‘আমি অভিভূত; সপরিবারে আবার ইরান আসছি’
ইরান সফর নিয়ে রেডিও তেহরানকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশের এস এ টিভির চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ইরানের আতিথেয়তায় আমি অভিভূত। সপরিবারে আবার ইরান আসব। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
সম্প্রতি ইরানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ৩৫তম ফাজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বা এফআইএফএফ। বিশ্বের ৬৬টি দেশ থেকে ১৭৭ জন চলচ্চিত্র নির্মাতা, নির্দেশক, প্রযোজকসহ ইরানি ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র কোম্পানি এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসহ ৩৫০ জন অতিথি ফাজর ফিল্ম উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন এস এ. টিভির চেয়ারম্যানে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালাহউদ্দিন আহমেদসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের বেশ কয়েকজন অতিথি।
আমরা এস এ গ্রুপ এবং এস এ টিভির চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমেদের সাথে একান্তে কথা বলেছি- তার ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে।
রেডিও তেহরান: আপনার টিভি চ্যানেল এস এ টিভি-আইআরআইবির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে একাধিক টিভি সিরিয়াল নিয়েছেন। এরইমধ্যে পয়গম্বর ইউসুফ আ. (ইউসুফ- জুলেখা) সিরিয়ালটি ডাবিং করে সম্প্রচারও করেছেন। তো কেমন সাড়া পেলেন?
সালাহউদ্দিন আহমেদ: ধন্যবাদ রেডিও তেহরানকে। ৩৫তম ফাজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বা এফআইএফে আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এখানে এসে আমাদের খুবই ভালো লাগল। ইরান একটি ইসলামি দেশ। আমাদের বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। তো তেহরান সফরে এসে আমরা সত্যিই অভিভূত হয়েছি।
পয়গম্বর ইউসুফ আ. (ইউসুফ- জুলেখা) সিরিয়ালটি ডাবিং করে আমরা সম্প্রচার করেছি এবং ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। তো সিরিয়ালটি নিয়ে বলার আগে আমার এস এ টিভি সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। আমার টিভি চ্যানেলটি বাংলাদেশের অনেকগুলো টিভি চ্যানেলের মধ্যে একমাত্র ফুল এইচডি একটি চ্যানেল। আমার চ্যানেলটির বয়স প্রায় ৫ বছর হয়েছে।
আমার এই টিভি চ্যানেলে এদেশের সমাজ-সংস্কৃতি, ইসলামি মূল্যবোধ-আদর্শ নিয়ে বহু অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছি এবং এসব বিষয়ে কাজ করছে। আর সে কারণেই ইরানের তৈরি ইউসুফ (আ.) বা ইউসুফ-জুলেখা সিরিয়ালটি নিয়ে বাংলায় ডাবিং করে আমাদের টিভি চ্যানেলে সম্প্রচার করেছি। সিরিয়ালটি সম্প্রচার করে সত্যিকারার্থে খুবই সফল হয়েছি।
সিরিয়ালটি দেখে মানুষ টেলিফোন করে আমার কাছে কেঁদে দিয়েছে। আমাকে বলেছে- ভাই আপনার টিভি চ্যানেলে আপনি এটা কি দেখালেন। আমি তাদের কথার উত্তরে বলেছি, আসলে আমি তো এটা করিনি। এটা ৪/৫ হাজার বছর আগের ইতিহাস। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে ইউসুফ (আ.)’র ঘটনা। এটা নিয়ে সিরিয়াল তৈরি করেছে ইরান। ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা বা আইআরআইবির কাছ থেকে আমরা সিরিয়ালটি নিয়ে বাংলায় ডাবিং করে সম্প্রচার করেছি। তো মানুষের এমন অনুভূতি প্রকাশে আমি সত্যিই বিস্মিত হয়েছি যে, সিরিয়ালটি এত বেশি রকম সাড়া দিয়েছে তাদের মনে।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা পয়গম্বর ইউসুফ’ সিরিয়ালটির এত বেশি সাড়া পাওয়ার কারণ কি? ইরানি সিরিয়াল কি আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী?
