১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আবুল মকসুদ
ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’য় সরকারের সতর্কতা এবং আমাদের সক্ষমতা প্রশংসাযোগ্য। তবে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেয়া হলো অথচ তেমন কিছুই ঘটল না। এমনটি হলে তো মহাপ্রলয় ঘটে যাওয়ার কথা। বিষয়টি নিয়ে আমার মনেও প্রশ্ন রয়েছে। মোরা’ পরবর্তী পরিস্থিতিতে রেডিও তেহরানের সাথে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কলামিস্ট ও ভাষ্যকার সৈয়দ আবুল মকসুদ।
ভারতীয় জাহাজ উদ্ধার কাজে সাগরে আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরকম দুযোর্গ মোকাবেলায় আমাদের যথেষ্ট সক্ষমতা থাকার পরও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রশ্ন তো ওঠে না।
সক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত করেছে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায়। তবে সরকার বলছে, আগাম এবং কার্যকরী প্রস্তুতি নেয়ার কারণে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ প্রশংসিত হয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে-বাংলাদেশের এই উন্নতি কীভাবে সম্ভব হয়েছে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ নিয়ে যখন ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করা হয় তখন সর্বোচ্চ সতর্কতা নেয়া হয়। আর সেদিকটি বিবেচনায় নিলে মানুষের সর্বোচ্চ সতর্কতার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়েছে। তবে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটাও কম নয়। হাজার হাজার বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর কারো কোনো হাত নেই।
আর আমাদের দেশ উন্নয়নশীল এবং সম্পদ কম হলেও গত কয়েক দশক ধরে দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছি। যে কোনো দুর্যোগের সময় আমাদের উপকূলীয় সরকারি কর্মকর্তা যারা আছেন তারা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখে থাকেন। যখনই এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা থাকে তখন সরকারি কর্মকর্তারা ও স্থানীয় সরকার প্রশাসন খুবই সতর্ক হয়ে যান এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সুতরাং এদিক থেকে বলা যায় আমরা একধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছি যেট অনেক উন্নত দেশও হয়তো আমাদের মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
আর এর কারণ হচ্ছে আমরা দুযোর্গের সাথে যুদ্ধ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। দেখুন, আমেরিকাতেও দুর্যোগ হয়। জাপানে হচ্ছে, অষ্ট্রেলিয়াতে দুযোর্গ হচ্ছে। তবে সেটা হয়তো ক্ষণিকের জন্য কিন্তু আমরা দীর্ঘকাল ধরে দুর্যোগের মধ্যে বসবাস করতে করতে একধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছি। আর এবারের ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত আনার আগে সরকারের সতর্কতাও প্রশংসার দাবি রাখে। একইসাথে আমাদের সক্ষমতাও প্রশংসাযোগ্য।
রেডিও তেহরান: ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র বিপদ সংকেত জারি করা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে- ঘূর্ণিঝড় মোরা কী এতটাই বিপজ্জনক ছিল? আদৌ কী ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারির মতো পরিস্থিতি ছিল? দৈনিক মানবজমিনে এ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। তো এই বিতর্ক নিয়ে আপনি কী বলবেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন বা মিডিয়ায় যে প্রশ্নটি তোলা হয়েছে এ ধরনের প্রশ্নও আমাদের মনের মধ্যে দেখা দিয়েছে। কিন্তু আমরা তো বিজ্ঞানের মানুষ নই তাই হয়তো এ বিষয়ে সেইভাবে কথা বলতে পারব না। কিন্তু একেবারে ধা করে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতে যাওয়ার বিষয়টি আসলে বিরাট ব্যাপার।
এরকম অবস্থা সৃষ্টি হলে সেখানে প্রলয় কাণ্ড ঘটে যাওয়ার কথা। ১৯৭০ সালে যে ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। কাজেই এখানে কোন তথ্যের ভিত্তিতে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হলো সেটা একটা প্রশ্ন। আর বস্তুত দেখা গেল ঘূর্ণিঝড় মোরা ততোটা মারাত্মক ছিল না। এ বিষয়টি আসলে বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছেও মনে হয়েছে যে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত যে ভয়ংকর ব্যাপার। এমন একটি ঘোষণা দেয়া হলো অথচ তেমন কিছুই ঘটল না। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে। আর এ প্রশ্নের জবাব আমাদের মতো নাগরিক সমাজের মানুষের চেয়ে যারা বিজ্ঞানের মানুষ তারাই ভালো দিতে পারবেন।
রেডিও তেহরান: মোরার আঘাত পরবর্তী ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থায় সরকারের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা কী যথেষ্ট?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র পর যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে সেটা যে শুধুমাত্র সিভিল প্রশাসন করেছেন এমনটি তো নয়। নৌবাহিনীও এরসাথে কাজ করেছেন। ফলে তারা যেখানে কাজ করেছেন সেখানে ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি কম হয়েছে বলে আমরা মনে করি।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে যে এখানে দুর্নীতি একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। সরকার হয়তো ঠিকই ত্রাণ দেবে কিন্তু দুর্গতদের কাছে হয়তো তা সঠিকভাবে পৌঁছাবে না। এরকম ঘটনা তো হর-হামেশাই হয়ে থাকে। কাজেই এবারও এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না।
রেডিও তেহরান: ‘মোরা’র আঘাতের পর বঙ্গোপসাগরে ভারত যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে উদ্ধার অভিযানের জন্য। বিষয়টিকে সমালোচকরা বাঁকা চোখে দেখছেন। তারা বলছেন, সরকারের যদি এতই সাফল্য থাকে তাহলে ভারতের সাহায্য কেন নিতে হবে? আপনি কী বলবেন এ ইস্যুতে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: হ্যাঁ এ বিষয়টিও আমরা মিডিয়াতে দেখেছি। তাছাড়া একটি টকশোতে আমি এবং নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলাম। তাঁরও বক্তব্য এবং আমিও মনে করি আমাদের যেহেতু যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে এরকম দুর্যোগ মোকাবেলায় সেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রশ্ন কেন উঠছে। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যেজন্য আমরা আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে পারি। সেখানে প্রাণহানির পরিমাণ খুবই কম। এটা অবশ্যই খুব ভালো কথা। তবে ভারতীয় জাহাজ সমুদ্র থেকে কয়েকজন জেলেকে উদ্ধার করেছে এবং মৃতদেহ উদ্ধার করেছে বলে শুনেছি।
তবে আমরা মনে করি, যে মাত্রায় ঘুর্ণিঝড় হয়েছে সেটা মোকাবেলায় আমাদের নৌবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগই যথেষ্ট।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