সূরা আন-নমল; আয়াত ৬৪-৬৯ (পর্ব-১৩)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৬৪ থেকে ৬৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৬৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَمَّنْ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَمَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَءِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (64)
"আর তিনি কে যিনি সৃষ্টির সূচনা করেন এবং তারপর আবার (কিয়ামতে) এর পুনরাবৃত্তি করেন? আর কে তোমাদের জীবিকা দেন আকাশ ও পৃথিবী থেকে? আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ কি (একাজে অংশীদার) আছে? (হে নবী) বলো, আনো তোমাদের যুক্তি, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।" (২৭:৬৪)
আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় আল্লাহতায়ালা মুশরিকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তোমরা যার উপাসনা কর তিনি উত্তম, নাকি এক আল্লাহ যিনি কেবল সৃষ্টির সূচনাই করেননি বরং তিনি কেয়ামতের দিন পুনরুত্থান ঘটাবেন? যার কাছে তোমাদের সবাইকে অবশ্যই একদিন ফিরে যেতে হবে। তিনি সব সময় সৃষ্টির চাহিদা পূরণ করেন। তিনি এমন প্রতিপালক যিনি প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করে থাকেন।
এরপরও যদি তোমরা মনে কর, এক আল্লাহ ছাড়াও অন্য কোনো প্রভু সৃষ্টিকুলকে পরিচালনা করে, তাহলে তোমরা তোমাদের স্পষ্ট ও যুক্তিসংগত প্রমাণ তুলে ধর। পবিত্র কুরআনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, শত্রুদের কাছে যুক্তিসহ স্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা। পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতেই এ সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে কুরআনও প্রত্যাশা করে শত্রুরাও ঠাট্টা-মশকরা,সন্দেহ ও হুমকির পথ পরিহার করে যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে কথা বলবে।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. শত্রুদের সঙ্গেও ন্যায় ও যুক্তিভিত্তিক আচরণ করতে হবে। তারাও যদি যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরতে পারে তাহলে তা মেনে নিতে হবে। শক্রপক্ষ বলেই তাদের যুক্তিকে চোখ বুঝে প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। কারণ ইসলাম যুক্তি-প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেয়। ইসলাম চায়, শক্ররাও যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করুক।
২. খাদ্যসহ আমাদের সব প্রয়োজনই মেটান মহান আল্লাহতায়ালা। তার নির্দেশে যেমন আকাশ থেকে আলো বাতাস ও বৃষ্টির ব্যবস্থা হয় তেমনি সব ধরনের খাদ্য ও পোশাকাদির ব্যবস্থাও তার নির্দেশেই পৃথিবী থেকে হয়ে থাকে।
সূরা নমলের ৬৫ ও ৬৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ (65) بَلِ ادَّارَكَ عِلْمُهُمْ فِي الْآَخِرَةِ بَلْ هُمْ فِي شَكٍّ مِنْهَا بَلْ هُمْ مِنْهَا عَمُونَ (66)
(হে নবী) বল, আল্লাহ ছাড়া পৃথিবী ও আকাশে কেউ অদৃশ্যের খবর জানে না এবং তারা জানে না যে,কখন পুনরুজ্জীবিত করা হবে।" (২৭:৬৫)
"বরং আখেরাতের জ্ঞানই তাদের থেকে হারিয়ে গেছে। উপরন্তু তারা সে ব্যপারে সন্দেহের মধ্যে রয়েছে। আসলে তারা সে ব্যাপারে অন্ধ।" (২৭:৬৬)
মুশরিকরা কেয়ামতকে অস্বীকার করার মতো কোনো দলিল-প্রমাণ খুঁজে না পেয়ে সবসময় নবী-রাসূলদেরকে প্রশ্ন করত: হে নবী! কেয়ামত কখন হবে? নবী-রাসূলরা যখন এ প্রশ্নের উত্তর দিতেন না তখন তারা বলত, কিয়ামত হবে কিনা তা নিয়ে তাহলে তুমিও সন্দিহান।
এ আয়াতে শক্রদের এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আল্লাহ বলছেন: কিছু বিষয় আছে যেগুলো শুধুমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। এমনকি এ ধরনের বিষয় সম্পর্কে ফেরেশতা ও নবীরাও অবহিত নন। কবে কিয়ামত হবে সে সম্পর্কে না জানার অর্থ এ নয় যে,কেয়ামত হবে না। যেমন কোন মানুষই জানে না, সে কবে মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একদিন অবশ্যই সবাইকে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। মৃত্যু থেকে কেউ পালাতে পারবে না। কেয়ামত সে ধরনেরই একটি বিষয়। কেয়ামত অবশ্যই হবে। তবে কেউ জানে না কখন কেয়ামত হবে। কেয়ামত নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ নেই।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিশেষকরে কেয়ামত সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা অবিশ্বাসীদের একটি বড় লক্ষ্য। তাই শক্রদের এ তৎপরতাকে ব্যর্থ করে দিতে মুসলমানদের পক্ষ থেকেও উপযুক্ত দলিল-প্রমাণ তুলে ধরতে হবে।