সালাহউদ্দিন আহমেদ: দেখুন, ইউসুফ (আ.) বা ইউসুফ-জুলেখা সিরিয়ালটি আমি নিজেও দেখেছি। এরমধ্যে শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। কুরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.) ও জুলেখার ঘটনাটি সিরিয়ালটির মধ্যে দেখানো হয়েছে। এখানে তুলে ধরা হয়েছে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়, সত্যান্বেষী হতে হবে। ইসলামের বক্তব্যগুলো হুবহু এই সিরিয়ালটির মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে। এই সিরিয়ালটি থেকে শিক্ষার অনেক কিছু রয়েছে। এ থেকে আমাদের সমাজ অনেক কিছু শিখতে পারবে।
রেডিও তেহরান: আপনি যে কথা বললেন, পয়গম্বর ইউসুফ সিরিয়ালটি দেখার পর অনেক মানুষ আপনার কাছে ফোন করে কেঁদে দিয়েছেন। অনেক বয়স্ক মানুষও এই সিরিয়ালটি দেখার জন্য টিভির সামনে বসে থেকেছেন। তো সিরিয়ালটি কি পুনঃপ্রচার করার ইচ্ছে আছে কিনা?
সালাহউদ্দিন আহমেদ: হ্যাঁ, ইউসুফ (আ.) বা ইউসুফ-জুলেখা সিরিয়ালটি দেখার পর বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে যে সাড়া পেয়েছি এবং তারা যেভাবে অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন তাতে সিরিয়ালটি পুনঃপ্রচারের ইচ্ছে আমাদের আছে।
মানুষ যখন পুনঃপ্রচারের অনুরোধ জানিয়েছেন-তখন আমি সিরিয়ালটি পুনঃপ্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তবে এখনই নয়; কয়েক মাস পর পুনঃপ্রচার করব। তাৎক্ষণিকভাবে সিরিয়ালটি পুনঃপ্রচার করব না। আমরা এখন বাংলায় ডাবিং করে ইরানের আরেকটি সিরিয়াল 'আসহাবে কাহ্ফ' সম্প্রচার শুরু করেছি। এছাড়াও আরো কয়েকটি সিরিয়াল আমাদের হাতে আছে। আর সত্যি কথা বলতে কি ইউসুফ-জুলেখা সিরিয়ালটি প্রচারের পর আমাদের টিভির দর্শকপ্রিয়তা ‘টিআরপি’ বা টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট প্রথম অবস্থানে এবং পুনঃপ্রচার করলেও একইরকম থাকবে বলে মনে করি। সারা দেশের গ্রাম-গঞ্জে যারা টেলিভিশন দেখে না যেমন ধরুন অনেক আলেম উলামা আছেন, গ্রামের বয়স্ক ব্যক্তি আছেন তারা কিন্তু সাধারনত টিভি দেখে না। অথচ সেইসব মানুষও ইউসুফ-জুলেখা দেখার জন্য টিভি সেটের সামনে বসে থেকেছেন।
তো ইসলামি আদর্শ ও ভাবধারার যেসব সিরিয়াল আমাদের সমাজকে কোনোরকম কলুষিত করে না এবং ভালো মানের সেগুলো আমাদের টিভি চ্যানেলে আমরা সম্প্রচার করছি। আমি মনে করি এসব সিরিয়াল দেখে দেশের ১৬ কোটি মানুষ আনন্দিত হচ্ছে এবং ইসলামি ইতিহাসগুলো তারা এই সিরিয়ালের মাধ্যমে জানতে পারছেন।
রেডিও তেহরান: ফাজর ফিল্ম ফেস্টিভেলে আপনার কাছে কেমন লাগল?
সালাহউদ্দিন আহমেদ: দেখুন, ফাজর ফিল্ম ফেস্টিভেলে এসে আমি ইরানিদের মন-মানসিকতা দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি। তাদের আতিথেয়তা আমাদেরকে এতই মুগ্ধ করেছে যে আমরা অভিভূত। ইরানি খরচে আমরা এখানে এসেছি, পাঁচতারা হোটেলে আমাদেরকে রেখেছেন এবং ইরানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ করিয়েছেন। সত্যিই আমরা ইরানিদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছি।
রেডিও তেহরান: ইরানি সিরিয়াল ও ফিল্ম সম্পর্কে কি আপনার মূল্যায়ন কী?
