এপ্রিল ১২, ২০১৭ ১০:৪৮ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৪১ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৪১ ও ৪৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَ نَكِّرُوا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِي أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ (41) فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ وَأُوتِينَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهَا وَكُنَّا مُسْلِمِينَ (42) وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَعْبُدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِينَ (43)

"সুলাইমান বলল, সে চিনতে না পারে এমনভাবে সিংহাসনটি তার সামনে রেখে দাও, দেখি সে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায় কিনা অথবা যারা সঠিক পথ পায় না তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়।" (২৭:৪১)

"অতঃপর যখন (রানি বিলকিস) এসে গেল, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তোমার সিংহাসন কি এরকমই? সে বলল, মনে হয় এটা সেটাই। আমরা পূর্বেই সব কিছু অবগত হয়েছি এবং আমরা আজ্ঞাবহও হয়ে গেছি।" (২৭:৪২)

"আল্লাহর পরিবর্তে যে উপাস্যের সে পূজা করতো সেটাই তাকে ঈমান আনা থেকে বিরত রেখেছিল৷ সে একটি কাফের জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল (কিন্তু পরে সে কুফরি থেকে বেরিয়ে ঈমান আনে।" (২৭:৪৩)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, রানি বিলকিস আত্মসমর্পণের জন্য তার দরবারের লোকজনকে নিয়ে ইয়েমেন থেকে সিরিয়ায় হজরত সুলায়মান (আ.)'র সামনে হাজির হন। এছাড়া, সুলায়মান (আ.)'র নির্দেশে চোখের পলকে বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসা হয়। আর এ আয়াতে বলা হচ্ছে, হজরত সুলায়মান(আ.), রানি বিলকিসের বিচার-বুদ্ধি ও উপলব্ধি ক্ষমতা যাচাইয়ের সিংহাসনে বাহ্যিক কিছু পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেন। তারপর যখন বিলকিস, সুলায়মান (আ.)'র দরবারে পৌঁছালেন, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তোমার সিংহাসন কি রকমই? সিংহাসনে বাহ্যিক পরিবর্তন আনার পরও রানি বিলকিস বলল, মনে হচ্ছে ওই সিংহাসনটিই এটি। 

সাবার রানি তার নিজের সিংহাসন চেনার পর সুলায়মান (আ.) ও তার দরবারের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন: আপনারা যদি আপনাদের শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করার জন্য এ কাজ করে থাকেন। আসলে আমরা আপনাদের শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনাদের এখানে এসেছি।

এ আয়াতে আরও বলা হচ্ছে,  সাবার রানি যেহেতু কাফেরদের মাঝে বড় হয়েছেন এবং সেখানে সূর্য ও মূর্তি পূজার সংস্কৃতি এতটাই জোরালো ছিল যে, তিনি আল্লাহকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগই পাননি। আর তাই যখনি তার কাছে সত্যের বাণী  পৌঁছল, তখনি তিনি সত্যকে মেনে নিলেন। আর আল্লাহর ওপর ঈমান আনলেন।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কেবল অন্যকে দেখে নয় বরং জ্ঞানের মাধ্যমে বুঝেশুনে ঈমান আনতে হবে।

২. সমাজে যদি কুসংস্কার ও ভ্রান্ত চিন্তা-বিশ্বাস চালু থাকে, তাহলে মানুষকে সত্য পথ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে হয়।

৩. মানুষের মনে যে কোনো সময় পরিবর্তন আসতে পারে। একজনে অতীতে খারাপ ছিল বলেই ভবিষ্যতেও সে খারাপই থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। একজন খারাপ মানুষও ভালো হয়ে যেতে পারে। পৃথিবীতে এমন উদাহরণ বহু রয়েছে।

সূরা নমলের ৪৪ নং আয়াতের তেলাওয়াত ও তর্জমা শুনবো।

قِيلَ لَهَا ادْخُلِي الصَّرْحَ فَلَمَّا رَأَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةً وَكَشَفَتْ عَنْ سَاقَيْهَا قَالَ إِنَّهُ صَرْحٌ مُمَرَّدٌ مِنْ قَوَارِيرَ قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (44)

