এপ্রিল ২৪, ২০১৭ ১৭:৪৩ Asia/Dhaka

অজানা অচেনা কাউকে ফেসবুকে বন্ধু বানালে প্রতারিত হওয়া ও বিভ্রান্তিতে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সেজন্য প্রথমত শিশুদের হাতে একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে স্মার্ট ফোন দেয়া উচিত নয়। আর কিশোরদের ক্ষেত্রে সচেতন করা এবং মনিটর করা উচিত। রেডিও তেহরানের সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ত্রিভুজ আলম। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: বলা যায়, ইন্টারনেট এখন মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ইন্টারনেটের এ যুগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বিশেষ করে ফেসবুক নিয়ে। অনেকেই ইন্টারনেটকে ফেসবুক হিসেবে চেনে। ইন্টারনেট জগতের নানা অঙ্গনকে ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বিশেষ করে ফেসবুকের এত জনপ্রিয়তার কারণ কি?

ত্রিভুজ আলম: দেখুন, মানুষ আসলে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। নতুন বন্ধু বানাতে চায়। বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখতে চায়। তাছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে নতুন কিছু শিখতে চায়। ফেসবুক এই সবগুলো বিষয় একটি প্লাটফর্মে নিয়ে এসেছে। একজন মানুষ তার পরিচিত যত বন্ধু-বান্ধব আছে তাদেরকে ফেসবুকের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে পারে। একইসাথে নতুন কাউকে বন্ধুও বানাতে পারে। এছাড়া কোনো মানুষ তার নিজের কোনো চিন্তা বা পছন্দের কোনো বিষয় ফেসবুকে শেয়ার করতে পারে। কারণ ফেসবুকে খুব বড় ধরনের পাঠক আছে। এসব কারণেই মূলত ফেসবুকটা এতবেশি জনপ্রিয় হয়েছে।

ফেসবুক একইসময় ইনফরমেশন, শেয়ারিং এবং কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ-এই পুরো ব্যাপারটিকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।

রেডিও তেহরান: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে ফেসবুকের প্রতি নতুন প্রজন্মের ঝোক-প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক সংখ্যক শিশু-কিশোর। ফেসবুক কি শিশু-কিশোরদের জন্য উপযোগী?

ত্রিভুজ আলম: ফেসবুকের যে টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন আছে সেখানে তাকালে আপনি দেখবেন যে শিশুদের সেখানে সাইন আপ করার কোনো অপশন নেই। ফেসবুকে লেখা আছে ১৩ বছরের নিচে কেউ সাইন আপ করতে পারবেন না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১৩ বছরের নিচের  অনেক শিশুরা ফেসবুকে সাইন আপ করছে।

আর কিশোরদের যে বিষয়টি আছে সে সম্পর্কে বলব-এখন যেহেতু সবার হাতে হাতে স্মার্ট ফোন চলে এসেছে। সে কারণে প্রায় সব কিশোর এখন ফেসবুক ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে। তারা ফেসবুকে নতুন নতুন বন্ধু বানাচ্ছে, ফেসবুকে কথা বলছে। আসলে শিশু বা কিশোর যারা অনেক কিছু বুঝতে পারে না। তাদের জন্য অবশ্যই ফেসবুক ক্ষতিকর।

রেডিও তেহরান: আপনি বললেন, ফেসবুক শিশু-কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর বা  উপযোগী নয়। কিন্তু এর প্রতি শিশু-কিশোরদের ঝোক অনেক বেশি। তাদেরকে ফেসবুক থেকে দূরে রাখা যায় কি করে?

ত্রিভুজ আলম: দেখুন, শিশুদের ব্যাপারে অর্থাৎ ১৩ বছরের নিচে যাদের বয়স বা যাদেরকে আমরা ছোটো ভাবি তাদেরকে কিন্তু আপনি এই টেকনোলজি থেকে দূরে রাখতে পারবেন না। চাইলেও আপনি তা ঠেকাতে পারবেন না। আর যেহেতু আমাদের অভিভাবকদের অনেকেই টেকনোলজি ভালোভাবে জানেন না বা বুঝেন না। ফলে তারা চাইলেও এটা ঠেকাতে পারবেন না। অভিভাবকরা বুঝতে পারবেন না তাদের ছোটো ছোটো সন্তানরা ফেসবুকে ঢুকছেন কি ঢুকছেন না। তবে আমার মনে হয় স্মার্ট ফোন ব্যবহারের জন্য যদি একটি বয়স নির্ধারণ করা হয় তাহলে ভালো হয়। যেমন ধরুন ১৩ বছরের আগে কোনোভাবেই আপনার বাচ্চাকে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতে দেবেন না। তাহলে সে চাইলেও ফেসবুকে ঢুকতে পারবে না বা এইধরনের ক্ষতিকর মাধ্যমগুলোতে ঢুকতে পারবে না।

