‘ইরান আমার কাছে খুব ভালো লাগে’
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উৎসব-পরিচালক এবং রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি আহমেদ মুজতবা জামাল বলেছেন, ইরানের শিল্প-সংস্কৃতি জ্ঞানী-গুণীদের অভয়ারণ্য। রেডিও তেহরানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেছেন। আহমেদ মুজতবা জামাল বলেন, আমার মনে হয় ইরানের ইয়ং জেনারেশেনের সবাই শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
সম্প্রতি ইরানে অনুষ্ঠিত ৩৫তম ফাজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব তিনি যোগ দিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা। আর উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: আহমেদ মুজতবা জামাল, আপনার কাছে প্রথমেই যে বিষয়টি জানতে চাইব সেটি হচ্ছে আপনি কি ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবে এই প্রথম এলেন নাকি এর আগেও এসেছিলেন?
আহমেদ মুজতবা জামাল: না প্রথম নয়; ইরানের ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবে আমি প্রথম আসি ১৯৯৪ সালে। এবার নিয়ে তেহরানের এ উৎসবে ১৩ বার অংশগ্রহণ করেছি। তাছাড়া ইরানের আরবান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করতে আরেকবার আমি তেহরান এসেছিলাম। সে দিক থেকে হিসাব করলে মোট ১৪ বার তেহরান সফর করলাম।
তেহরানে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিত জন আছেন। তাঁদের সহযোগিতায় আমি ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব পরিচালনা করছি। তাঁদের বিভিন্ন ফিল্ম সেখানে উপস্থাপন করছি। শুধু ফিল্ম নয় অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেন।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা আপনি তো অনেকবার ইরানে এসেছেন, তো ইরান আপনার কাছে কেমন লাগে?
আহমেদ মুজতবা জামাল: ইরান আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ইরানকে খুব পছন্দ করি। দেখুন, কোনো জাতি যদি শিক্ষিত ও মার্জিত হয় তাহলে তাঁর দেশের সর্বত্রই কিন্তু তার একটা ছাপ দেখা যায়। আমার কাছে মনে হয় ইরানের শিল্প-সংস্কৃতি জ্ঞানী-গুণীদের অভয়ারণ্য।
এখানকার তরুণরা প্রায় প্রত্যেকে শিল্প সংস্কৃতি চর্চ্চার সাথে জড়িত। এ পরিবেশটা আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবে আমি তরুণ প্রজন্মসহ বয়স্কদের পদচারণা দেখি। দেখা যায় তারা কেউ ছবি নির্মাণ করেন আবার কেউ পরিচালনা করেন। কেউবা অভিনয় করেন কেউবা প্রযোজনা। প্রত্যেককেই খুব পজিটিভ। ফিল্ম নিয়ে আমাদের সাথে কথাবার্তা বলা বা বিভিন্ন বিষয়ে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ইরানিদের আন্তরিকতা আমাকে খুব মুগ্ধ করে। ইরানিরা আমাদেরকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করেন। এ বিষয়টিও আমার কাছে খুবই ভালো লাগে।
দেখুন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক চলচ্চিত্র উৎসবে আমরা যাই। অনেক জায়গায় আমার বাংলাদেশকে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে বিবেচনা করে আমাদেরকে সেভাবে সম্মান দেখায় না। কিন্তু ইরানিরা আমাদেরকে খুব মূল্যায়ন করেন এবং সম্মান দেখান। এটি আমাদের কাছে খুবই ভালো লাগে।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা মুজতবা জামাল, আপনি তো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছেন। তো সেসব উৎসবের সাথে ইরানের ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবের আলাদা কোনো বৈশিষ্ট আপনার চোখে পড়েছে কি না?
