খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-৮)
রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস হল পবিত্র রমজান। মহান আল্লাহ’র রহমতের ফল্গুধারা অশেষ মহাসাগরের রূপ নিয়ে রমজান মাসে হাজির হয় গুনাহগার ও মু’মিন বান্দাহ’র সামনে। কিন্তু যে এই রহমতের অশেষ দরিয়া থেকে উপকৃত হতে পারে না তা তারই যোগ্যতার অভাব এবং এর চেয়ে দূর্ভাগ্যজনক আর কিছুই হতে পারে না।
খোদাপ্রেম চর্চার অনন্য মাস হল রমজান। কিন্তু পবিত্র আল্লাহর প্রেমিক হতে হলে বান্দাহ’র হৃদয়কেও করতে হবে পাপের কালিমা থেকে মুক্ত। শুধু তাই নয় হৃদয়কে রাখতে হবে সব ধরনের পাপের আশপাশ থেকেও অনেক দূরে। হৃদয়কে খোদা-প্রেমের দিকে এগিয়ে নেয়ার পথে এক বড় বাধা হল হিংসা। আসলে হিংসা হল মহান আল্লাহর রায়ের বিরোধিতা করা। ওমুক ব্যক্তির চেহারা আমার চেহারার চেয়ে সুন্দর ও স্বাস্থ্যও আমার চেয়ে ভালো, তাই তাকে হিংসা করার কী অর্থ হতে পারে? এর অর্থ আল্লাহ ওই ব্যক্তির জন্য যে চেহারা নির্ধারণ করেছেন ও সুস্বাস্থ্য দিয়েছেন তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া। অমুক ব্যক্তি মন্ত্রী হয়েছেন, কিংবা ধনী ব্যবসায়ী হয়েছেন বা বড় কর্মকর্তা হয়েছেন বলে একজন দরিদ্র চাষী বা পিয়নের তাতে ক্ষুব্ধ হওয়ার কি কোনো যুক্তি থাকতে পারে? এই পিয়ন বা চাষী তো বেশি পড়াশুনাও করেননি, তাই তিনি তো ওই বড় ব্যক্তিত্বদের সমান যোগ্যতার অধিকারী নন।
অমুকের বাড়িটা অনেক সুন্দর এবং আছে তার দামি গাড়ি, তাই বলে কি আমার কুড়ে ঘরে বসে আমি নিজের মাথার চুল ছিড়বো? একজন প্রকৃত মু’মিনের উচিত আল্লাহর দেয়া বরাদ্দে সন্তুষ্ট থাকা। অন্যের আয়-উন্নতি ও সম্পদের কারণে মনে হিংসা অনুভব করার অর্থ হল আল্লাহর দেয়া বরাদ্দকে মেনে না নেয়া। এমন মন নিয়ে কি খোদাপ্রেমিক হওয়া যায়?
বলা হয় হিংসুক কখনও বেহেশতে প্রবেশ করবে না। কারণ, বেহেশতে অপবিত্র হৃদয়ের কোনো স্থান নেই। হিংসুক সব সময় শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে দুর্বল বা অসুস্থ থাকে। হিংসাহীন ব্যক্তিরা হয় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। আমাদের হৃদয়ে ভালোবাসার যে একটি পাত্র রয়েছে তার ধারণ-ক্ষমতাকে দিনকে দিন বাড়ানোর মাধ্যমে আমরা হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রতিশোধপরায়নতার মত নানা বিষাক্ত স্বভাবকে চিরদিনের মতো আমাদের থেকে তাড়িয়ে দিতে পারি।

ধর্মীয় বিষয়ের জ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন ভালো মুসলমানের উচিত বৈষয়িক বিষয়গুলোর ব্যাপারে নিজের চেয়ে অবস্থাসম্পন্ন লোকদের দিকে না তাকিয়ে নিজের চেয়ে দরিদ্রদের দিকে তাকানো এবং নিজের অবস্থার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। আর ধর্মীয় সাধনা ও ইবাদতের বিষয়ে একজন ভালো মুসলমানের কর্তব্য হল নিজের চেয়ে উন্নত ধার্মিকদের দিকে তাকানো। আমি যতই রাত জেগে ইবাদত করি না কেন, যত বেশিই ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করি না কেন এবং যত বেশিই হজ, জাকাত, নামাজ-রোজায় মশগুল হই না কেন, সব সময় আমাকে ভাবতে হবে যে আল্লাহর দরবারে কবুল না হলে আমার এ সব ইবাদতই মূল্যহীন এবং যদি এসব আল্লাহ কবুলও করে থাকেন তাহলেও মহান আল্লাহর নবী-রাসুল আর ওলিদের তুলনায় তা খুবই কম বা তুচ্ছ।
যে মুহূর্তে কোনো বান্দাহ ইবাদত-বন্দেগির জন্য গর্ব অনুভব করে তখনই তা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। চিন্তা করে দেখুন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু, খোদাপ্রেমিক ও ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও নিজের আমল-কে যথেষ্ট মনে করতেন না এবং দৈনিক শত শত বার তওবা করতেন। হযরত আলীর মত ব্যক্তি বলতেন, হায় সফর কত দীর্ঘ, কিন্তু সফরের সম্বল তথা পুন্য বা নেক আমল কতো কম!
মহান আল্লাহর কাছে একজন দাম্ভিক পুণ্যবানের চেয়ে অনুতপ্ত পাপীর মর্যাদা অনেক বেশি। খোদাপ্রেমের এই বড় সূত্রটি সবারই মনে রাখা উচিত।
চিন্তা করে দেখুন বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত এবং মহান আল্লাহর বড় ওলিরা আল্লাহর সৃষ্টিকে কতো বেশি ভালোবাসতেন। এমনকি তারা পাপীদের হৃদয়কেও জয় করে নিতেন ভালোবাসার মাধ্যমে। ফলে পাপীরা হয়ে পড়তো ফেরেশতাহ’র মতো পবিত্র।
আমাদের কখনও এমন প্রতিজ্ঞা করা উচিত নয় যে অমুক আমার সঙ্গে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করেছে বলে আমি কখনও তার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবো না কিংবা তার সঙ্গে কখনও স্বাভাবিক আচরণ করবো না। একজন ভালো মুসলমানের হওয়া উচিত ক্ষমাশীল ও দয়াদ্র। আল্লাহর যে কোনো সৃস্টিকে শ্রদ্ধা করুন ও গভীরভাবে ভালবাসুন এবং যথাসাথ্য তাদের উপকারের চেষ্টা করুন। তাহলে দেখবেন যে আল্লাহর রহমত ও খোদাপ্রেম আপনাকে ফেরেশতার চেয়েও উন্নত পর্যায়ে তথা মহামানবের স্তরে উঠিয়ে দিয়েছে। সবাই তখন আপনাকে ভালবাসবে ও শ্রদ্ধা করবে। এমনকি পশু-পাখীও আপনার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সব শ্রেষ্ঠ গুণের উৎস তথা খোদাপ্রেম অর্জনের তৌফিক দিন রমজানের প্রকৃত সংযম সাধনার উসিলায়।#
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৩