মে ১০, ২০১৭ ১০:৪৬ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৮২ থেকে ৮৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৮২ ও ৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِذَا وَقَعَ الْقَوْلُ عَلَيْهِمْ أَخْرَجْنَا لَهُمْ دَابَّةً مِنَ الْأَرْضِ تُكَلِّمُهُمْ أَنَّ النَّاسَ كَانُوا بِآَيَاتِنَا لَا يُوقِنُونَ (82) وَيَوْمَ نَحْشُرُ مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ فَوْجًا مِمَّنْ يُكَذِّبُ بِآَيَاتِنَا فَهُمْ يُوزَعُونَ (83)

)"কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে) যখন তাদের বিষয়ে (শাস্তির) প্রতিশ্রুতি (বাস্তবায়ন) অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে, তখন আমি তাদের জন্য মাটির নিচ থেকে একটি জীব বের করব। সে তাদেরকে বলবে যে, লোকেরা আমাদের আয়াত বিশ্বাস করত না।" (২৭:৮২)

"(সেদিনের কথা স্মরণ করো) যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে এমন সব লোকের এক একটি দলকে এক জায়গায় নিয়ে আসবো যারা আমার আয়াত অস্বীকার করত৷(তারা যাতে পরস্পরের সঙ্গে মিশে যেতে না পারে সেজন্য) তাদেরকে ঘেরাও করে রাখা হবে। " (২৭:৮৩)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ দুই আয়াতেও কিয়ামত সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে, কিয়ামত যখন নিকটবর্তী হবে তখন আল্লাহতায়ালা কিছু মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করে মাটির নিচ থেকে বের করে নিয়ে আসবেন। এ অবস্থায় একজন কিয়ামত অস্বীকারকারীদেরকে বলবে যে, তোমরা আল্লাহর বহু নিদর্শন ও মোজেজা দেখার পরও কিয়ামত দিবস ও মৃত্যুপরবর্তী জীবনকে অস্বীকার করেছিলে। আল্লাহ যে মৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জীবিত করতে পারেন সে কথা তোমরা অস্বীকার করেছিলে।

এর আগেও আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় মৃত মানুষকে জীবিত করার ঘটনা ঘটেছে। পবিত্র কুরআনেও এ বিষয়ে বক্তব্য এসেছে। একজন নবী আল্লাহর কাছে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার বিষয়টি দেখার আবেদন করেছিলেন। আল্লাহ ওই আবেদন গ্রহণ করে তার মৃত্যুর ১০০ বছর পর আবার তাকে জীবিত করেন। সূরা বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াতে এ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। 

সূরা বাকারার ৭৩ নং আয়াতে এসেছে, জবাইকৃত গরুর একটি অংশ দিয়ে নিহত ব্যক্তিকে আঘাত করার পর ওই ব্যক্তি পুনরায় জীবন ফিরে পায় এবং জীবিত হওয়ার পর ওই ব্যক্তি হত্যাকারীর নাম বলে দেয়। এছাড়া হজরত ঈসা (আ.)'র একটি গুরুত্বপূর্ণ মোজেজা ছিল, তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় মৃতকে জীবিত করতে পারতেন। এ ছাড়াও সূরা বাকারার ২৪৩ ও ৫৬ নম্বর আয়াতেও আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। শেষ জামানায় কিছু ব্যক্তির পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার কথাও কুরআনে এসেছে। যদিও তাদের তাদের নাম ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়নি। এ সম্পর্কে জানতে হলে সহিহ হাদিসের বই পড়তে হবে। সূরা নমলের ৮২ নম্বর আয়াতে "দাব্বাহ" «دَابَّه» শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষকে বুঝাতে এ শব্দটি খুব কমই ব্যবহৃত হয়। তবে নানা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পবিত্র কুরআনে যেহেতু এ শব্দটি একবচন ও বহুবচন উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেহেতু এ শব্দটি বিস্তৃত অর্থ বহন করছে এবং তা মানুষ অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনিভাবে সূরা আনফালের ২২ নম্বর আয়াতেও ওই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হয়েছে। 