আর এরচেয়ে একটু বেশি বয়স যাদের, তারা তো একটু বড় ফলে তাদের জন্য আসলে সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে শিক্ষা, সচেতনাবোধ শেখানো যায়। তাদেরকে যদি বোঝানো যায় তাহলে আমার ধারনা এতে তারা সতর্ক হবে। মানে আমি বলতে চেয়েছি ফেসবুকের ক্ষতিকর দিক থেকে তারা দূরে থাকতে পারবে।

রেডিও তেহরান: ফেসবুকে যে নতুন নতুন বন্ধু বানানো এতে নানারকম সামাজিক সংকটও সৃষ্টি হচ্ছে-এ সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?

ত্রিভুজ আলম: দেখুন, আপনি যে কথাটি বললেন ফেসবুকে অজানা অচেনা মানুষকে নতুন নতুন বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে অনেকে- তাতে নানারকম সামাজিক সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। হ্যাঁ এটা খুবই স্বাভাবিক। আপনি একজনকে চেনেন না, জানেন না তাকে বন্ধু বানাচ্ছেন ফলে তো সংকট সৃষ্টি হতেই পারে। সে ভালো না মন্দ সেটি তো যাচাই করার  কোনো সুযোগ আপনার নেই। তো একটা বাচ্চা বা কিশোর যার অনেক কিছু বোঝার বয়স হয়নি সে যদি নতুন নতুন বন্ধু বানায় তাহলে সে সহজে বিভ্রান্ত হবে এবং প্রতারিত হবে। এ ধরনের প্রতারণা বা বিভ্রান্তি থেকে শিশু কিশোরদের দূরে রাখার সরাসরি কোনো উপায় নেই।

আসলে আমরা আমাদের সামাজিক জীবনে যেটা করি সেটা হচ্ছে- আমরা আমাদের বাচ্চাদের নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ  করি। কাকে সে বন্ধু বানাবে, কার সাথে চলবে, কিভাবে চলবে, কতটুকু যেতে পারবে, কতটুকু মিশতে পারবে এসব বিষয়ে প্রতিমুহূর্তে পারিবারিকভাবে গাইডলাইন দিয়ে থাকি। এসব গাইড লাইন হয়তো সে ফলো করছে তারপরও সে বুঝতে পারল না অন্যের প্রতারণার বিষয়টি। দেখা যাচ্ছে একটা খারাপ লোক তাকে ভালো ভালো কথা বলছে- সে তখন ভাবলো তার শেখা পারিবারিক গাইড লাইনের মধ্যেই তো বিষয়টি রয়েছে। ফলে তাকে তো বন্ধু বানানো যায়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই না জেনে একটা খারাপ লোককে বন্ধু বানিয়ে ফেললে তাতে ক্ষতি তো হবেই। তবে  এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

রেডিও তেহরান:  আপনি এ বিষয়ে অভিভাবকদেরকে কি পরামর্শ দেবেন?   

ত্রিভুজ আলম: অভিভাবকরা প্রথমত বাচ্চাদেরকে শেখাবে। বাচ্চারা কি করবে, তারা ইন্টারনেট বা ফেসবুক ব্যবহার করলে কিভাবে করবে, এর ভালো মন্দ দিক- যাবতীয় বিষয়ে গাইড লাইন দেবে।  ফ্যামিলি ভ্যালুসগুলো তাদেরকে শেখাতে হবে। কারণ ফেসবুক বা ইন্টারনেট থেকে বর্তমান সময়ে বাচ্চাদেরকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। ফলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের জন্য ধরা যাক বাচ্চাদের হাতে স্মার্ট ফোন দেয়া হলো না। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগ পর্যন্ত অবশ্যই অভিভাবকরা বাচ্চাদের হাতে স্মর্ট ফোন দেবেন না। এরপর যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনার বাচ্চার নিজ থেকে অনেক কিছু বোঝার বয়স হয়েছে তখন তাকে আপনি স্মার্ট ফোন দেবেন। তবে অবশ্যই আপনাকে মনিটর করতে হবে। আপনার বাচ্চা ফেসবুকে কি করছে, কাদেরকে বন্ধু বানাচ্ছে এসব বিষয়ে অবশ্যই অভিভাবকদের দায়িত্ব মনিটর করা। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরকেও আইটি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বাচ্চাদের জন্যে হলেও অভিভাবকদের ফেসবুক ব্যবহার করতে হবে। যদিও বলা চলে এখন অধিকাংশ অভিভাবকই  ফেসবুকে আছেন। যদি তারা ফেসবুকে থাকেন তাহলে আমার মনে হয় বাচ্চাদেরকে ফেসবুকের ক্ষতিকর দিক থেকে ঠেকানো সম্ভব।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৪