২. কেয়ামতে বিশ্বাসের অর্থ হচ্ছে এমন অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস,যা মানুষ তার পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারে না। তবে স্পষ্ট যুক্তির ভিত্তিতে বিবেকের মাধ্যমে তা প্রমাণিত।
সূরা নমলের ৬৭, ৬৮ ও ৬৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَئِذَا كُنَّا تُرَابًا وَآَبَاؤُنَا أَئِنَّا لَمُخْرَجُونَ (67) لَقَدْ وُعِدْنَا هَذَا نَحْنُ وَآَبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ إِنْ هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ (68) قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ (69)
"কাফেররা বলে, যখন আমরা ও আমাদের বাপ-দাদারা (মরে যাব) ও মাটি হয়ে যাব,তখন সত্যিই তাদেরকে কবর থেকে (জীবন্ত) বের করা হবে নাকি?" (২৭:৬৭)
"এ প্রতিশ্রুতি ইতিপূর্বে আমাদেরকে এবং আমাদের বাব-দাদাদেরকেও অনেক দেয়া হয়েছে, কিন্তু এসব নিছক কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়।” (২৭:৬৮)
“(হে নবী) বল, পৃথিবী পরিভ্রমণ করে দেখ অপরাধীদের পরিণতি কি হয়েছে।" (২৭:৬৯)
আগের কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে, কাফেররা কেয়ামত সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশের কারণ হিসেবে কেয়ামত হওয়ার তারিখ ঘোষণা না করাকে উল্লেখ করেছে। আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এসব আয়াতে আল্লাহতায়ালা আরো বলছেন: কাফেররা তাদের সন্দেহকে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে দাবি করে, এর আগেও নবী-রাসূলরা কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষরা এরিমধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, তারা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তারপরও নবী-রাসুলদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। এখন তারাও মরে যাবে, তাদের শরীরও মাটি হয়ে যাবে,তাদের শরীরের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। তাদের দাবি, মাটি থেকে তাদেরকে পুনরায় জীবিত করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, কাজেই তাদেরকে জীবিত করা সম্ভব হবে না।
কুরআনে আল্লাহতায়ালা পরিষ্কারভাবে এসব বক্তব্যের জবাব তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলছেন প্রথমে তোমরা সবাই মাটি ছিলে। মাটি থেকেই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং পুনরায় মাটি থেকে তোমাদেরকে জীবিত করা আল্লাহর কাছে কোনো বিষয়ই নয়। এছাড়া তোমরা যে নবী-রাসূলদের ন্যায়সঙ্গত অবস্থানের বিষয়ে শক্রতা ও বাড়াবাড়ি করছো এ জন্য তোমাদেরকে অতীতের জাতিগুলোর মত দুনিয়াতেই কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। অতীতের এ সংক্রান্ত ইতিহাস খুব বেশি আগের নয়। ইতিহাস পড়লেই দেখতে পাবে তারা কী ধরনের পরিণতি ভোগ করেছে।
এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ঐশী গ্রন্থকে কল্পকাহিনী হিসেবে অভিহিত করা কাফেরদের পুরনো পদ্ধতি। দু:খজনক হলেও সত্য যে,বর্তমান যুগেও অনেকেই আছেন যারা জেনে বা না জেনে ঐশী গ্রন্থকে কল্পকাহিনীর বই হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে।
২.পবিত্র কুরআন আমাদেরকে অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস জানতে বলেছে। বিভিন্ন এলাকা ও দেশ সফর করে অতীত জাতিগুলোর পরিণতি সম্পর্কে জানতে বলেছে। কারণ অত্যাচারীদের পরিণতির ইতিহাস জানতে পারলে আমরা সঠিক পথ নির্বাচন করতে পারব এবং উন্নতি সাধন করতে পারব।
৩. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার জন্য অতীতের ইতিহাস সংরক্ষণ করা অতি জরুরি।#