খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-৩)
-
ইরানি ইফতারি
গত পর্বের আলোচনায় আমরা শুনেছিলাম যে মহানবী (সা) বলেছেন, রমজান মাসে সবচেয়ে ভালো আমল হল আল্লাহ যা যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। বিশ্বনবী (সা)’র এই উপদেশ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে আমরা জেনেছি যে নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে দূরে থাকার একটি ভালো উপায় হল আল্লাহর প্রেম ও আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকা। আর আল্লাহর প্রেমে মশগুল থাকার ভালো এক উপায় হল নিজেকে সবচেয়ে বড় পাপী মনে করে আল্লাহর সামনে দাসানুদাসের মতো বিনীত হয়ে থাকা।
পাপের আকর্ষণ প্রতিরোধ করার বা নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে দূরে থাকার আরও একটি ভালো উপায় হল মৃত্যু, কবরের আজাব ও পরকালের শাস্তির কথা প্রায়ই স্মরণ করা। মৃত্যু খুবই সন্নিকটে- এ কথা সব সময়ই মনে রাখা উচিত।
নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে দূরে থাকার জন্য বেশি বেশি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন জরুরি এবং ব্যাপক মাত্রায় কুরআন ও হাদিস চর্চা করার গুরুত্বও আমরা যেন ভুলে না যাই। মহানবীর পবিত্র আহলে বাইতের বাণী থেকেও আমরা পাপ বর্জনের শিক্ষা নিতে পারি। মহানবীর আহলে বাইতের বাণী মূলত পবিত্র কুরআন ও হাদিসেরই ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ।
বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের সদস্য আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ) বলেছেন, প্রত্যেক বক্তব্য বা কথা যাতে আল্লাহর স্মরণ নেই তা হল অর্থহীনতা বা অন্তঃসারশূন্যতা, আর যে নীরবতার মধ্যে আল্লাহ নিয়ে কোনো চিন্তা নেই তা হচ্ছে উদাসীনতা বা মনোযোগহীনতা এবং যে চিন্তার মধ্যে আল্লাহর স্মরণ বা আল্লাহর প্রতি দৃষ্টি নেই তা হচ্ছে অনর্থক সময় নষ্ট করা।
হযরত আলীর এই অমূল্য বাণীতে খোদাপ্রেমের এক দারুণ সূত্র বা মূল-নীতি ফুটে উঠেছে।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, আমি তোমাদের ঘাড়ের প্রধান রগ বা শাহরগের চেয়েও কাছে রয়েছি?

এখানে যে নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে তা শারিরীক নৈকট্য নয়। অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি মনে করেন, মানুষের শরীর ও আত্মার মাঝে তৃতীয় একটি মানসিক সত্তা আছে যা অনেকটা আয়নার মত বা আয়নার সঙ্গে তুলনার যোগ্য। আমরা যদি আমাদের মন-মানসিকতাকে খোদামুখী করতে চাই তাহলে এই আয়নাকে আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ করতে হবে। এই আয়না যত বেশি খোদামুখী হবে ততই পাপ ও নানা ধরনের অসৎ স্বভাবের অন্ধকার দূর হবে।
আমাদের মনের আয়নাকে যদি খোদামুখী করা যায় পার্থিব সব আকর্ষণ দূর করার মাধ্যমে তখন তাতে প্রতিফলিত হবে মহান আল্লাহর নানা মহৎ গুণ। আর এ অবস্থাতেই মানুষ অর্জন করে খোদা-প্রদত্ত নানা অলৌকিক শক্তি। তারা তখন এমন কিছু দেখেন যা দেখে না সাধারণ মানুষ। যারা কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ)’র সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন তাঁরা অন্তরের দিক থেকে এতো বেশি খোদামুখী ছিলেন যে ইমাম হুসাইন (আ) যে ধরনের অন্তদৃষ্টি অর্জন করেছিলেন তাঁরাও কিছুটা একই ধরনের অন্তদৃষ্টি অর্জন করেছিলেন। ফলে তাঁদের মধ্যেও বিন্দুমাত্র ভয় ছিল না। ইমামের মতো তাঁরাও দেখছিলেন বেহেশত তাঁদের অতি সন্নিকটে। আর একেই বলে শুহুদ তথা সাক্ষীর মত অবলোকন। অর্থাৎ তাঁরা কারবালায় শত্রুর হাতে নিহত হওয়ার আগেই তারা শহীদ হয়ে যান।

খোদাপ্রেম মানুষকে দেয় শাহাদতের মর্যাদা। আধ্যাত্মিক জ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলেন, শহীদ হওয়ার মানে এই নয় যে কেবল জিহাদের ময়দানেই নিহত হতে হবে। আপনি যখন কারো প্রতি গভীর ভালবাসা অনুভব করবেন তখন আপনি নিজেই তার মতো হয়ে উঠবেন। তার পছন্দকে আপনার পছন্দ, তার ঘৃণাকে আপনার ঘৃণা ও তার শত্রুকেও আপনার শত্রু মনে করবেন।
বিশ্বনবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইত ছিলেন এতো বেশি খোদা-প্রেমিক ও আল্লাহর রাসুলের এতা অন্ধ- প্রেমিক যে তাদের চিন্তা-চেতনা, আচর-আচরণ, মন-মানসিকতার সঙ্গে রাসূল (সা)’র চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, অভ্যাসের তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। তাই বিশ্বনবী (সা) যা জানতেন তা তাঁরাও জানতেন, তিনি যা দেখতেন তাঁর আহলে বাইতও তা দেখতেন। তাঁরা অতি উচ্চ-স্তরের খোদাপ্রেমিক ও রাসুল-প্রেমিক ছিলেন বলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের রাস্তায় সংগ্রাম করতে ও নিহত হতে তাঁরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হতেন না, বরং এ পথে সব ধরনের কষ্ট, ত্যাগ-তিতিক্ষা তথা ধন-সম্পদ থেকে শুরু করে নিজ জীবন ও এমনকি নিজের শিশু সন্তান বা পরিবার-পরিজন বিসর্জন দেয়াকেও মধুর চেয়েও সুমিষ্ট বলে মনে করতেন।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার সুবাদে খোদাপ্রেমিক হওয়ার তৌফিক দান করুন। #
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২৯