সূরা আন-নমল; আয়াত ৬১-৬৩ (পর্ব-১২)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৬১ থেকে ৬৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَمَّنْ جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا وَجَعَلَ خِلَالَهَا أَنْهَارًا وَجَعَلَ لَهَا رَوَاسِيَ وَجَعَلَ بَيْنَ الْبَحْرَيْنِ حَاجِزًا أَءلَهٌ مَعَ اللَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (61)
"আর তিনি কে, যিনি পৃথিবীকে করেছেন অবস্থান লাভের উপযোগী এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদ নদী এবং তার মধ্যেই গড়ে দিয়েছেন (নোঙ্গরের মতো) পর্বত মালা, আর (মিঠা ও নোনা) পানির দুই ভাণ্ডারের মাঝখানে অন্তরাল সৃষ্টি করে দিয়েছেন (যাতে তা মিশে না যায়)। আল্লাহর সাথে কি (এসব কাজের শরিক) অন্য কোনো উপাস্য আছে? (না, নেই) বরং এদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” (২৭:৬১)
এর আগের আয়াতেই আল্লাহতায়ালা মূর্তিপূজারি ও মুশরিকদের কুসংস্কারপূর্ণ চিন্তা ও ধারণার বিপরীতে কিছু উদাহরণ তুলে ধরে প্রশ্ন করেছেন-কে তোমাদের জন্য এসব কিছু সৃষ্টি করেছেন? তিনি কি তোমাদের অসংখ্য প্রভুর কেউ, নাকি এক আল্লাহ?
আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ আয়াতেও আল্লাহতায়ালা এমন কিছু নিদর্শন তুলে ধরেছেন যা পৃথিবী সৃষ্টি ও সেটাকে বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে। এ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, পৃথিবীকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে সেখানে তোমরা শান্তিতে বসবাস করতে পার। আসলে আমরা জানি পৃথিবী নামের ভূ-গোলকটি এমন ভারসাম্যপূর্ণ করে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, তা মহাশূন্যে ঝুলে থাকার পরও তাতে কোন কম্পন ও অস্থিরতা নেই। পৃথিবীর কোথাও মাঝে মধ্যে সীমিত পর্যায়ে ভূমিকম্প হলে তার যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা থেকেই অনুমান করা যায় গোটা পৃথিবী যদি কোন কম্পন বা দোদুল্যমানতার শিকার হতো তাহলে তা মানব বসতির উপযোগী থাকতো না। কাজেই এটি একটি বড় নেয়ামত।
পাহাড়-পর্বত, সাগর ও নদ-নদী তথা নোনা ও মিঠা পানির ভাণ্ডারের অস্তিত্ব পৃথিবীকে মানুষের জন্য বাসযোগ্য করে তুলেছে। এ কারণে আমরা নদ-নদী ও উদ্যানের পাশে মানব সভ্যতা গড়ে উঠতে দেখি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে, এসব নিদর্শন থাকার পরও মুশরিকরা কিভাবে নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলোকে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে? তারা কিভাবে ভাবতে পারে পৃথিবীকে সৃষ্টি ও সেটাকে পরিচালনার ক্ষেত্রে মূর্তিগুলোর হাত রয়েছে? প্রকৃতপক্ষে তারা চিন্তা না করেই কথা বলে এবং প্রকৃত সত্য সম্পর্কে জানে না।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোড়া ছাড়াও নিজ অক্ষেও ঘূর্ণায়মান। কিন্তু আল্লাহতায়ালা বৈজ্ঞানিক সমতা ও সামঞ্জস্যশীলতার মাধ্যমে এ গ্রহটিকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, পৃথিবীর মানুষ সেই ঘূর্ণনকে বুঝতেই পারে না। এ ঘূর্ণন-পক্রিয়া এতটাই ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল যে, তা পৃথিবীতে কোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে না।
২. কুফরি ও শিরকের মূল ভিত্তি হলো অজ্ঞতা ও প্রকৃত সত্যকে চিনতে না পারা। অনেকেই আছেন গোঁড়ামি ও সংকীর্ণ মনোভাবের কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য থেকে দূরে থাকে। আসলে তারা সত্যকে জানতেই চায় না এবং নিজের অন্যায় অবস্থানে অটল থাকে। আবার কেউ কেউ আছেন যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে শিরক করে। তাই যারা জানে না,তাদেরকে সত্য জানিয়ে দেয়া আমাদের দায়িত্ব।
