সূরা আন-নমল; আয়াত ৫৭-৬০ (পর্ব-১১)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৫৭ থেকে ৬০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫৭ ও ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ قَدَّرْنَاهَا مِنَ الْغَابِرِينَ (57) وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا فَسَاءَ مَطَرُ الْمُنْذَرِينَ (58)
"অতঃপর (লুত) তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে উদ্ধার করলাম তাঁর স্ত্রী ছাড়া। কেননা, তার স্ত্রীর জন্যে ধ্বংসপ্রাপ্তদের ভাগ্যই নির্ধারিত করেছিলাম।" (২৭:৫৭)
"আর তাদের উপর শাস্তিস্বরুপ বর্ষণ করেছিলাম মুষলধারে (পাথর) বৃষ্টি। (তারা সবাই পাথরের নিচে পড়ে ধ্বংস হয়েছিল)। বড়ই নিকৃষ্ট ছিল সেই বৃষ্টি যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিল তাদের জন্য।" (২৭:৫৮)
আগের আয়াতে হজরত লুত (আ.)'র ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হজরত লুত (আ.) তার গোত্র বা জাতির লোকদেরকে ঘৃণ্য কাজ থেকে সরে আসার আহ্বান জানালেও তারা তা গ্রহণ করেনি, বরং তারা লুত (আ.)-কে হুমকি দিয়ে বলেছিল, আমাদের সঙ্গ না দিলে তোমাকে শহর থেকে বের করে দেয়া হবে। আবার কখনো কখনো তিরস্কার করে বলত: যদি পাক-পবিত্র থাকতে চাও তাহলে আমাদের শহর থেকে চলে যাও, তাহলে তুমি আমাদের ওপর যে শাস্তি নেমে আসবে তা থেকেও দূরে থাকতে পারবে।
এরই ধারাবাহিকতায় এ দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, সতর্কবার্তা পৌঁছানোর পরও তারা যখন ঘৃণ্য কাজ থেকে সরে আসল না, তখন আল্লাহতায়ালা তাদেরকে আজাবের সম্মুখীন করেন। আল্লাহতায়ালা হজরত লুত (আ.)-কে ওহির মাধ্যমে আজাব নাজিলের কথা জানিয়ে দেন যাতে হজরত লুত (আ.) আজাব নাজিল হওয়ার আগেই মুমিন সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু হজরত লুত (আ.)'র স্ত্রী আজাব থেকে মুক্তি পাননি, কারণ তিনি শক্রদের পক্ষে কাজ করতেন এবং ঘরের সংবাদ শক্রদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: ১. পাপাচারীদের সহযোগী হওয়া মারাত্মক অপরাধ। এজন্য পাপাচারিদের মতোই শাস্তি ভোগ করতে হবে।
২. আল্লাহ হচ্ছেন ন্যায়বিচারক। এ কারণে হজরত লুত (আ.)'র স্ত্রী ও নূহ (আ.)'র সন্তানদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে সত্য পথে থাকায় ফেরাউনের মতো পাপাচারীর স্ত্রীকেও পুরস্কৃত করা হয়েছে।
৩. দুনিয়াতে ব্যক্তির মধ্যে যদি আল্লাহর ভয় ও পবিত্রতা থাকে, তাহলে আল্লাহর আজাব তাকে স্পর্শ করবে না।
সূরা নমলের ৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَى آَللَّهُ خَيْرٌ أَمَّا يُشْرِكُونَ (59)
"(হে নবী) বল, সকল প্রশংসাই আল্লাহর এবং শান্তি তাঁর মনোনীত বান্দাগণের প্রতি! শ্রেষ্ঠ কে? আল্লাহ না ওরা-তারা যাদেরকে শরীক সাব্যস্ত করে।" (২৭:৫৯)
এ আয়াতে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলছেন, অবশ্যই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। কারণ, তিনি সকল অপরাধী ও পাপাচারীদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ আয়াতে আল্লাহ আরো বলা হচ্ছে, মুশরিকরা যাদেরকে পূজা করত, তাদের তো যথেষ্ট শক্তি ও সম্পদ ছিল, তারপরও তো তারা আল্লাহর আজাব থেকে মুক্তি পাইনি। তারপরও মানুষ কেন আল্লাহকে অনুসরণ না করে শির্ক করে? তারা কি অতীতের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দেয় না? তারা তো দুনিয়াতেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আল্লাহর নেয়ামতের শুকর করার সঙ্গে সঙ্গে ভালো ব্যক্তিদের প্রশংসা করতে হবে।
২. আল্লাহর ওলিগণের কাছে দরুদ পাঠালে তারা তা গ্রহণ করে থাকেন। এমনকি আল্লাহতায়ালাও তাদের কাছে সালাম পাঠিয়ে থাকেন।
সূরা নমলের ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
أَمَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ مَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُنْبِتُوا شَجَرَهَا أَءلَهٌ مَعَ اللَّهِ بَلْ هُمْ قَوْمٌ يَعْدِلُونَ (60)
"বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে বর্ষণ করেছেন পানি; অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্য বিচ্যুত সম্প্রদায়।" (২৭:৬০)
আগের আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেন: আল্লাহ উত্তম না তোমরা যাকে পূজা কর তিনি উত্তম? আর এ আয়াতে আল্লাহ তিনি তাঁর কিছু নেয়ামতের কথা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলছেন: তোমরা যাদেরকে পূজা কর, তিনি কি আসমান-জমিনকে সৃষ্টি করেছেন? তিনি কি তোমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন? তারা কি তোমাদের জন্য এত সুন্দর বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার ক্ষমতা রাখে? তোমরা তারপরও কেন প্রকৃত আল্লাহকে অনুসরণ না করে ভুল পথে চলছ? এ আয়াত ও পরবর্তী আয়াতে মানুষ সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জানতে বলা হয়েছে। আর এটা আল্লাহকে জানার সর্বোত্তম পন্থা। কারণ প্রত্যেক বিবেকবান মানুষ ভালোভাবে জানে, এ বিশাল পৃথিবীকে সৃষ্টি করা ও পরিচালনা করা মানুষের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আমাদের ইচ্ছায় এ বিশাল পৃথিবী পরিচালিত হয় না। অতএব, একটু চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে, মহান ও শক্তিশালী আল্লাহ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে এ পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন এবং এর জন্য নির্ধারিত আইন-কানুন তৈরি করেছেন।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আল্লাহকে চেনার জন্য সর্বোত্তম পথ হলো, সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জানা।
২. যখন আমরা আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত হব, তখন একটা গাছ রোপণের সময়ও আমরা আল্লাহর ক্ষমতা উপলব্ধি করতে পারব।
৩. আল্লাহ সৃষ্টিজগতকে পরিকল্পনা ভিত্তিক সৃষ্টি করেছেন। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক কিছুকেই মাধ্যম করেছেন তিনি। যেমন- গাছের বৃদ্ধিতে বৃষ্টিবর্ষণ সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।#