"তাকে বলা হলো, প্রাসাদে প্রবেশ করো৷ যেই সে দেখলো মনে করলো এটা কোন জলাধার এবং তাতে নামার জন্য নিজের পায়ের নিম্নাংশের বস্ত্র উঠিয়ে নিল (যাতে তার কাপড় ভিজে না যায়)৷ সুলাইমন বলল, (এখানে পানি নেই) এই প্রাসাদ হচ্ছে স্বচ্ছ কাচ ও স্ফটিকের তৈরি৷ এ কথায় (রানি) বলে উঠল, হে আমার রব! (আজ পর্যন্ত) আমি নিজের ওপর জুলুম করে এসেছি এবং এখন আমি সুলাইমানের সাথে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের আনুগত্য গ্রহণ করছি। (২৭:৪৪)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, সুলায়মান (আ.) তার একটি প্রাসাদের আঙ্গিনা কাঁচ ও স্বচ্ছ স্ফটিক দিয়ে তৈরি করে এর নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত করার নির্দেশ দেন। এরপর রানি বিলকিস যখন এর উপর দিয়ে যেতে চাইলেন, তখন তিনি এটাকে প্রবহমান ঝর্ণাধারা মনে করলেন। তাই তিনি নিজের কাপড় যাতে পানিতে ভিজে না যায় সেজন্য তার কাপড় একটু উপরের দিকে টেনে ধরলেন। সুলায়মান (আ.) এ অবস্থায় বিলকীসকে বললেন: এ প্রাসাদ স্বচ্ছ কাঁচ ও স্ফটিক দিয়ে তৈরি। সাধারণত মানুষ তা বুঝতে পারে না। তারা মনে এটি প্রবহমান ঝর্ণাধারা।

সাবার রানির নিজের সুন্দর প্রাসাদ ও সিংহাসন থাকা সত্ত্বেও সুলায়মান (আ.)'র প্রাসাদ ও আঙিনা দেখে বিস্মিত হলেন। হজরত সুলায়মান (আ.)'র এসব কিছুর সামনে রানি বিলকিসের তার নিজের রাজত্ব ও শক্তি-সামর্থ্যকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হলো।

অন্য ব্যাখ্যায় এসেছে, হজরত সুলায়মান (আ.) রানি বিলকীসকে বুঝাতে চেয়েছিলেন, তারা যেন কখনোই যুদ্ধের চিন্তাও না করে। কারণ এর ফলে উভয় পক্ষেরই যথেষ্ট ক্ষতিসাধন হবে।

সাবার রানি এসব দেখে আধ্যাত্মিক দিক থেকেও হজরত সুলায়মানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। 

কারণ তিনি দেখলেন, হজরত সুলায়মান (আ.) সবধরনের সুবিধা ও শক্তি থাকার পরেও দুনিয়া পূজারি নন। তিনি দেখলেন, সুলায়মান (আ.) রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেয়ার প্রতি গভীর মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি দেখলেন রাষ্ট্র পরিচালনা ও দ্বীনের দাওয়াত একইসঙ্গে চলছে। এরপর বিলকীস আল্লাহর কাছে তওবা করলেন এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনলেন।

সাবার রানি যখন সূর্যপূজা ত্যাগ করে আল্লাহর উপর ঈমান আনলেন, তখন সাবার অধিবাসীদের জন্যও আল্লাহর উপর ঈমান আনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো 

১.ধর্ম প্রচারের জন্য অর্থ খরচেরও প্রয়োজন রয়েছে, যেভাবে সুলায়মান (আ.) অর্থ খরচ করে ধর্ম প্রচারের জন্য কাজ করেছেন।

২. প্রকৃত তওবা হল, অতীতের সকল কৃতকর্মকে ঘৃণা করা ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর পরবর্তীতেও আল্লাহর পথে চলা।

৩. বিশ্বজাহানের প্রভুর কাছে নত হওয়াই হল ঈমান। যেভাবে সাবার রানি অবশেষে আল্লাহর কাছে নত হয়ে ঈমান আনে।#