‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’: (ইরানি মনীষী সাইয়্যেদ ইসমাইল জোরজানি-১)
গত পর্বের আলোচনায় আমরা বলেছিলাম জোরজানি জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্ত্ব করার জন্য বহু শহর সফর করেছেন। এইসব সফরের উপদেশদাতা বা গাইড ছিলেন তারই শিক্ষককুল। কিন্তু তার সেই শিক্ষকদের বেশিরভাগের নামই অজানা রয়ে গেছে।
জোরজানির অল্প যে ক’জন শিক্ষকের নাম জানা গেছে আবুল কাসেম আবদুর রাহমান ইবনে আবি সাদিক নিশাপুরি ছিলেন তাদের অন্যতম। এরিমধ্যে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের জগতে আবির্ভূত হন বিশ্ববিশ্রুত মনীষী ইবনে সিনা। ইবনে সিনার আবির্ভাব ইসলামী ও ইরানি চিকিৎসা-বিজ্ঞান জগতে আনে বড় ধরনের বিপ্লব। ইবনে সিনার প্রখ্যাত ছাত্ররাও এ মহান মনীষীর বৈজ্ঞানিক পথ অব্যাহত রাখেন। ইবনে সিনার অন্যতম বড় ছাত্র ছিলেন নিশাপুরের ইবনে আবি সাদিক। তিনি নিশাপুরে ফিরে এসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বহু ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দেন এবং এর পাশাপাশি চিকিৎসা চর্চা ও বই লেখায় ব্যস্ত থাকেন। এভাবে ইবনে সিনার চিকিৎসা-পদ্ধতি অব্যাহত থাকে। ইবনে আবি সাদিক নিশাপুরকে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের এক বড় কেন্দ্রে পরিণত করেন। জোরজানি তার এই মহান শিক্ষকের কথা উল্লেখ করেছেন নিজ লেখায়।
ইরানি মনীষী সাইয়্যেদ ইসমাইল জোরজানি তার অন্য যে ক’জন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করেছেন নিজের লেখায় তাদের অন্যতম হলেন আহমাদ ফাররুখ ও প্রখ্যাত অধ্যাপক আবুল কাসেম কোশাইরি নিশাপুরি। ইনি ইন্তিকাল করেছিলেন ৪৬৫ হিজরিতে। কোশাইরি নিশাপুরিকে প্রাচ্যের অন্যতম প্রধান আলেম বলে মনে করা হয়। এই মহান শিক্ষকের কাছে জোরজানি শিখেছিলেন হাদিস শাস্ত্র।
সাইয়্যেদ ইসমাইল জোরজানি চিকিৎসা-বিজ্ঞান ছাড়াও মনোবিজ্ঞান, ওষুধ-বিদ্যা বা ফার্মাকোলোজি, পশু-পাখির চিকিৎসা এবং হাদিস শাস্ত্র জানতেন। খুব সম্ভবত তিনি এসব বিষয়ের ওপর নানা বইও লিখে গেছেন। আরবি সাহিত্য ও কবিতা এবং নীতি শাস্ত্রেও তার গভীর আগ্রহ ছিল। ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, হাদিস ও পবিত্র কুরআনের তাফসিরেও জোরজানির জ্ঞান ছিল বেশ গভীর।
জোরজানির লেখা বইগুলো থেকে জানা যায় তিনি মার্ভ ও বালখসহ খোরাসানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বসবাস করেছিলেন। তিনি এইসব শহরে চিকিৎসার চর্চা করেছেন। সেযুগে খোরাসান ছিল ইরানি সভ্যতা ও সংস্কৃতির এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
প্রাচীন খোরাসানে ছিল চারটি বড় শহর। এই শহরগুলো হল নিশাপুর, বালখ, মার্ভ ও হেরাত। জোরজানি নিশাপুর ভ্রমণ করেছিলেন যৌবনের খুব গোঁড়ার দিকে। এরপর তিনি খুব সম্ভবত মধ্য-বয়সে সফর করেছেন মার্ভ ও বালখ। এ যুগেই তিনি এই শহরগুলোতে অনেক ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি নিজেও চিকিৎসক হিসেবে অনুশীলন করতেন। জোরজানি মার্ভের জনগণের বিশেষ উচ্চারণভঙ্গী বা কথ্য-ভাষা রপ্ত করেছিলেন। আর এ থেকেই মনে করা হয় যে তিনি তার মধ্য-বয়সের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন মার্ভ শহরে।
জোরজানি ইরানি বাদশাহ কুতব আদ দিন মুহাম্মাদ খারাজম শাহের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। তিনি ৫০৪ হিজরিতে তার নামে একটি বইও লিখেছিলেন। খারাজম শাহের শাসনামল শুরু হয়েছিল ৪৯১ হিজরিতে। ধারণা করা হয় যে ৪৩৪ হিজরিতে জন্ম নেয়া জোরজানি এই শাহের অন্যতম শিক্ষক ছিলেন। এ সময় জোরজানি থাকতেন মার্ভ শহরে।
খারাজম অঞ্চলটি ছিল আরাল সাগরের দক্ষিণে অক্সাস নদীর মুখে। এ অঞ্চলটি ছিল বহুকাল ধরেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বড় কেন্দ্র। ৩৮৫ হিজরিতে জোরজানিয়ে খারাজমের রাজধানীতে পরিণত হয়। সালজুকি শাসনামলে খারাজম কিছুকাল খোরাসানের শাসনাধীন ছিল।
