মে ১১, ২০১৭ ১৫:৫৬ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ১ থেকে ৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১ থেকে ৩  নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

طسم (1) تِلْكَ آَيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ (2) نَتْلُوا عَلَيْكَ مِنْ نَبَإِ مُوسَى وَفِرْعَوْنَ بِالْحَقِّ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (3)

 “ত্বোয়া-সিন-মিম।” (২৮:১)

“এইগুলো প্রকাশ্য গ্রন্থের আয়াত।” (২৮:২)

“(হে রাসূল) আমি তোমার নিকট বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য মূসা ও ফেরাউনের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে বর্ণনা করছি।” (২৮:৩)

আমরা এর আগের বেশ কয়েকটি সূরার তাফসিরে বলেছি, আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে ২টি শুরু করেছেন কয়েকটি অক্ষর দিয়ে; কোন শব্দ দিয়ে নয়। ওই অক্ষরগুলো প্রত্যেকটি আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়। এই সূরায় যেমনটি বলা হয়েছে- তোয়া-সিন-মিম। কুরআন বিশেষজ্ঞরা একে "হুরুফে মুকাত্বায়া" বলেন। এসব অক্ষরের প্রকৃত রহস্য মহান আল্লাহ ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ই ভালো জানেন। এসব অক্ষরের পরপরই বলা হয়েছে, এগুলো পবিত্র কুরআনের আয়াত।  এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক হয়ত বলতে চান-আমি আমার অলৌকিক গ্রন্থকে এই সব বর্ণমালা দিয়েই সাজিয়েছি। কোনো অপরিচিত বর্ণমালা, শব্দ বা অক্ষর দিয়ে নয়। যারা দাবি করে কুরআন অলৌকিক গ্রন্থ এবং মোজেযা নয়, তারা পারলে এই বর্ণমালা দিয়েই কুরআনের মতো গ্রন্থ রচনা করুক; যা বাক্য, শব্দ ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে হবে নজীরবিহীন। এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর ক্ষমতা; অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়তিনি সাধারণ বর্ণমালা দিয়েই এমন কিতাব রচনা করেছেন যার একটি সূরার মতো কেউ কিছু রচনা করতে পারবে না। যেমন আল্লাহ প্রাণহীন মাটি থেকে অসংখ্য গাছ-পালা, ফল-মূল সৃষ্টি করেনকিন্তু মানুষের পক্ষে কোনো প্রাণ সৃষ্টি করা অসম্ভব। তারা এই মাটি দিয়ে তৈরি করে ইট এবং বাসন-কোসন। 

সূরা কাসাসে ৮৮টি আয়াত রয়েছে এবং এই সূরাটি বিশ্বনবী মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের আগে নাজিল হয়েছে বলে এটি মাক্কি সূরার অন্তর্গত। এই সূরার প্রথম ৪০ আয়াত জুড়ে আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আ.)-এর জন্ম, শিশুকাল, যৌবন, বিবাহ এবং নবুওয়াত প্রাপ্তির সময়কার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সূরার তৃতীয় আয়াতে প্রতাপশালী কাফের সম্রাট ফেরাউনের শাসনামলে হযরত মূসা (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলছেন: আমি এই কুরআনে বাস্তবতার আলোকে এবং সব ধরনের অবাস্তবতা ও ভুল তথ্য বর্জন করে অতীতের নবী-রাসূল ও জাতিগুলোর ঘটনা বর্ণনা করেছি। অতীতের নবী-রাসূল ও ঈমানদার ব্যক্তিরা কী ধরনের সমস্যা ও সংকটে পড়েছিল তা মুমিন ব্যক্তিদের জানানোর জন্য আমি এ কাজ করেছি। মুমিন ব্যক্তিদের এ বাস্তবতা উপলদ্ধি করতে হবে যে, তাদেরকেও অনেক কষ্ট ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে এবং এসব সংকটে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

. এই পৃথিবী পরিচালনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেহেতু এক আল্লাহর তৈরি একক আইন বলবৎ রয়েছে তাই অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস আমাদের চলার পথের পাথেয় হতে পারে।

