এপ্রিল ১২, ২০১৭ ১৪:৫২ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৫০ থেকে ৫৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫০ থেকে ৫৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (50) فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنَاهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِينَ (51) فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ (52) وَأَنْجَيْنَا الَّذِينَ آَمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (53)

"তারা সালেহকে হত্যার চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও কৌশল অবলম্বন করেছিলাম। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি।" (২৭:৫০)

"অতএব, দেখ তাদের চক্রান্তের পরিণাম, আমি অবশ্যই তাদেরকে এবং তাদের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছি।" (২৭:৫১)

"এই তো তাদের বাড়িঘর-তাদের অবিশ্বাসের কারণে জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। নিশ্চয় এতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন আছে।" (২৭:৫২)

"যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং পরহেজগার ছিল, তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি।" (২৭:৫৩)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, শক্ররা হজরত সালেহ (আ.)-কে হত্যা করার চক্রান্ত করেছিল। তারা এ শপথ করেছিল যে, নয়টি গোষ্ঠীর কিছু লোক হত্যাকাণ্ডে অংশ নেবে যাতে হত্যাকাণ্ডের দায় এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিতে না হয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল এরকম- হজরত সালেহ (আ.) যখন পাহাড়ের গুহায় গিয়ে নির্জনে মোনাজাতে ব্যস্ত থাকবেন তখন তাকে হত্যা হবে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় পাহাড় ধসে পড়ায় চক্রান্তকারীরা নিহত হয়। এসব আয়াতে আল্লাহ বলছেন: হজরত সালেহ (আ.)-কে হত্যার চক্রান্তকারীরা ভেবেছিল তারা সফল হবে এবং আল্লাহর নবীকে হত্যা করতে পারবে।  কিন্তু শত্রুরা জানত না যে, হজরত সালেহ (আ.)'র সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন সর্বশক্তিমান এবং  তার কাছে কোন কিছুই গোপন থাকে না।  সালেহ (আ.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রকারীরাই কেবল ধ্বংস হয়নি বরং সামুদ গোত্রের যারা হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পক্ষে ছিল তাদের ওপর আল্লাহর কঠিন আজাব নেমে এসেছিল ও তারা ধ্বংস হয়েছে। যদিও আল্লাহতায়ালার কাছে অপরাধী এবং নিরপাধ ব্যক্তি সমান নয়। কাজেই যারা মুমিন এবং আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিল তারা আল্লাহর ইচ্ছায় আজাব থেকে মুক্তি পায়।

এ চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. যদি মু’মিনরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে তাহলে আল্লাহতায়ালা সময়মতো কাফিরদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন এবং কাফেরদেরকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেন না।

 ২. আল্লাহর নীতি হল, মিথ্যার ওপর সত্যকে জয়ী করা। মিথ্যার ফল সাময়িক, এমনকি বাহ্যিকভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফল হলেও তা স্থায়ী হয় না।

 ৩. প্রাচীন নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি যাতে নতুন প্রজন্ম অতীত থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

৪. ঈমানদার ও মুত্তাকি ব্যক্তিরা ইহকালেও পুরষ্কার লাভ করে। যেমনিভাবে পাপাচারী ব্যক্তিদের শাস্তি শুধুমাত্র পরকালের জন্যই নির্ধারিত নয়। ইহকালেও তারা মারাত্মক শাস্তির সম্মুখীন হতে পারে।

সূরা নমলের ৫৪ ও ৫৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ (54) أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ (55)

"স্মরণ কর লুতের কথা, তিনি তাঁর গোত্রকে বলেছিলেন, তোমরা কেন জেনেশুনে অশ্লীল কাজ করছ? অথচ এর পরিণতির কথা তোমরা অবগত আছ!" (২৭:৫৪)

"তোমরা কি কামতৃপ্তির জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক বর্বর সম্প্রদায়।" (২৭:৫৫)

আল্লাহতায়ালা হজরত সালেহ (আ.)'র ঘটনা বর্ণনা করার পর, এ দুই আয়াতে হজরত লুত (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়ের ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। যদিও হজরত লুত (আ.)'র সম্প্রদায় সম্পর্কে আরও কয়েকটি সূরায় বিভিন্ন তথ্য দেয়া হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, হজরত লুত (আ.)'র গোত্রের লোকদের মধ্যে সমকামিতার মত জঘন্য অপরাধের প্রবণতা ছিল। 

পবিত্র কুরআন হজরত লুত (আ.)'র গোত্রের সমকামিতার ঘটনাকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রচুর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করা হয়েছে যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে।