কুতব আদ দিন মুহাম্মাদকে খারাজমে পাঠানো হয়েছিল সালজুক রাজবংশের পক্ষ থেকে ৪৯১ হিজরিতে। এর আগেই মোটামুটি স্বাধীন ছিল খারাজম। কুতব আদ দিন খারাজমকে পুরোপুরি স্বাধীন করেন। তার শাসনামলে এ অঞ্চলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটে। কুতব আদ দিন ছিলেন একজন দক্ষ পরিচালক এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক।
৫০৪ হিজরিতে খারাজমের এমন অবস্থার মধ্যেই জোরজানি এখানে আসেন। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৭০। এ বছরটি ছিল খারাজমে কুতব আদ দিন মুহাম্মাদের শাসনামলের ১৪ তম বছর। জোরজানি খারাজমের রাজধানী জোরজানিয়ে শহরের অধিবাসী হন। এরপর তিনি যোগ দেন রাজ-দরবারে এবং রাজা কুতব আদ দিন মুহাম্মাদের অন্যতম প্রধান ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও চিকিৎসক হন।
এ অঞ্চলে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জোরজানি রচনা করেছিলেন চিকিৎসা-বিষয়ক বিশ্বকোষ। এ বই ইরানি চিকিৎসা শাস্ত্রের পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ বইটি চিকিৎসাবিদ হিসেবে জোরজানির খ্যাতি বাড়িয়ে দেয়।
এ যুগে এমন একটি বিশ্বকোষ রচনা জরুরি হয়ে পড়েছিল নানা কারণে। যেমন, ইবনে সিনার ‘কানুন’ শীর্ষক চিকিৎসা-বিজ্ঞান বিষয়ক একটি পরিপূর্ণ বই প্রকাশের পর প্রায় ১০০ বছরের মধ্যে চিকিৎসা বিষয়ক নির্দেশিকার এমন বই আর দেখা যায়নি। জোরজানির এই চিকিৎসা-বিশ্বকোষ ছিল ‘কানুন’-এর চেয়েও বেশি পরিপূর্ণ ও বিশদ-বর্ণনায় সমৃদ্ধ। জোরজানি তার এ বইয়ে তার যুগের বিখ্যাত চিকিৎসকদের নানা অভিজ্ঞতা, মতামত ও যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের মতামতও তুলে ধরেছিলেন। ইসলামী চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাসে জোরজানির এই বিশ্বকোষকে একটি যুগান্তকারী বই হিসেবে দেখা হয়। ইসলামী চিকিৎসা-বিজ্ঞানের উন্নয়নে এ বইয়ের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
জোরজানির এই চিকিৎসা-বিশ্বকোষ লেখা হয়েছিল ফার্সি ভাষায়। চিকিৎসা বিষয়ে ফার্সি ভাষায় এর আগে আর কখনও এমন পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ কেউ রচনা করেননি। এ বই ইরানের চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ধারায় অসাধারণ অগ্রগতির সূচনা করে। ইরানের চিকিৎসা-বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবন ও এর বিকাশের জাতীয় আন্দোলনের মধ্যমনি হয়ে পড়ে জোরজানির এ বইটি তথা চিকিৎসা-বিশ্বকোষ। এ বই বিজ্ঞানে ইরানকে শতভাগ স্বনির্ভর করে এবং তা হয়ে ওঠে ইরানের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার মাধ্যম। জোরজানির এ বই ইরানের চিকিৎসা-পল্লী ও কেন্দ্রগুলো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও রেখেছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
জোরজানির এই চিকিৎসা-বিশ্বকোষ লিখতে বেশ সময় লেগেছিল। অত্যন্ত বিষদ বর্ণনা ও পেশাগত ব্যস্ততা ছিল এর দুই বড় কারণ। তিনি নিজেই এ বইয়ের নবম খণ্ডের শেষের দিকে লিখে গেছেন, যেসব কারণে এ বই লেখা শেষ করতে তার অনেক সময় লেগেছিল- একটি ওষুধের কারখানায় চাকরি করা ছিল সেসবের মধ্যে একটি বড় কারণ।
জোরজানির চিকিৎসা বিশ্বকোষের ছিল নয়টি খণ্ড। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত করেন দশম খণ্ড। এতে ওষুধ তৈরি এবং ওষুধ সংক্রান্ত নানা দিক যেমন, ওষুধের ব্যবহার, প্রতিক্রিয়া ও কার্যকারিতা সম্পর্কিত বিদ্যা তথা ফার্মাকোলজি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন জোরজানি। বইটি লেখা হয়েছিল ৫০৪ হিজরি থেকে ৫২১ হিজরির মধ্যে। বইটি লেখা শেষ করার অল্প কিছুকাল পরই খারাজমের যুবরাজ এই বিশ্বকোষের একটি সারমর্ম তৈরি করতে জোরজানিকে অনুরোধ করেন। ফলে জোরজানি ফার্সি ভাষায় এ বিশ্বকোষের একটি সারমর্ম তৈরি করেন যা প্রকাশ করা হয় দুই খণ্ডে। জোরজানি পরবর্তীকালে তার এ বিশ্বকোষ আরবিতেও অনুবাদ করেছিলেন। তিনি চিকিৎসা বিষয়ে আরও কয়েকটি বই লিখেছিলেন। এ ছাড়াও সাইয়্যেদ ইসমাইল জোরজানি দর্শন ও আধ্যাত্মিক রহস্য বিষয়েও বই লিখেছেন। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৭