জুন ০৮, ২০১৭ ১২:৩১ Asia/Dhaka

পবিত্র রমজান উপলক্ষে ‘খোদাপ্রেমের মাস রমজান শীর্ষক’ বিশেষ ধারাবাহিক আলোচনার ১৩ তম পর্বে আমরা বিশ্বের মুসলমানদের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করব।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বের নানা অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে যুদ্ধ ও সংঘাত। গত কয়েক বছর ধরে ইরাক ও সিরিয়ায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের অনুগত সেবাদস সরকারগুলোর মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের হামলায় হতাহত হয়েছে লক্ষাধিক নিরপরাধ মানুষ। পবিত্র ইসলাম ধর্মের নাম ব্যবহার করে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সদস্যরা জবাই করেছে বহু মুসলিম নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও এমনকি ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুসহ অনেক দুধের শিশুকেও। সম্প্রতি জাতিসংঘ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইয়েমেন ‘চরম বিপর্যয়ের’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অথচ বিশ্ববাসী ইয়েমেন সংকটকে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে।  ইয়েমেনের প্রায় ৭০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এ ছাড়া, ম্প্রতি সেখান কলেরা মহামারীতে মারা গেছে ৫০০ মানুষ।  জাতিসংঘ বলেছে, আগামী ছয় মাসে আরো দেড় লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হতে পারে। খাদ্য সংকটের শিকার হয়েছে ইয়েমেনের প্রায় দেড় কোটি মানুষ।

মিয়ানমার, বাহরাইন, ফিলিস্তিন, কাশ্মির ও নাইজেরিয়ার মুসলমানরাও হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। পবিত্র রমজান মাসেও ইয়েমেনের মুসলমানদের ওপর বন্ধ হচ্ছে না সৌদি বোমা বর্ষণ! সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো নির্যাতিত মুসলিম জাতিগুলোর কথা সঠিকভাবে তুলে ধরছে না। সৌদি রাজ-প্রাসাদে ও বিত্তবানদের খাবার টেবিলে যখন নানা ধরনের দামি খাবার অপচয় করা হচ্ছে তখন বিশ্বের বহু অঞ্চলের হতদরিদ্র মুসলমানরা ডাস্টবিনে সামান্য খাবারের সন্ধানে কুকুর-বিড়ালের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। সৌদি রাজকীয় বিমান যখন ইয়েমেনের যত্রতত্র বোমা বর্ষণ করে বেসামরিক ও নিরপরাধ সাধারণ মুসলমানদের হত্যা করছে  এবং সৌদি রাজ-কর্মকর্তারা যখন মুসলিম-বিদ্বেষী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তরবারি নিয়ে নাচানাচি করছেন তখন বহু মুসলিম দেশের আলেম সমাজ কীভাবে নীরব থাকছেন?! কোথায় গেল তথাকথিত মানবতা? কোথায় গেলো কথিত মক্কা ও মদিনার খাদেমদের মানব-প্রেম ও মুসলিম ভ্রাতৃত্ব? তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসীরা যখন ইরাক, সিরিয়া ও মিশরে কিংবা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে মুসলিম ভাইদের হত্যা করছে তখন ইসরাইলের সঙ্গে তাদের দহরম-মহরমের নানা খবর প্রায়ই প্রকাশ হচ্ছে!

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন, যার হাতে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ নয় এবং প্রতিবেশীদের অভুক্ত রেখে যারা পেট ভরে খায় ও ঘুমায় তারা আসলে মুসলমানই নয়। কি ছিল সৌদির প্রতিবেশী দরিদ্র ইয়েমেনি মুসলমানদের অপরাধ? তাদের অপরাধ কেবল এটাই যে তারা স্বাধীনভাবে নিজ দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে চায়। কাশ্মির, ফিলিস্তিন ও বাহরাইনের নির্যাতিত মুসলমানদের অপরাধ হল এটা যে তারা গণতন্ত্রান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা চায়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুচর সেবাদাস স্বৈর-শাসকরা এইসব অধিকার দিতে প্রস্তুত নয়।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠোর হচ্ছে ইহুদি। অথচ মুসলমানদের প্রথম কিবলাসহ ফিলিস্তিন দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন সৌদি সরকারসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি রাজতান্ত্রিক সরকার। নবী-রাসুলদের হত্যায় অভ্যস্ত ইহুদিদের উত্তরসূরী ইহুদিবাদীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে মিশর, জর্দান ও এমনকি তুরস্কের ইসলামপন্থী সরকারও! কথিত এইসব মুসলিম সরকারগুলোর ঈমান ও ইসলামের কি শোচনীয় অবস্থা!!  

মুসলিম বিশ্বের প্রকৃত আলেম ও সত্য-পন্থী মুসলমানদের উচিত এইসব বাস্তবতার আলোকে সৎ-কাজের আদেশ ও অসৎকাজের নির্দেশ সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের বিধান বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া। তা না হলে বর্তমান ভাঙ্গাচোরা ঈমান নিয়ে বা শুধু নামাজ-রোজার আমল নিয়ে কিয়ামতের দিন মহানবীর (সা) সামনে তাদেরকে লজ্জিত হতে হবে এবং তিনি অবশ্যই জ্ঞানপাপী মুসলিম আলেম  ও নেতাদের জন্য মুক্তিদাতা বা শাফায়াতকারী হবেন না। অবরুদ্ধ  গাজা, মিয়ানমার ও ইয়েমেনের অভুক্ত আর গৃহহারা শরণার্থী মুসলমানরা যখন ইফতার করার মত যথেষ্ট বিশুদ্ধ পানি এবং শুকনো রুটিও পাচ্ছেন না তখন আমরা তাদের জন্য কিছু না করেই কিভাবে প্রকৃত রোজাদার হওয়ার সাওয়াব অর্জন করবো? কিভাবে আমরা খাবো হরেক রকমের মজাদার ইফতারি? যখন মুসলমানদের প্রথম কেবলাকে রমজান মাসেও অপবিত্র করছে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা তখন কিভাবে নীরব থাকতে পারে একজন সাচ্চা ও বিপ্লবী এবং খোদাপ্রেমিক মুমিন মুসলমান?

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআনে বর্ণিত মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বগুলো পালনের তওফিক দান করুন।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৮