জুন ০৭, ২০১৭ ১৩:৩১ Asia/Dhaka
  • খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-১২)

আমিত্ব বা নফসের দাসত্ব খোদাপ্রেমের পথে বড় বাধা। অন্যদিকে নফসের দাসত্ব হল সব ধরনের পাপের প্রধান উৎস। ব্যক্তিগত পাপের চেয়ে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক পর্যায়ের পাপ বেশি মারাত্মক।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পাপ ও কুপ্রথা চালু করা হলে তার প্রভাব হয় অনেক সুদূর-প্রসারী। কোনো কোনো পাপ এমন যে তার প্রভাব হাজার হাজার বছর ধরে অব্যাহত থাকে। যেমন, ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্ম এক সময় একটি ঐশী তথা সত্য ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও একদল জ্ঞানপাপী এই ধর্ম দু'টির মধ্যে এমন বিকৃতি এনেছে যে হাজার হাজার বছর ধরে শত শত কোটি মানুষ সেই বিচ্যুতি হতে মুক্ত হতে পারছে না। এ ধরনের পাপের হোতা ওই জ্ঞানপাপীরা ছিল মূলত শয়তানেরই শাগরেদ। তারা প্রকৃত ধর্মীয় নেতাদের আসন দখল করেছিল ছলে-বলে কৌশলে।

ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে যোগ্য নেতা নির্বাচন করতে ব্যর্থ হলে জনগণকে সেই পাপের দায় ও কুফল বহন করতে হয় যুগ যুগ ধরে কিংবা শত শত ও এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে। তাই যোগ্য নেতা ও সৎ আর ধার্মিক বন্ধু নির্বাচন পাপ থেকে মুক্ত থাকার ও আত্ম-উন্নয়নের এক মোক্ষম উপায়।

ব্যক্তিগত পাপ এড়ানোর প্রশিক্ষণের একটি কৌশল হল, প্রবৃত্তি বা নফসের ঠিক বিপরীত দিকে চলা এবং এ জন্য হালাল অথচ জরুরি নয় এমন বিষয়গুলো পরিহার করা। যেমন, যে কথা না বললেই নয় এমন কথা না বলা, প্রবল ক্ষুধা না পেলে কিছু না খাওয়া বা ক্ষুধা মোটামুটি মিটে যাওয়ার পরই আর কিছু না খাওয়াসুস্বাদু খাবার এড়িয়ে চলা, গরমের সময় ঠাণ্ডা পানি ও শীতের সময় গরম পানি পান বা ব্যবহার না করা, বেশি বিশ্রাম না করা, চাকচিক্যময় পোশাক পরিহার, প্রতিহিংসার কারণে কারো কোনো সাফল্য বা ভালা কাজের প্রশংসা করতে ইচ্ছে না হলেও তা করা, অপমানজনক বা মন্দ কথা ও কাজের জবাবে রেগে না গিয়ে ভালো কিছু বলা ও করা ইত্যাদি। এইসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের প্রধান মাস হল পবিত্র রমজানকারণ, মানুষ এ সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে চরিত্র আর মানসিক প্রকৃতিকে উদার ও সহনীয় করার চেষ্টা করে। অবশ্য প্রকৃত রোজাদার হতে হলে নফসের সঙ্গে সংগ্রামের দীর্ঘ অভ্যাস থাকতে হবে। এ অভ্যাস কেবল পবিত্র রমজানেই হঠাৎ করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই এ জন্য সারা বছরই প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, নফসের সঙ্গে জিহাদ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জিহাদ।  

পাপ এড়ানোর নানা কৌশল আমরা জানতে পারি বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতসহ অন্যান্য মহাপুরুষদের জীবনী থেকে। ইসলামের পবিত্র মহাপুরুষদের রেখে যাওয়া নানা বক্তব্য, বাণী ও ভাষণ ছাড়াও তাঁদের দোয়াগুলো অধ্যয়ন পাপ পরিহারের পাশাপাশি উন্নত চরিত্র ও জীবন গঠনেও খুবই সহায়ক। এ ধরনের কয়েকটি বিখ্যাত দোয়া হল, মুনাজাতে শাবানিয়া, দোয়ায়ে কুমাইল, দোয়ায়ে আবু হামজা সুমালি, দোয়ায়ে আরাফাহ এবং সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায় বর্ণিত নানা দোয়া। 

‘সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া’ হচ্ছে মহান ইমাম হযরত যাইনুল আবেদিন (আ.) বা ইমাম সাজ্জাদের রেখে যাওয়া প্রাণস্পর্শী নানা দোয়ার সংকলন। এখানে রয়েছে 'মাকারিমুল আখলাক বা সর্বোচ্চ নৈতিক গুণাবলী' শীর্ষক বিখ্যাত দোয়াসহ বহু বিষয়ের দিক-নির্দেশনায় সমৃদ্ধ অনেক দোয়া। 

পাপ এড়ানোর জন্য আমাদেরকে মানুষের ওপর আল্লাহর অধিকার, মানুষের অধিকার ও পরিবেশ ও প্রকৃতির অধিকার এবং এমনকি নিজের ওপর নিজের অধিকার সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করা উচিত। আর এইসব অধিকারের বিবরণ রয়েছে সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায়। আমরা আল্লাহর অধিকারের ক্ষেত্রে যত পাপই করি না কেনো তওবার মাধ্যমে সেইসব পাপ মোচন করা সম্ভব। তাই কখনও আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে কোনো মুসলমানের হতাশ হওয়া উচিত নয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ হতাশাকে একমাত্র কাফির ও মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। তবে আমরা যদি কোনো মানুষের অধিকার এবং তার সম্মান, সম্পদ ও পরিবারের কোনো ক্ষতি করে থাকি সে জন্য যতক্ষণ সেই ব্যক্তি আমাদের ক্ষমা না করেন ততক্ষণ আল্লাহ সেই পাপ ক্ষমা করেন না। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ করতে হবে ও  তার কাছেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।

হে আল্লাহ! আমরা যাদের ক্ষতি করেছি তাদের সঙ্গে আপনিই আপনার পছন্দনীয় পন্থায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ দিন। #