এ দুই আয়াতে আল্লাহ আরো বলেন: হজরত লুত (আ.) সমকামিতার মত জঘন্য অপরাধকে ধিক্কার জানিয়ে গোত্রের লোকদেরকে বলেন: তোমারা তো এ জঘন্য অপরাধ সম্পর্কে অবগত আছ, তোমাদের ঘরেতো তোমাদের স্ত্রী রয়েছে। তারপরও কেন এ জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হও? তবে কেন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে রেখে পুরুষদের কাছে ছুটে যাও?  সাধারণত: পুরুষরা যখন স্ত্রীদেরকে রেখে অন্য পুরুষের পিছনে ছুটে যায়, তখন আস্তে আস্তে স্ত্রীরাও স্বামীদের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে এবং অন্য নারীর পিছু নেয়। যা ক্রমান্বয়ে পরিবারের মধ্যে অশান্তি দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তালাকের পর্যায়ে পৌঁছায়। এ অবস্থা ক্রমান্বয়ে গোটা সমাজেই ছড়িয়ে পড়ে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান যুগেও কোনো কোনো দেশ নিজেদেরকে উন্নত ও সভ্য জাতি  বলে মনে করে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে সমকামিতার মত অপরাধকে বৈধ বলে জানে। কোনো কোনো পশ্চিমা দেশ সমকামিতাকে আইনি বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সমকামিতা বিকৃত মানসিকতার পরিচয় এবং তা প্রকৃতি বিরোধী।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সমাজ সংস্কারক ও আল্লাহর পয়গম্বরগণের দায়িত্ব হলো, সমাজকে কুলুষমুক্ত করা। ২. যৌন চাহিদা মানুষের স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি যা অবশ্যই বৈধভাবে পূরণ করতে হবে। কোনোভাবেই অবৈধ পন্থায় এ চাহিদা পুরণ করা যাবে না।

 ৩. সমকামিতা মূর্খতা, বোকামি ও অযৌক্তিকতার ফল। যদিও এ জঘন্য অপরাধের প্রবনতা সভ্য হিসেবে দাবিদার দেশগুলোতেও দেখা যায়।

সূরা নমলের ৫৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوا آَلَ لُوطٍ مِنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ (56)

"উত্তরে তাঁর গোত্র শুধু এ কথাটিই বলল, লুত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পাক-পবিত্র সাজতে চায়।" (২৭:৫৬)

হজরত লুত (আ.) যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে গোত্রের লোকদেরকে সংশোধন হওয়ার আহবান জানালেন, কিন্তু তারা গ্রহণ করল না, বরং তারা কঠোরভাবে তার সমালোচনা করল। তারা অভদ্র ভাষায় হজরত লুত (আ.) সম্পর্কে বলল: অবশ্যই লুত, তার পরিবার ও সঙ্গীদেরকে এ জনপদ থেকে চলে যেতে হবে। কারণ তারা সবসময় আমাদের বিরোধিতা করে, আমাদের ভুল ধরে। যদি তারা এ জনপদ থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে আর কেউ আমাদের ভুল ধরতে পারবে না। আমাদেরকে জন্য আর কেউ সমস্যা সৃষ্টি করবে না। আসলে যখন সমাজের বেশিরভাগ মানুষ পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে সৎকর্মই অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। সৎকর্মশীলরাই বিপদে পড়ে। হজরত ইউসুফ (আ.)'র ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। হজরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন পাক-পবিত্র ও সুন্দর এক যুবক। জোলেখা হজরত ইউসুফ (আ.)কে কু-প্রস্তাব দেয়, আর জোলেখার কু-প্রস্তাবে হজরত ইউসুফ (আ.) রাজি হননি, এজন্য জোলেখা রেগে গিয়ে ইউসুফ (আ.) কে জেলে পাঠায়।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অন্যায় দেখে চুপ থাকা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে। এটা করতে গিয়ে যদি বহিস্কার বা নির্বাসিতও হতে হয়, তাহলেও তা করতে হবে।

২. হজরত লুত (আ.)'র গোত্রের কাজ ও চিন্তার অংশ ছিল অবাধ যৌনাচার বিশেষকরে সমকামিতা। এটা ছিল তাদের মূর্খতা। এটা সভ্যতার পরিচায়ক নয়।  

৩. পরিবেশ মানুষকে গোনাহ করতে বাধ্য করে না। এর প্রমাণ হল, সমাজে খারাপ লোকদের ভিড়েও ভালো লোক পাওয়া যায়। #