সূরা নমলের ৮২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ মাটির নিচ থেকে একটি জীবকে বের করে আনবেন এবং তাকে দিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলাবেন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, সে সময় আল্লাহর কোনো প্রিয় বান্দাকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে যিনি কিয়ামত অস্বীকারকারীদের সঙ্গে কথা বলবেন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, ওই ব্যক্তিটি হবেন হজরত আলী (আ.)। কুরআনে শেষ জামানায় কিছু সৎ ব্যক্তিকে জীবিত করার কথাও বলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, এসব ব্যক্তিকে জীবিত করা হবে যাতে ইমাম মেহেদী (আ.)'র হুকুমতের সময় তারা ইমামকে সহযোগিতা করতে পারেন এবং এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পারেন। অন্যদিকে, আল্লাহতায়ালা শেষ জামানায় কিছু জালিম ও কাফিরকেও জীবিত করবেন, যাতে তারা দুনিয়াতেও তাদের অপরাধের শাস্তি ভোগ করতে পারে।

সূরা নমলের ৮২ ও ৮৩ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষ শুধুমাত্র কেয়ামতের দিন পুনরুজ্জীবিত হবে তাই নয়, কেয়ামতের আগেও দুনিয়াতে কিছু মানুষকে পুনরায় জীবিত করা হবে এবং কিয়ামতে নিকটবর্তী হওয়ার পর আরও কিছু ব্যক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

২. বিচার দিবসে কাফির- জালিম এবং সৎ-মুমিন সব ধরনের মানুষই উপস্থিত থাকবে। যেদিন পৃথিবীর ইতি ঘটবে, সেদিন জালিমরা হবে অপমানিত এবং সৎ ব্যক্তিরা হবে প্রশংসিত।

সূরা নমলের ৮৪ও ৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,  

 حَتَّى إِذَا جَاءُوا قَالَ أَكَذَّبْتُمْ بِآَيَاتِي وَلَمْ تُحِيطُوا بِهَا عِلْمًا أَمْ مَاذَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (84) وَوَقَعَ الْقَوْلُ عَلَيْهِمْ بِمَا ظَلَمُوا فَهُمْ لَا يَنْطِقُونَ (85)

"যখন তারা আসবে, তখন আল্লাহ বলবেন, জ্ঞানগত দিক থেকে পূর্ণ আয়ত্বে না থাকার পরও তোমরা কি আমার আয়াতগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে? (জীবদ্দশায়) তোমরা কী করতে?" (২৭:৮৪)

"আর তাদের জুলুমের কারণে (আজাবের) বিষয়টি তাদের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, কাজেই তারা কিছুই বলতে পারবে না (এবং তাদের বলার মতো কিছুই নেই)৷" (২৭:৮৫)

আগের দুই আয়াতে আমরা শেষ জামানায় কাফির ও মুমিনদের নেতাদের পুনরুজ্জীবিন সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এখানে আলোচিত পুনরুজ্জীবনের অর্থ হলো কেয়ামত নিকটবর্তী হলে কিছু লোককে পুনরায় জীবিত করা হবে। হাদিস অনুযায়ী, এ ধরনের পুনরুজ্জীবন হল, কেয়ামতের একটি শর্ত; যা কিয়ামতের আগে সম্পন্ন হবে। আর কেয়ামতের দিন সবাইকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। আর সেদিন আল্লাহর নিদর্শনগুলো পরিপূর্ণভাবে ফুটে উবে। সেদিন মুমিন ও কাফির সবাইকে জীবিত করা হবে। আল্লাহ সেদিন কাফেরদেরকে জীবিত করার পর জিজ্ঞাসা করবেন, তোমরা কেন আল্লাহর মোজেজাকে ও আসমানি গ্রন্থকে অস্বীকার করেছিলে? এতটুকু জ্ঞান কি তোমাদের মধ্যে ছিল না? এছাড়াও তোমরা বহু অপছন্দনীয় কাজ করেছ, যা কুরআনে নিষেধ করা হয়েছে। যখন তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে তখন তারা তাদের কৃতকর্মকে অস্বীকার করতে পারবে না। আর এ জন্য কোন অজুহাতও তারা দেখাতে পারবে না। অবশেষে তারা তাদের অপরাধ মেনে নেবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির সম্মুখীন হবে।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. শেষ জামানায় কিয়ামতের বিভিন্ন আলামত দেখা যাবে।

২. কোনকিছু না জেনে আমরা অস্বীকার করব না, কারণ এজন্য অবশ্যই আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। যে কোনো বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে দলিল-প্রমাণ ও যথেষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে।

 ৩. কেয়ামতের দিন সবারই বিচার করা হবে। সেদিন তাদের বলার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।#