. অত্যাচারী ও জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ছিল নবী-রাসূলদের বৈশিষ্ট্য। কাজেই মুমিন ব্যক্তিদের উচিত নবী-রাসূলদের এই পথ অনুসরণ করা।

. পবিত্র কুরআনের কাহিনীগুলো সত্য ঘটনা-ভিত্তিক এবং এখানে কল্পনাশক্তি বা রূপকথার কোনো স্থান নেই।

সূরা কাসাসের ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ (4)

“ফেরাউন নিজ দেশে (অর্থাৎ মিশরে) পরাক্রমশালী হয়েছিল এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে ওদের এক শ্রেণিকে হীনবল করেছিল; ওদের পুত্রগণকে সে (গলা কেটে) হত্যা করত এবং নারীদেরকে (দাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য) জীবিত রাখত। নিঃসন্দেহে সে ছিল দুষ্কার্যকারীদের অন্তর্গত।” (২৮:৪)

এই আয়াতে ফেরাউনের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: সে বনি-ইসরাইল জাতিকে দুর্বল করে তাদেরকে শোষণ করার জন্য বিভিন্ন দমননীতি চালাত। জনগণ যাতে ফেরাউনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য সে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন দল ও শ্রেণিতে বিভক্ত করে রাখত। বর্তমান যুগেও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন জাতির ওপর নিজেদের আধিপত্য চাপিয়ে দিতে ডিভাইড এন্ড রুল নীতি বাস্তবায়ন করছে যা ছিল মূলত ফেরাউনের নীতি।  এ ছাড়া, বহু দেশের শাসকও একই কারণে নিজ দেশের জনগণকে নানা অজুহাতে দ্বিধাবিভক্ত করে রেখেছে।

মিশরের স্থানীয় অধিবাসীরা ছিল কিবতি নামে পরিচিত। রাজা ফেরাউন এই গোত্রের সুখ-সমৃদ্ধির সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সেনাবাহিনীসহ সরকারি অফিস-আদালতের সব পদে কিবতি গোত্রের লোকজন স্থান করে নিয়েছিল। অন্যদিকে বনি-ইসরাইল জাতি মিশরে এসেছিল অভিবাসী হিসেবে। ফেরাউন সরকার বনি-ইসরাইলের লোকদেরকে কিবতিদের সেবক বা দাস-দাসী করে রেখেছিল। তাদেরকে স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত রেখে দেশের সবচেয়ে কষ্টসাধ্য কাজগুলোতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

জালেম শাসক ফেরাউন বনি-ইসরাইল জাতির পক্ষ থেকে বিপদ অনুভব করে এক পাশবিক নির্দেশ জারি করে। সে ঘোষণা দেয়, বনি-ইসরাইল গোত্রের যে কারো ঘরে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাকে জীবন্ত রাখতে হবে যাতে বড় হয়ে সে দাসীর কাজে নিয়োজিত হতে পারে। অন্যদিকে পুত্র সন্তানের জন্ম হলে তাকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গলা কেটে হত্যা করতে হবে। এই নৃশংস পন্থায় ফেরাউন চেয়েছিল বনি-ইসরাইলের পুরুষ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে হবে যাতে তারা কোনোদিন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে। ঠিক এরকম এক পরিস্থিতিতে বনি-ইসরাইল জাতির এক দম্পতির ঘরে হযরত মূসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। সরকারি সেনারা যাতে এই পুত্র-সন্তানকে হত্যা করতে না পারে সেজন্য হযরত মূসার মা তাকে একটি কাঠের সিন্দুকে করে নীল নদীতে ভাসিয়ে দেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি থাকলে অত্যাচারী শাসকরা তাদের ওপর অত্যাচার চালাতে পারে না

২. বর্তমান যুগের সাম্রাজ্যবাদীরা হয়ত ফেরাউনের মতো শিশু সন্তানকে হত্যা করছে না কিন্তু পুরুষের পৌরুষত্ব ও বীরত্বপূর্ণ চেতনা ধ্বংস করে ফেলছে। সেইসঙ্গে নারী স্বাধীনতার নামে কিশোরী, তরুণী ও সার্বিকভাবে নারীকে উলঙ্গ ও অর্ধ উলঙ্গ করে প্রদর্শন করা হচ্ছে।#