আহমেদ মুজতবা জামাল: দেখুন, সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় আমরা ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবে আসি মূলত ইরানি ফিল্মকে অনুধাবন করার জন্য। ইরানি ছবি সিলেক্ট করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আর আমি কখনো কোনো কিছুকে অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা না করার নীতিতে বিশ্বাসী। প্রতিটি জিনিষের একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে, আলাদা ধ্যান-ধারনা থাকে। আর সেই দৃষ্টিতে "ইরানি ফেস্টিভালের আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য বা ইমেজ আছে। এ ইমেজটি কেবল ইরানি চলচ্চিত্র এবং ইরানি সংস্কৃতির কারণেই হয়ে থাকে। আর এ জন্যে আমি ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবে আসি।" এখানে কোনো ফরাসি ছবি বা কোরিয়ান ছবি দেখার জন্য আসিনা। ফলে ইরানের ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবকে আমি অন্য কোনো কিছুর সাথে তুলনা করতে পারব না। এটি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।
রেডিও তেহরান: জনাব আহমেদ মুজতবা জামাল, ইরানি ফিল্ম সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
আহমেদ মুজতবা জামাল: দেখুন, যেকোনো শিল্প মাধ্যমের প্রধান কতগুলো বিষয় থাকে। আর এসব বিষয় থাকলে সেই শিল্প-সংস্কৃতি অন্যের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। যদি শিল্প-সংস্কৃতির কাজে সততার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং যদি তাতে তাদের ঐতিহ্যকে ধারণ করতে দেখা যায় তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর এসবের মাধ্যমে তার নিজস্ব গল্প বলার ঢংয়ে যদি বিষয়কে চিত্রায়িত করেন, যদি শৈল্পিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটান এবং বাণিজ্যিক ভাবনার উর্ধ্বে উঠতে পারেন তবে তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। আর ইরানি ছবির মধ্যে এগুলো আছে।
তবে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যেসব ছবি তৈরি হয় তার হয়তো একটা আবেদন বাণিজ্যিকভাবে থাকে কিন্তু সেই আবেদনটা খুবই ক্ষণস্থায়ী। যদি সততার সাথে শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছবি বানানো হয় এবং সংস্কৃতির মূল জায়গাটা যদি ধারণ করা যায় তাহলে তার আবেদন দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ সেটাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করবে।
রেডিও তেহরান: মুজতবা জামাল, আপনি তো নিজে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং সেদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত। তো ইরানি ছবিগুলো কি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
আহমেদ মুজতবা জামাল: নিশ্চয়ই পারে। দেখুন, বাংলাদেশ শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি সবদিক দিয়েই অনেক অগ্রসর থাকলেও চলচ্চিত্রের দিক দিয়ে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। আমাদের একটা সময় ছিল জহির রায়হান বা খান আতাউর রহমান-তাঁরা অনেক ভালো ছবি বানিয়েছেন। যেমন ধরুন- কাঁচের দেয়াল, কখনও আসেনি ধারাপাত, নদী ও নারী এবং সূর্যস্নানের মতো খুব সুন্দর সুন্দর ছবি একসময় নির্মিত হয়েছে।
স্বাধীনতার পর ‘সূর্য দীঘল বাড়িসহ আরো বহু ছবি তৈরি হয়েছে। কিন্তু মাঝখানে বাংলাদেশের ফিল্মে একটা ঝড় বয়ে গেছে। দেখা গেছে কাটপিসসহ বিভিন্ন ব্যাপার ঢুকে গেছে। খুব অযোগ্য এবং মাস্তান প্রকৃতির লোকজন কিছু সময়ের জন্য আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ভর করেছিলো। তবে আস্তে আস্তে তারা সবাই চলে গেছে। তরুণ প্রজন্ম এখন আমাদের চলচ্চিত্রে এগিয়ে এসেছে। আমাদের দেশে এখন অনেক তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা আছে যারা ভালো ভালো ছবি বানাচ্ছে। যেমন- তৌকির, মোস্তফা সারোয়ার ফারুকি, রুবাইয়াত এরকম অনেকেই আছে। তারা ভালো ভালো ছবি বানাচ্ছে। একটা সময় দেখবেন তাঁরা বাংলাদেশকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের ছবির আগের যে অবস্থানটা ছিল সেই জায়গায় খুব তাড়াতাড়ি তরুণরা যেতে পারবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। বছরে কমপক্ষে ১০ টা ভালো মানের ছবি আমরা দেখতে পাবো বলে আশাকরি।
রেডিও তেহরান: ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি সম্পর্কে কিছু বলুন।
আহমেদ মুজতবা জামাল: ১৯৯২ সাল থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি এই উৎসব অর্গানাইজ করে থাকে। আর আমি আগেই বলেছি রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির বর্তমান সভাপতি। এ বছর রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির ৪০ বছর পূর্তি হবে। ১৯৯৭৭ সাল থেকে এই সোসাইটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে এবার ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ২৫ বছর পালন করছি। ফলে বলা চলে খুব সুন্দর একটা সময় আমরা পার করছি।
রেডিও তেহরান: জনাব আহমেদ মুজতবা জামাল, আমরা সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে চলে এসেছি। তো সবশেষে রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
আহমেদ মুজতবা জামাল: দেখুন, আমি শুধু এটুকুই বলব যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভগ্নদশাকে পৃষ্টপোষকতা করার জন্য যে চলচ্চিত্র উৎসবগুলো হয় বা চলচ্চিত্র সংসদের যে আন্দোলন হয় তার সঙ্গে আপনাদের সম্পৃক্ততা খুব দরকার। আমাদের চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে আপনাদের অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের ফিল্ম শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনাদেরকে ভূমিকা রাখারও আহ্বান জানাচ্ছি।
আমি বিশ্বাস করি যে কোনো দেশের সংস্কৃতি যদি শক্ত থাকে তাহলে তার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ও সামাজিক অস্থিরতা সবকিছুর ক্ষেত্রে কিন্তু এটি সহায়ক হিসেবে কাজ করে। আর সংস্কৃতির জায়গায় যদি গলদ থাকে তাহলে দেশ বেশি দূর যেতে পারবে না।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২১