি হচ্ছে যে, এখানে যে সিদ্ধান্তই নেয়া হোক না কেন সেটা কার্যকর করার কোনো ম্যাকানিজম কি এই ফ্রন্টের আছে।
একমাত্র জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদে যদি কোনো একটা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সেটা কার্যকর করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ ওই সংঘের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু ‘আইপিইউয়ে’র কোনো ঘোষণা বা সিদ্ধান্ত জাতিসংঘকে মেনে নিতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সুতরাং পরবর্তীকালে এই ঘোষণাকে কতটুকু মর্যাদা এবং গুরুত্ব জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দেয়া হবে সেটা দেখার বিষয়। আদৌ সেখানে এ বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব নিয়ে উত্থাপিত হবে এবং সেটা একটা মৌলিক্ আলোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত করা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখার বিষয়।
এখানে আরেকটি বিষয় আমি লক্ষ্য করলাম সেটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিশেষ করে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে বিবিসি, সিএনএন- তারা ঢাকা ঘোষণার সিদ্ধান্তগুলোর কথা তেমন গুরুত্বের সাথে প্রচার করেনি।
আর যদি মূল বিষয়বস্তুর কথা বলেন, ‘কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে’। এক্ষেত্রে বলব এটি বহু দিনের পুরনো দাবি। আমরাও এই দাবিতে বহু সংগ্রাম করেছি এবং এখনও সংগ্রাম করা প্রয়োজন বলে মনে করি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতন্ত্রায়নের অর্থ এরকম যে, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ ও জাতির সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর তার ভিত্তিতে বিশ্ব সম্পর্কের কাঠামোকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। এরমধ্যে জাতিসংঘের গণতান্ত্রায়নের প্রশ্নটাও থাকবে।
কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো নতুন মতবাদ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। তারা সীমিত সার্বভৌমত্বের কথাটি কেবলমাত্র প্রচার করছে এবং প্রয়োগ করছে। এ প্রসঙ্গে তারা এই যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যে, তাদের নিজস্ব স্বার্থের অধিনস্ত যে শক্তি সেটাই হচ্ছে তাদের ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। আর সেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অগ্রহণযোগ্য কোনো ঘটনা যদি কোনো দেশে ঘটে তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেই দেশের ওপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে।
আর সেই অর্থে তারা বলে বিশ্বায়নের নতুন যুগে এখন পরিপূর্ণ সার্বভৌমত্বের কোনো সুযোগ এবং অধিকার কারো নেই। ঢাকা ঘোষণায় যে কথাগুলো বলা হলো, সেই কথাগুলো সুস্পষ্টভাবে বিশ্বের নতুন সার্বভৌমত্ব মতবাদের পুরো বিপরীত বিষয়।
হ্যাঁ একথা সত্য এ বিষয়টি এখানে খুবই ন্যায়সঙ্গত বিষয় হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে। আমি মনে করি, অবশ্যই এর ভিত্তিতে আমাদের বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পথ রচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রচণ্ডরকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে বাধ্য। আর সেই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার জন্য সংগ্রাম করতে ‘আইপিইউয়ে’র দেশগুলো রাজি হবে কিনা সেটা একটা বিষয়। যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে জোরালভাবে ভোট দিয়েছে তারা যদি সংগ্রাম করতে সম্মত থাকে তাহলে এর যথাযথ ফলাফল প্রতিফলিত হবে।
রেডিও তেহরান: জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথাও বলেছেন সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের নেতারা। অভিযোগ রয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বললেও এ বিষয়ে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে। এসব দেশ গোপনে জঙ্গিদের সহযোগিতা করছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেখুন, আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন সেটি একেবারে শতভাগ সত্য। পৃথিবীর সবাই একথা জানে যে একসময় আফগানিস্তানে, পরবর্তীকালে লিবিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে এমনকি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি- আমাদের বাঙালী প্রবচনে একটি কথা আছে, সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ে’। সুতরাং তারা হস্তক্ষেপের একটা অজুহাত সৃষ্টি করার জন্যই তাদের মতো করে হোম মেড একটা শক্র তৈরি করার পদক্ষেপ নেয়। সেই ঘটনা আমরা দেখেছি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সাম্রাজ্যবাদের জন্য একটা শক্র সৃষ্টি করা অপরিহার্য ছিল। তাদের হাতের তৈরি এই দানবীয় শক্রকে দমন করার কথা বলেই তারা বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ করছে। শুধু হস্তক্ষেপ করেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না; যেসব দেশে তারা হস্তক্ষেপ করছে না-জঙ্গিবাদের কথা বলে তাদেরকে আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে বাধ্য করছে। সুতরাং ঢাকা ঘোষণায় যে কথাগুলো বলা হয়েছে তাকে বাস্তবায়ন করতে হলে সারাবিশ্বে যে সাম্রাজ্যবাদী দানবীয় শক্তি জঙ্গিবাদ নিয়ে খেলছে তাদেরকে মোকাবেলা করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্রাজ্যবাদ এ দুটো মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটা আরেকটাকে লালন করে চলেছে। সুতরাং এই লড়াইয়ে জিততে হলে ওই দুই শক্রকে একই সঙ্গে মোকাবেল করতে হবে।
