মে ২৮, ২০১৭ ১৫:১১ Asia/Dhaka

সম্প্রতি ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩৪তম আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতা। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮৩টি দেশের ২৭৬জন হাফেজ ও ক্বারি অংশগ্রহণ করেন। এরমধ্যে বাংলাদেশের ৬জন প্রতিযোগী ছিলেন।

আমরা আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া বাংলাদেশি হাফেজ ও ক্বারিদের সাথে- ইরান সফরসহ বিভিন্ন বিষয়ে একান্তে কথা বলেছি।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন মো: আবু সাঈদ। উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব হাফেজ, মোখলেসুর রহমান, আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি- ইরানে কুরআন চর্চার প্রবণতা আপনার কাছে কেমন লাগল?

মোখলেসুর রহমান: আমার কাছে মনে হয়েছে এরা ২৪ ঘণ্টাই কুরআন নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ইরানিরা তেলাওয়াত ও কুরআন নিয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করে।

রেডিও তেহরান: জনাব আব্দুল করিম, ইরানে কুরআন চর্চার প্রবণতা আপনার কাছে কেমন লাগল?

আব্দুল করিম: আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভাল লেগেছে। আল্লাহ আমার চোখ দেননি, কিন্তু আমার অন্তর-চক্ষু দিয়ে যা উপলব্ধি করেছি তাতে আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে। শ্রোতাদেরও অনেক ভাল লেগেছে। শ্রোতারা কুরআন শুনে অঝোরে কাঁদছিল, যা আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে।  

রেডিও তেহরান: জনাব মোখলেসুর রহমান, ইরান সম্পর্কে অনেকে মিথ্যাচার করে থাকে। তারা বলে, ইরানিদের কুরআন আলাদা, এতে পরিবর্তন আছে । আসলে আপনিতো নিজে এখানে খুব কাছ থেকে পরিস্থিতি দেখলেন এবং কুরআন পড়লেন। তো এ ধরনের অভিযোগের কি কোনো ভিত্তি আছে?

মোখলেসুর রহমান: আমি বাংলাদেশে থাকাকালীন অনেক কিছু শুনেছি, কিন্তু ইরানে আসার পর যা দেখলাম, তাতে মনে হলো ইরানের কুরআনের মধ্যে বিন্দু মাত্র কোনো পরিবর্তন নেই। 

ইরানের কুরআন আলাদা বলে যে মিথ্যাচার আছে সে সম্পর্কে জনাব,তাওহীদ বিন আলী বললেন, না অবশ্যই কোনো  পরিবর্তন নেই। তাওহীদ বিন আলী আরো বললেন, আমি ইরানের বিখ্যাত ক্বারি শাকের নেজাদকে খুব ভালোবাসি। উনার সাথে সাক্ষাৎ করার খুব ইচ্ছা ছিল। যদি কখনো এই বিশিষ্ট ক্বারির মেহমানদারী করতে পারতাম তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।

আর আল্লাহতায়ালা কুরআনে বলেছেন, এ কুরআন আমি নাজিল করেছি এবং আমি এর রক্ষা করব। আমি মনেকরি, অপ্রচার যেহেতু রসূল (সা.)'র যুগে ছিল সেহেতু এখনো থাকবে।

অন্ধ হাফেজ ও ক্বারি কলিম সিদ্দিকী, ইরানের কুরআন নিয়ে অপপ্রচারকারীদের সম্পর্কে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন-অপপ্রচারকারীরা কাফের মুশরিকদের দালাল। 

কলিম সিদ্দিকী আরো বলেছেন, আমি ইরানে এসে যা শুনলাম কুরআনে কোন পরিবর্তন নেই। যবর- যেরে কোনো পরিবর্তন নেই। সবকিছুই ঠিক আছে। আমি মনে করি, যারা কুরআন সম্পর্কে এমন অপপ্রচার চালায় তারা আমেরিকার দালাল। তারা কাফের-মুশরিকদের দালাল।  ইহুদি-নাসারাদের দালাল।

আর হাফেজ ও ক্বারি আবদুল করিম কুরআন নিয়ে অপপ্রচার সম্পর্কে অন্যদের সাথে একমত পোষণ করে বলেন-ইরানিদের কুরআন ভিন্ন নয়-এ নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সব একই কুরআন।

রেডিও তেহরান: জনাব মোখলেসুর রহমান-আপনি জানেন যে, শিয়া মুসলমানদের সম্পর্কে অনেক অপপ্রচার আছে। কিন্তু ইরানের ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনি (র.) বলেছেন, যারা শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে, তারা শিয়াও নয়- সুন্নিও নয়; বরং তারা হলো সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল। তো মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের গুরুত্ব সম্পর্কে আপনি কিছু বলুন?