সূরা নমলের ৬২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَءِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ (62)
“কে তিনি যিনি আর্তের ডাক শোনেন যখন সে তাকে ডাকে এবং কে তার দুঃখ দূর করেন? আর (কে) তোমাদেরকে পৃথিবীতে (নিজের) প্রতিনিধি করেন? আল্লাহর সাথে কি আর কোন উপাস্য আছে? তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর।”(২৭:৬২)
এ আয়াতে মানুষের জীবনে আল্লাহর ভূমিকা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে, মানুষ যখন সমস্যায় পড়ে এবং সমাধানের কোনো পথ খুঁজে পায় না। তখন সে কার সাহায্য কামনা করতে থাকে? এ অবস্থায় মূর্তি বা অন্যরা কি কোন কিছু করতে পারে? আসলে যখন তোমরা কোন কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হও তখন সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে থাকো, তোমার অন্তরও যাকে সমস্যার সমাধানকারী হিসেবে চেনে।
কুরআনের অন্য আয়াতেও মানুষের অন্তরের বিশ্বাস বা ঈমান সম্পর্কে বলা হয়েছে। এক আয়াতে বলা হয়েছে, যখন জাহাজে উঠ এবং বিশাল ঝড়ের কবলে পড়, তখন আল্লাহ ছাড়া আর কাকে ডাকতে থাক? কার মাধ্যমে মুক্তির আশা করতে থাক?
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. অত্যন্ত কঠিন বিপদের মধ্য থেকে মানুষের মুক্তির বিষয়টি চিন্তা করলে মানুষ আল্লাহকে চিনতে পারে। একমাত্র আল্লাহই আমাদেরকে এমন বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেন।
২. পৃথিবীতে শাসন কায়েম করার এবং সম্পদ ব্যবহারের ক্ষমতা আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন।
সূরা নমলের ৬৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَمَّنْ يَهْدِيكُمْ فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَنْ يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ أَءلَهٌ مَعَ اللَّهِ تَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ (63)
“আর কে স্থল ও সাগরের অন্ধকারে তোমাদের পথ দেখান এবং কে (বৃষ্টির মতো) অনুগ্রহ পাঠানোর আগেই বাতাস কে সুসংবাদ হিসেবে পাঠান? আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন উপাস্য আছে? আল্লাহ অনেক ঊর্ধ্বে এই শিরক থেকে যা এরা করে।”(২৭:৬৩)
আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ আয়াতেও প্রশ্ন আকারে আল্লাহতায়ালা বলছেন: রাতে স্থলভাগে ও সাগরে ভ্রমণের সময় কে তোমাদেরকে পথ দেখান? এ অবস্থায় যে তারকারাজি তোমাদের পথচলায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে, তা কি এক আল্লাহর সৃষ্টি নয়?
যে বাতাস সমুদ্রের উপর থেকে মেঘমালাকে পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে নিয়ে যায় এবং যার কারণে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, সে বাতাস কি এক আল্লাহর ইচ্ছায় এ কাজ করে না? তারপরও কেন মূল্যহীন ও নিষ্প্রাণ মূর্তিগুলোকে আল্লাহর শরিক বলে মনে কর? কেন এটা মনে কর যে, মানুষ ও গোটা বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণে মূর্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে?
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. প্রকৃতিতে যে শৃঙ্খলা ও সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়, তা মহাবিশ্ব ব্যবস্থাপনায় আল্লাহর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনারই প্রমাণ বহন করে। এটা স্পষ্ট, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউই এমন শৃঙ্খলা ও সমন্বয় সাধন করার ক্ষমতা রাখে না।
২. আল্লাহতায়ালা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এমন কেউ বা এমন কোন কিছু নেই যা আল্লাহর সমতুল্য হতে পারে। #