রেডিও তেহরান: আইপিইউ সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের কথা বলা হয়েছে। আসলে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে কি কি পদক্ষেপ জরুরি বলে আপনার মনে হয়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: জ্বি, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন। আমি শুরুতে যেটা বলেছিলাম যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন একটি ভিত্তি যদি রচনা করতে হয় বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতান্ত্রায়ন করতে হয় তাহলে সেটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেই শুধু প্রযোজ্য হবে না সেটাকে অবশ্যই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে- নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রচার চালানো হয়ে থাকে উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর সাহায্যে অনুন্নত দেশগুলো চলে। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। আমি অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে নানা প্রবন্ধে এ বিষয়টি দেখিয়েছি যে, বাস্তবতা হচ্ছে অনুন্নত দেশের সম্পদ প্রবাহিত হয়ে উন্নত দেশগুলোকে সমৃদ্ধ করছে। আর এই শোষণের প্রক্রিয়াটা তারা অব্যাহত রেখেছে।
সারা দুনিয়ার মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ- পৃথিবীর অর্ধেক সংখ্যক মানুষের অর্থের চেয়ে বেশী। এই চরম বৈষম্যের চিত্র ক্রমাগতভাবে আরো চরম আকার ধারন করছে। আর সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবলমাত্র ঢাকা ঘোষণা বা এরকম দুচারটা ঘোষণার মাধ্যমে সম্ভব নয়। আরো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
রেডিও তেহরান: দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সাহায্যে দ্রুত এগিয়ে আসার জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আমরা বর্তমান যুগেও কোনো কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ হতে দেখছি। আসলে এটা কেন। এর জন্য দায়ী কারা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেখুন, ঢাকা ঘোষণার এই অংশটাও আমি সমর্থন করি। এটা বিশ্ব মানবতার দায়িত্ব যে দুর্গত জনগণের পাশে এসে দাঁড়ানো। এটা ক্রমাগতভাবে যুগের পর যুগ আমাদের করে যেতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্র্য উৎপাদনকারী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে আমরা মুক্ত না হতে পারব। ভাঙা কলসিতে যতই পানি ঢালা হোক না কেন ওই কলসি কখনও ভরবে না। আমরা একটা ইশতেহার দিয়ে দারিদ্র্যপীড়িত ও দুর্ভিক্ষ কবলিত মানুষদের সাহায্যের চেষ্টা করলাম আর অন্য ১০ ইশতেহারের মাধ্যমে দারিদ্র্য এবং দুর্ভিক্ষ অবস্থা সৃস্টির ভিত্তি রচনা করলাম-তাহলে তো সমস্ত ব্যাপারটাই একটা প্রহসনে পরিণত হলো। ফলে এরমধ্যে মানবিকতার ছোঁয়া থাকলেও তা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি আমরা দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক অবস্থার অবসান ঘটাতে না পারি। তবে আইপিউ সম্মেলনে অন্তত এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গিটা উচ্চারিত হয়েছে-এটাই অনেক। এটাকে আরো গভীরভাবে জনগণের মাঝে নিয়ে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করা উচিত।
রেডিও তেহরান: রাষ্ট্র ও সমাজের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে বিশ্বের সমাজগুলো কতটা আন্তরিক বলে আপনি মনে করেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দেখুন, এখানে প্রথমেই একটা ভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। আর সেটা হচ্ছে-রাষ্ট্রের বিপরীতে সমাজকে দাঁড় করিয়ে থাকে তথাকথিত সুশীল সমাজের অনেকে। আর এটার মাধ্যমে সমস্ত সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ দূর করে দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ধরনের সুপারিশ মেনে নিলে সমাজে খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হবে। সমাজের ভেতরে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ যদি না থাকে তাহলে সমাজে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে বিত্তবান শ্রেণি। তারা নির্বিচারে এবং কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সমাজে আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করবে। সুতরাং এখানে এ বিষয়টি দেখা উচিত যে, সমাজের ভেতরেও বৈষম্য রয়েছে। বৈষম্য কেবল রাষ্ট্র বনাম সমাজ নয়; সমাজের অভ্যন্তরেও শ্রেণি-বিভাজন রয়েছে। আর এটাই উৎস হিসেবে কাজ করে রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণে। এরফলে রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের বেশিরভাগ মানুষের একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আসলে বৈষম্য-রাষ্ট্র বনাম সমাজ হোক বা সমাজের অভ্যন্তরে বিত্তবানদের শোষণের মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট হোক; যেভাবেই হোক না কেন এটির অবসানে আমাদের একত্রিত হয়ে কাজ করা উচিত।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৮