মোখলেসুর রহমান: ইমাম খোমেনী (রহ.)'র কথার সাথে বিশ্বের সকল মুসলমানদের একমত হওয়া উচিত। সময় থাকতে কাফেরদের ব্যাপারে হুঁশিয়ার হওয়া উচিত। মুসলমানদের উচিত  ইমাম খোমেনীর বক্তব্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।  

হাফেজ ও ক্বারি তাওহীদ বিন আলী বললেন- ইরানের ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনি (র.) এর বক্তব্য যথার্থ। তিনি এ সম্পর্কে আরো বলেন, সমগ্র মুসলিমদের এক হওয়া উচিত। একত্ববাদের ঘোষণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে।

মুসলমানদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন-অন্ধ হাফেজ ও ক্বারি আবদুল করিম। তিনি বলেন, মুসলমানদের মধ্যে অবশ্যই ঐক্য প্রয়োজন। ঐক্য না থাকার কারণে আজ মুসলমানরা নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হচ্ছে।

রেডিও তেহরান: জনাব তাওহীদ রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আপনি কিছু বলুন।

তাওহীদ: সকলের কাছে অনুরোধ করব, আপনারা সকলেই রেডিও তেহরান শুনবেন। আর রেডিও তেহরানের কাছে অনুরোধ করব, আমি যেন ইরানি বিখ্যাত ক্বারি শাকের নেজাদের সাক্ষাৎ পেতে পারি এবং তাকে জীবনে একবার হলেও বাংলাদেশে নিয়ে মেহমানদারী করতে পারি।    

রেডিও তেহরান: হাফেজ ও ক্বারি মোখলেসুর রহমান, ইরান আপনার কাছে কেমন লাগল, কেমন দেখলেন আপনি।

মোখলেছুর রহমান: আমি গতমাসে লেবাননে গিয়েছিলাম, সেখানে ৩২ টি দেশের মধ্যে আমরা বাংলাদেশিরা ১ম স্থান অধিকার করেছিলাম। সেখানে আমরা বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উপরে তুলে ধরেছি।  তারপরও আমার মনে হয় না, বিশ্বে ইরানের মত এত সুন্দরভাবে কোথাও কুরআন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। দেখলাম ইরানে যখন কুরআন তেলাওয়াত করা হয় তখন সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনে। মহিলাদেরকেও দেখলাম কুরআন শুনছে আর চোখ দিয়ে পানি ফেলছে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশেও যদি এমন হতো তাহলে অনেক ভাল হতো।

ইরান সফর সম্পর্কে কলিম সিদ্দিকী বলেছেন, সত্যিই আমার ইরান খুব ভাল লেগেছে। কারণ শ্রোতারা যখন মনে প্রাণে কুরআন তেলাওয়াত শোনে তখন তারা অঝোরে কাঁদতে থাকে।

রেডিও তেহরান: জনাব হাফেজ কলিম সিদ্দিকী আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি- ইরানে কুরআন প্রতিযোগিতার এ আয়োজন আপনার কাছে কেমন লাগল?

হাফেজ কলিম সিদ্দিকী: আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভাল লেগেছে। আমি অন্ধ। তবে আমার অন্তরচক্ষু দিয়ে যা উপলব্ধি করেছি তাতে আমার খুবই ভাল লেগেছে। তেলাওয়াতগুলি আমার কাছে ভীষণ ভাল লেগেছে।

রেডিও তেহরান: জনাব কলিম সিদ্দিকী- ইরানে হাফেজ ও ক্বারিদের সম্মান ও মর্যাদা কেমন দেখলেন আপনি?

হাফেজ কলিম সিদ্দিকী: ইরানে হাফেজ ক্বারিদের অনেক সম্মান–মর্যাদা দেয়া হয়। অথচ আমাদের বাংলাদেশে এমনভাবে হাফেজ-ক্বারিদের সম্মান-মর্যাদা দেয়া হয় না। যদি আমাদের সরকার সম্মান দিত তাহলে কত ভাল হতো। বিভিন্ন দেশ থেকে ক্বারিরা সম্মান অর্জন করে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরে তাদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে একটু সম্মানও জানানো হয় না। অথচ ভারতে হিন্দুত্ববাদী সরকার থাকা সত্ত্বেও সেখানে হাফেজ ও ক্বারিদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। কয়েকদিন আগে ভারত সরকার বিদেশ থেকে সম্মান অর্জনকারী হাফেজদেরকে সংবর্ধনা জানিয়েছে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৮