সালাহউদ্দিন আহমেদ: ইরানি বেশ কিছু সিরিয়াল ও সিনেমা আমরা দেখেছি। এসব সিরিয়াল ও সিনেমা দেখে আমরা খুবই সেটিসফাই কারণ এখানে শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। এসব সিনেমা ও সিরিয়াল যদি বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দেখানো হয় তাহলে মনে হয় অনেক কিছু শিখতে পারব। খুবই শিক্ষণীয় এসব সিনেমা ও সিরিয়ালগুলো।
রেডিও তেহরান: সাধারণত বিদেশি সিরিয়াল বা ফিল্ম বলতে যেটা বুঝায় তার সাথে ইরানি ফিল্ম ও সিরিয়ালে পার্থক্য কি দেখলেন আপনি।
সালাহউদ্দিন আহমেদ: দেখুন, বেশ কিছু পার্থক্য ইরানি ফিল্ম ও সিরিয়ালগুলোর মধ্যে রয়েছে। প্রথমত মানের দিক থেকে খুবই ভালো। এসব ফিল্ম ও সিরিয়ালে ইসলামি আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে। এতে কুসংস্কার বলতে কিছু দেখানো হয় না। ইরানি ফিল্ম ও সিরিয়ালে কুরআনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। নবী রাসুলদের ঘটনা খুবই চমৎকারে ফুটে উঠেছে।
এর আগেই আমি বলেছি- আইআরআইবির কাছ থেকে ইউসুফ আ. বা ইউসুফ জুলেখা সিরিয়ালটি আমরা নিয়ে বাংলায় ডাবিং করে সম্প্রচার করেছি। আর এই ইউসুফ –জুলেখার ঘটনা বা ইতিহাস আমরা ছোট বেলায় গল্পে গল্পে শুনেছি এবং জানি। আমাদের মা-বাবারাও সে ইতিহাস জানত। সেই ইতিহাস নির্ভর ঘটনা আমরা ইউসুফ-জুলেখা সিরিয়ালের মাধ্যমে দেখছি।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা, বাংলাদেশে তো আরো অনেক বিদেশি সিরিয়াল দেখানো হচ্ছে। অন্য দেশের সিরিয়ালগুলো বিশেষ করে তুরস্ক ও ভারতের সিরিয়ালগুলোর ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে সেগুলো পরিবারের সন্তানদের নিয়ে একসাথে বসে দেখা যায় না। আপনি কি মনে করেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ: ঠিকই বলেছেন আপনি। আসলে ভারতের সিরিয়ালগুলো মান এবং আদর্শের দিক দিয়ে আমাদের সাথে যায় না। কারণ আমদের দেশ একটি মুসলিম দেশ। আর ভারতের সিরিয়ালে যেসব আদর্শ তুলে ধরা হয় সেগুলো আমাদের আদর্শের সাথে মেলে না। এখানে অনেক কুসংস্কার রয়েছে। আর আমার মনে হয় এসবের মাধ্যমে অনেক কুসংস্কার আমাদের মধ্যে ঢুকছে। এ বিষয়টি আমার খুব করে মনে হচ্ছে। আর আমাদের এখানে ভারতীয় সিরিয়াল সম্প্রচারের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। কিন্তু তাতে কিছুই হয়নি।
রেডিও তেহরান: সর্বোপরি ইরান আপনার কাছে কেমন লাগল?
সালাহউদ্দিন আহমেদ: ইরান আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। এটি একটি সুপ্রাচীন সভ্যতার দেশ। অনেক বড় একটি দেশ। ইরানের বিভিন্ন বিষয় আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। যেমন ধরুন- এখানকার রাস্তায় প্রচুর গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আমি ট্রাফিক জ্যাম তেমন দেখিনি। সবকিছু চমৎকার শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে চলছে। এসব বিষয় খুব ভালো লেগেছে।
আমরা একটা রিসোর্টে গিয়েছিলাম। রিসোর্টটি দেখার পর আমার এত ভালো লেগেছে যে আমি আমার পুরো পরিবারকে রিসোর্ট দেখানোর ইচ্ছে পোষণ করেছি। আমি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে গিয়েছি। কিন্তু একটা পার্কে যে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয় এমন চিত্র আমি কোথায় দেখিনি। এ বিষয়টি দারুনভাবে আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি আবার আমার পরিবারসহ এখানে ভিজিট করব। আবার আসব আমি ইরানে। আমার ছেলেমেয়ে ইরানের এসব চমৎকার বিষয় উপভোগ করবে বলে আশা করছি। এসব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার পর ভাবনায় আসে নিজের দেশের কথা। তখন মনে হয়েছে আসলে আমাদের দেশটাও কেমন হওয়া উচিত।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৬