সূরা আন-নমল; আয়াত ৮৬-৮৮ (পর্ব-১৭)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৮৬ থেকে ৮৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৮৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا اللَّيْلَ لِيَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (86)
"ওরা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি রাত্রি সৃষ্টি করেছি ওদের বিশ্রামের জন্য এবং দিনকে করেছি আলোকোজ্জ্বল। এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে।" (২৭:৮৬)
আগের কয়েকটি আয়াতে কিয়ামত সম্পর্কে কিছু প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে যাতে কিয়ামত অস্বীকারকারীরা তাদের ভ্রান্ত ধারণা থেকে সরে আসে এবং শেষ বিচারের দিনকে অসম্ভব না ভাবে। এরপর আজকের এই আয়াতে মহান আল্লাহর ক্ষমতার অন্যতম নিদর্শনের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: তোমরা কি কখনো এটা ভেবে দেখেছো যে, পৃথিবীতে যদি সারাক্ষণ দিন থাকত এবং সূর্যের প্রচণ্ড তাপ কখনো বন্ধ না হতো তাহলে তোমরা কীভাবে বিশ্রাম নিতে? অথবা পৃথিবী যদি সারাক্ষণ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকত তাহলে তোমরা কীভাবে জীবিকার সন্ধানে বের হতে? সূর্যের আলোর অভাবে প্রাণী ও উদ্ভিদ কীভাবে বেঁচে থাকত? কিন্তু আল্লাহ সেটি করেননি। তিনি ২৪ ঘণ্টায় একবার রাত এবং একবার দিন দিয়েছেন যাতে করে মানুষ রাতে বিশ্রাম নিতে এবং দিনে চেষ্টা ও পরিশ্রম করে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। তোমরা কি দিন ও রাতের এই পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে দৈবক্রমে ঘটে যাওয়া কোনো বিষয় মনে করো?
বর্তমানে বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, শান্তিতে ও নির্বিঘ্নে ঘুমের জন্য রাতের অন্ধকার মানুষের মনোস্তত্ত্বের ওপর গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে দিনের আলো মানুষের মধ্যে কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগায়।
পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায়ও দিন ও রাত সৃষ্টির উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে চিন্তাশীল মানুষকে এই বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, তোমরা নিজেদের চারপাশের পৃথিবীর দিকে তাকাও এবং দেখো আল্লাহ কত বিচক্ষণতার সঙ্গে তোমাদের জন্য এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তাঁর প্রতি ঈমান আনো এবং অযথা কিয়ামতের কঠিন দিবসকে অস্বীকার করো না।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. দিন ও রাতের সৃষ্টি এই বিশ্বজগতের প্রতিপালকের অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অন্যতম নিদর্শন। এ ধরনের বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। প্রতিনিয়ত দেখছি বলে আল্লাহর এই অপার নেয়ামত সম্পর্কে উদাসীন হওয়া যাবে না।
২. কিয়ামত সংক্রান্ত আয়াতের মাঝখানে রাত ও দিন এবং ঘুম ও জাগ্রত হওয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে আসা হয়েছে। এই পৃথিবীতেই আমরা যে প্রতিদিন মারা যাই এবং আবার জীবিত হই সে বিষয়টি বোঝানোর জন্যই আল্লাহ এমনটি করেছেন।
৩. মানুষের জীবনের সব কর্মসূচি হওয়া উচিত প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দিনে কাজ করা এবং রাতে ঘুমানো উচিত। মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থাকা এবং দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো প্রকৃতি বিরোধী কাজ।
সূরা নমলের ৮৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ وَكُلٌّ أَتَوْهُ دَاخِرِينَ (87)
"এবং যেদিন শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে সেদিন আল্লাহ যাদের ভীতিগ্রস্ত করতে চাইবেন না, তারা ব্যতীত আসমান ও জমিনের সকলেই ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে এবং সকলেই বিনীত (ও মস্তকবনত) অবস্থায় তাঁর নিকট আসবে।" (২৭:৮৭)
এই আয়াতে আবার কিয়ামত প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে সেই বিচার দিবসের শুরু অর্থাৎ শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন দু’বার শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে। একটি দেয়া হবে এই নশ্বর জগতের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে; যার কথা এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ফুঁৎকার শুনে সব মানুষ ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং মারা যাবে। দ্বিতীয়বারের ফুঁৎকারে সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছে তাদের সবাই জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে।
এই আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে: সিঙ্গার ফুঁৎকার শুনে সব মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। কিন্তু ঈমানদার ও সৎকর্মশীল বান্দা এবং ফেরেশতারা ভয় পাবে না। তারা বরং পূর্ণ নিরাপত্তায় স্থিরচিত্তে অবস্থান করবে। হাদিসে এসেছে, সিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতার নাম হযরত ইস্রাফিল। আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ও বিখ্যাত ফেরেশতাদের অন্যতম তিনি।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পবিত্র কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, কিয়ামত দিবসের আগ মুহূর্তে প্রচণ্ড ও ভয়ানক শব্দের একই সময়ে আসমান ও জমিনের সব জীবিত প্রাণী মারা যাবে এবং সৃষ্টিজগত ধ্বংস হয়ে যাবে।
২. এই আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী, আসমানেও এমন প্রাণী আছে যাদের মৃত্যু হবে এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে হাজির হবে।
৩. শুধু মানুষ নয় ফেরেশতাদেরও কিয়ামতের আগে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
সূরা নমলের ৮৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَتَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ إِنَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَفْعَلُونَ (88)
"এবং তুমি পর্বতমালা দেখে অচল মনে করছ, কিন্তু ওরা মেঘপুঞ্জের মতো চলমান, এটি আল্লাহরই সৃষ্টির নিপুণতা, যিনি সমস্ত কিছুকে সৃষ্টি করেছেন সুসংহত। তোমরা যা করো সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত।" (২৭:৮৮)
এই আয়াতেও আল্লাহর অন্যতম বিস্ময়কর সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: তোমাদের কাছে পাহাড় ও পর্বতগুলোকে স্থির ও অচল বলে মনে হয়। অথচ এগুলো মেঘমালার মতো ধীরগতিতে চলমান। এটি হচ্ছে সেই আল্লাহর অপার মহিমা যিনি পৃথিবীকে নিজ কক্ষপথে প্রচণ্ড বেগে ঘুর্ণায়মান করে দেয় সত্ত্বেও আমাদের কাছে স্থির বলে মনে হয়। বিষয়টি এতটাই বিস্ময়কর যে, অতীতে যুগে যুগে মানুষ মনে করেছে, পৃথিবী স্থির এবং সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এমনকি অতীতের বিখ্যাত অনেক মনীষীও এই মতে বিশ্বাসী ছিলেন।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. যেহেতু পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠের উপর অবস্থিত তাই এই আয়াত অনুসারে পর্বত সচল হয়ে থাকলে ভূপৃষ্ঠও চলমান।
২. বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, গ্যালিলিওসহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা ভূপৃষ্ঠের ঘুর্ণয়ন আবিস্কার করার প্রায় এক হাজার বছর আগে পবিত্র কুরআনে ভূপৃষ্ঠের চলমান অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এটি পবিত্র কুরআনের অন্যতম বৈজ্ঞানিক মুজিযা বা অলৌকিক ঘটনা।
৩. কুরআনের দৃষ্টিতে মহান আল্লাহ সবকিছুকে সুসংহত করে সৃষ্টি করেছেন এবং কোনো সৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যাবে না।#