এপ্রিল ১২, ২০১৭ ১৩:৩৫ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৪৫ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার  ৪৫, ৪৬ ও ৪৭  নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ فَإِذَا هُمْ فَرِيقَانِ يَخْتَصِمُونَ (45) قَالَ يَا قَوْمِ لِمَ تَسْتَعْجِلُونَ بِالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الْحَسَنَةِ لَوْلَا تَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (46) قَالُوا اطَّيَّرْنَا بِكَ وَبِمَنْ مَعَكَ قَالَ طَائِرُكُمْ عِنْدَ اللَّهِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تُفْتَنُونَ (47)

"আমি অবশ্যই সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। (সে তাদেরকে বলেছিল) তোমরা আল্লাহর এবাদত করো। কিন্তু তারা দু'টি দলে বিভক্ত হয়ে কলহ করছিল।" (২৭:৪৫)

"(সালেহ) বললেন, কল্যাণের পরিবর্তে তোমরা অকল্যাণকে ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছ কেন? তোমারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না কেন, যাতে তোমরা তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো?" (২৭:৪৬)

"তারা বলল, তোমাকে এবং তোমার সঙ্গে যারা আছে, তাদেরকে আমরা অকল্যাণের কারণ বলে মনে করি। (সালেহ) বললেন, তোমাদের মঙ্গল-অমঙ্গল আল্লাহর কাছে; আসলে তোমরা এমন এক সম্প্রদায়, যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।" (২৭:৪৭)

সূরা নমলের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হজরত মূসা (আ.), হজরত দাউদ (আ.) এবং হজরত সুলায়মান (আ.)'র জীবনের কোনো কোনো ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এ আয়াতে সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে হজরত সালেহ (আ.)-কে নবী হিসেবে পাঠানোর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত সালেহ (আ.) অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সামুদ সম্প্রদায়কে একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। কিছু লোক সালেহ (আ.)'র আহ্বানে সাড়া দিলেও কেউ কেউ সালেহ (আ.)-কে প্রত্যাখ্যান করে। তারা কাফেরই থেকে যায়। এরপর সাধারণভাবেই মুমিন ও কাফেরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও শক্রতার সৃষ্টি হয়। এ দ্বন্দ্ব কখনো ব্যক্তিগত পর্যায়ে আবার কখনো সামাজিক পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়েছে।

হজরত সালেহ (আ.) উগ্র কাফেরদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, তোমাদের কাজের পরিণতি হচ্ছে জাহান্নাম। তোমরা কেন অপছন্দনীয় কাজ করা থেকে বিরত থাকছ না? কেন আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করছ? কিন্তু তারা এসব বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে হজরত সালেহ (আ.)-কে বলত-যদি তুমি আমাদেরকে সত্য বলে থাক, তাহলে কেন আল্লাহ আমাদের উপর আজাব নাজিল করেন না? দুনিয়াতেই কেন বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন না?

হজরত সালেহ (আ.) তাদেরকে বলতেন- কেন তোমরা তোমাদের অতীতের গোনাহর জন্য তওবা কর না এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও না যাতে তোমাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়? তোমরা এসবের পরিবর্তে উল্টো যাতে আজাব নাজিল হয়, সে জন্য তাড়াহুড়ো করছ। কেন তোমরা তওবা না করে এর পরিবর্তে আজাব নাজিলের জন্য আবেদন করছ? তোমরা কেন আল্লাহর রহমতের জন্য দোয়া করছ না? আল্লাহর রহমতের জন্য দোয়া করলে তোমাদের কল্যাণ হবে। আর যদি আজাবের জন্য দোয়া কর,তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।  তারপরও কেন তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্য ভালো চাচ্ছ না?

এর আগেও দেখা গেছে, আল্লাহকে অস্বীকারকারীরা নবী-রাসূলদের সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদেরকে শহর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে অথবা হত্যা করেছে। হজরত সালেহ (আ.) যখন একত্ববাদের আহ্বান জানাচ্ছিলেন তখন সেখানে খরা ও দুর্ভিক্ষ চলছিল। এ অবস্থায় কাফেররা সালেহ (আ.)-কে উদ্দেশ্য করে বলে- তোমাকে এবং তোমার সঙ্গে যারা আছে, তাদেরকে আমরা অকল্যাণের কারণ বলে মনে করি। তোমার নিজের এবং তোমার অনুসারীদের কথাবার্তার কারণে প্রকৃতি আমাদের ওপর ক্ষেপে গেছে এবং আমাদের জন্য বিপদ সৃষ্টি করেছে।

হজরত সালেহ (আ.) কাফিরদের এসব বক্তব্যের জবাবে বললেন, তোমাদের কল্যাণ ও অকল্যাণের বিষয়টি নির্ধারণ করেন আল্লাহ; বরং তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তোমাদের অকল্যাণের জন্য কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করো না বরং হতে পারে তোমাদের কাজের পরিণতিতে খরা ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়েছে।

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. একত্ববাদের প্রতি আহ্বানকে নবী-রাসূলরা সব সময় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

২. সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এটা সব যুগেই ছিল। কাজেই এমন প্রত্যাশা অযৌক্তিক যে, সবাই সত্যকে মেনে নেবে এবং সৎ বান্দায় পরিণত হবে।

৩. পাপাচারীদেরকে পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করার পাশাপাশি তাদেরকে তওবা করে সৎ পথে ফিরে আসার পথদেখিয়ে দিতে হবে।

৪. নবী-রাসূলদের স্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণের বিপরীতে কাফেররা ভাগ্য গণনার মতো কুসংস্কারকে বিশ্বাস করে যা তাদের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।

সূরা নমলের ৪৮ ও ৪৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَكَانَ فِي الْمَدِينَةِ تِسْعَةُ رَهْطٍ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ (48) قَالُوا تَقَاسَمُوا بِاللَّهِ لَنُبَيِّتَنَّهُ وَأَهْلَهُ ثُمَّ لَنَقُولَنَّ لِوَلِيِّهِ مَا شَهِدْنَا مَهْلِكَ أَهْلِهِ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ (49)

"আর সেই শহরে ছিল নেতৃস্থানীয় নয় ব্যক্তি, যারা দেশময় অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়াত এবং সংশোধন করত না।" (২৭:৪৮) 

“তারা পরস্পর বলল, আল্লাহর কসম খেয়ে শপথ করে নাও, আমরা সালেহ ও তার পরিবার পরিজনদের ওপর নৈশ আক্রমণ চালাব এবং তারপর তার অভিভাবককে বলে দেবো, (হত্যা করাতো দূরের কথা, আমরা) হত্যাকাণ্ডস্থলেও উপস্থিত ছিলাম না। আমরা একদম সত্যবাদী।" (২৭:৪৯)

হজরত সালেহ (আ.) এবং তাঁর সঙ্গীদেরকে হত্যা করার যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, সে সম্পর্কে এ আয়াতে আল্লাহ বলেন: সামুদ গোত্রে এমন কিছু ব্যক্তি ছিল যারা দেশময় অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়াত এবং নিজেদেরকে সংশোধনের চেষ্টা করত না। তারা আল্লাহর নামে এই শপথ করে যে, তারা রাতে হজরত সালেহ (আ.) ও তার পরিবার পরিজনদেরকে হত্যা করবে। তারপর যদি কেউ হত্যাকাণ্ডের জন্য তাদেরকে দোষ দেয় তাহলে তারা তাদের অভিভাবককে বলবে, সালেহ (আ.) ও তার পরিবার পরিজনদের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তাদের কিছুই জানা নেই। নিশ্চয় অন্য কেউ এ কাজ করেছে।

মজার বিষয় হলো, তারা হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য আল্লাহর নামে শপথ করে। অর্থাৎ তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবেই মনে করত। কিন্তু তারা মূর্তিকে ভাগ্য নির্ধারক হিসেবে মনে করত এবং মূর্তি পুজা করত। তারা বলত, আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করে আমাদের অধীনেই ছেড়ে দিয়েছেন। এ কারণে তারা যে কাজকে ভালো মনে করত সে কাজই করত। তাদের মতে, মানব সমাজে নবী-রাসূল পাঠানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। ঠিক যেমনিভাবে বর্তমান সমাজেও কিছু বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, যারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মেনে নিলেও মানুষের স্বেচ্ছাচারিতায় বিশ্বাসী। তারা মনে করেন, মানুষ নিজেই পরিপূর্ণভাবে তার ভাগ্য-নিয়ন্তা। অন্যের ক্ষতি না হলে মানুষ যা ইচ্ছে তাই করতে পারে মানুষ।

মুশরিকরা হজরত সালেহ (আ.)-কে যেভাবে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল, ঠিক সেভাবেই বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ(সা.)'র সময়েও তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। মুশরিকরা এক রাতে প্রত্যেক গ্রোত্র থেকে একজন করে ব্যক্তিকে ডেকে এনে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরিকল্পনা করে। এর মাধ্যমে তারা সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সব গোত্রকে জড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে যাতে রাসূল (সা.)’র অভিভাবক একক কোনো গোত্রকে দোষারোপ করতে না পারে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:  

১. নবী-রাসূলদের বিরোধীরা যুক্তি-প্রমাণকে গুরুত্ব দিত না বরং তারা নবী-রাসূলদের পথে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করত। তারা নবী-রাসূলদেরকে হত্যা করারও পরিকল্পনা করত।

২. সমাজে এমন মূর্খ ও পথভ্রষ্ট লোকও ছিল যারা হজরত মোহাম্মাদ (স.)কে হত্যা করার জন্য আল্লাহর নাম নিয়ে শপথ করেছিল। এটা কিছু মানুষের অজ্ঞতার চরম বহিঃপ্রকাশ। যেমনিভাবে খারেজী সম্প্রদায়ের লোকেরা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নামে মসজিদের ভেতর পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহর মনোনীত হজরত আলী (আ.)-কে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেছিল। এর ফলে তিনি শহীদ হন।#