করুণা নয়, পানি আমাদের ন্যায্য অধিকার: বদিউল আলম মজুমদার
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের ফলে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে একথা সত্য। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এই ঘনিষ্ঠতা এবং সুসম্পর্কের সুফল কী জনগণ পাচ্ছে? রেডিও তেহরানের সাথে সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্ন করেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সুশাসনের জন্য নাগকির বা সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি ভারত চায়। ভারত যখন চায়-তখন বুঝতে হবে নিশ্চয়ই এ সমঝোতা স্বারক তাদের স্বার্থের অনুকূলে। কিন্তু আমরা সেখানে কি পেলাম সেটাই প্রশ্ন? বিষয়টি জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হল।
রেডিও তেহরান: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩৬টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিতে সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এবারের সফর দুদেশের দ্বিপক্ষীয় বহুমুখী সম্পর্কে গতির সঞ্চার করেছে এবং মজবুত হয়েছে। তো এ সফর সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
ড.বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক যত বেশী ঘনিষ্ঠ হবে তত বেশী লাভবান হবে উভয় দেশ। উভয় দেশের জনগণই এর সুফল পাবে। আমরা আশাকরি সেটাই ঘটছে। হ্যাঁ এটা সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ফলে দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং ভারতের বর্তমান সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে এই ঘনিষ্ঠতা এবং সুসম্পর্কের সুফল জনগণ পাচ্ছে কী না? বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণ এর সুফল পাচ্ছে কী না? এটা নিয়ে বিতর্ক এবং প্রশ্ন। অনেকের ধারনা ভারত একতরফা অনেকগুলো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে।
আমাদের দেশের জন্য যেগুলো প্রয়োজন এবং দাবি যেমন- তিস্তার পানি, দুদেশের বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা। তাছাড়া সীমান্ত হত্যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। অনেকেরই আশঙ্কা আমাদের যা প্রাপ্য, আমাদের দেশের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা যথাযথভাবে পাচ্ছিনা।
আমি এককালে অর্থনীতির শিক্ষক ছিলাম। তখন আমরা অর্থনীতিতে একটি কনসেপ্ট পড়াতাম সেটা হচ্ছে- ‘a beggar-thy-neighbour policy’।এর অর্থ দাঁড়ায়, যে নীতি কাঠামো কোনো দেশ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করবে-তাতে দেশটি নিজে লাভবান হবে তবে প্রতিবেশীরা লাভবান হবে না। প্রতিবেশীরা শুধু লাভবান হবে না এমনটি নয়- ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তো তিস্তার পানি আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য। আমরা তো তাদের কাছে করুণা চাই না, এটা করুণার বিষয় নয়। পানি আমাদের ন্যায্য প্রাপ্তির বিষয়।
রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ নিশ্চিত করার কথা জোর দিয়ে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে প্রতিরক্ষা বিষয়ক যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তাতে দেশের মানুষ শঙ্কিত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার এ মন্তব্যকে আপনি কিভাবে দেখছেন।
ড.বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক যে সমঝোতা স্বারক সই হয়েছে তাতে কি আছে সেটা আমরা জানিনা। কি আমরা পাচ্ছি বা কি আমরা দিচ্ছি তার কিছুই জানিনা আমরা।
তবে এখানে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, এই বিষয়টা ভারত চাচ্ছে। ভারত এ বিষয়ে একটা চুক্তি চাচ্ছিল কিন্তু চুক্তি হয়নি। এ বিষয়ে সমঝোতা স্বারকে সই হয়েছে। তো ভারত যখন চায়-তখন বুঝতে হবে নিশ্চয়ই এ সমঝোতা স্বারক তাদের স্বার্থের অনুকূলে। কিন্তু আমরা সেখানে কি পেলাম সেটাই প্রশ্ন? আর এ প্রশ্নটি দেখা দিয়েছে এখন আমাদের অনেকের কাছে।
আর আমার কাছে মনে হয়- এসব চুক্তি বা সমঝোতাতে কি আছে, কি হয়েছে, আমরা কি পেলাম এবং কি দিলাম সেসব বিষয় সুস্পষ্ট হওয়া দরকার। একইসাথে সামরিক ক্ষেত্রে যে সমঝোতা স্বারকে সই হয়েছে তার মধ্যে কি আছে সেটাও প্রকাশ হওয়া দরকার।
রেডিও তেহরান: বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করার জন্য যে শুল্ক, অশুল্ক বাধাগুলো দূর করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি। খালেদা জিয়ার এ অভিযোগ আসলে কতটা সত্য।
ড.বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, এ বিষয়ে আমরা বিস্তৃতভাবে কিছু জানিনা। তবে আমরা যতটুকু শুনতে পাই সেটা হচ্ছে ভারত অদৃশ্য শুল্ক বহির্ভূত বাধা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে বাংলাদেশি কিছু পণ্যের ওপর। আর এগুলো কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়। এসব বিষয় অবশ্যই দূরীভূত হওয়া দরকার। আমরা জানতে চাই এসব বিষয় দূরীভূত হয়েছে কিনা। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশ বিরাট পরিমাণ ঋণ পাবে ভারতের কাছ থেকে। কিন্তু আমরা দেখেছি অতীতে দ্বিপাক্ষিক ঋণের শর্তগুলো খুব কঠিন ছিল। তাছাড়া এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করে জিনিষপত্র ভারত থেকে কিনতে হবে এমন শর্ত ছিল। এগুলো আমাদের দেশের স্বার্থের অনুকূলে নয়। আর
এসব ঋণের একটা বড় অংশ অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এর দ্বারা কার স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
আমি আশা করব আমাদের বিশেষজ্ঞরা এবং রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিষয়ের গভীরে গিয়ে তা জাতির সামনে তুলে ধরবেন। একইসাথে সরকারেরও দায়িত্ব এগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা।
রেডিও তেহরান: তিস্তা নদীর পানি বন্টন ইস্যুটি নিয়ে কোনো সমাধানের পথ বেরিয়ে আসেনি এবারের সফরেও। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে তিস্তা চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা কি আছে?
ড.বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে তিস্তা চুক্তি হবে। যদি এমনটি হয়ে থাকে তাহলে আমরা তো আশাবাদী হতেই পারি। আমরা এ ব্যাপারে আশাবাদী হতে চাই এবং বাস্তবে রুপলাভ করবে এমনটি দেখতে চাই। দুই দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী যখন আশ্বস্ত করেন কোনো বিষয়ে, বিশেষ করে যাদের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে তারা যখন আশ্বাস দেন তখন তো আমরা আশাবাদী হতেই পারি।
কিন্তু যে কথাটি বলতেই হয় এরকম আশায় বুক বেধে আমরা বহুদিন কাটিয়ে দিলাম। এখনও তাকিয়ে আছি। কিন্তু এখনও আমরা এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক কিছু ঘটতে দেখলাম না। এটি আমাদের জীবন-মরণের সমস্যা। আমাদের দেশের একটা অংশে মরুকরণের লক্ষণ দেখছি।
রেডিও তেহরান: প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কি কোনো কথা হয়েছে?
ড.বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, এ বিষয়টি সম্পর্কেও আমরা কিছুই জানিনা। তবে এ বিষয়টি বন্ধ হওয়া দরকার। কোনো সভ্য সমাজে সীমান্তের হত্যার মতো ঘটনা ঘটতে পারে না। আমরা আশাকরি সীমান্তে হত্যার বিষয়ে ভারত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৭