খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-১৪)
রহমত, বরকত ও মাগফিরাতসহ অজস্র ফজিলতের মাস রমজান যেন খুব দ্রুত গতিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আত্ম-সংশোধনের এই মাসকে আমরা কতটা আত্মগঠন ও আত্মউন্নয়নের কাজে লাগাতে পারছি তার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের রোজা রাখার এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার সার্থকতা।
ঈমানের উন্নয়ন ও আত্মিক সমৃদ্ধির দিক থেকে কোনো মু’মিনের দু’টি দিন যেন একই রকম না হয় সেই জোর দেয়া হয় ইসলামের উপদেশ বাণীতে। গতকাল যদি আপনি দশটি সৎ কাজ করেন, তাহলে আজ আরও বেশি সৎ কাজের চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ একজন মু’মিনকে আজ হতে হবে গতকালের চেয়ে উন্নত। আর তা হতে না পারাটা হবে বড় ধরনের ব্যর্থতা। কিন্তু যদি মু’মিনের আজকের উন্নয়নের অবস্থা গতকালের চেয়েও কম উন্নত হয় তাহলে তাকে বড় ধরনের অশনি সংকেত বলে সতর্ক হতে হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, যে নিজেকে সংশোধন করল সেই সফল।
আত্মিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির দিক থেকে রোজাদারের রয়েছে প্রকারভেদ। যেমন, সাধারণ রোজাদার, মধ্যম মানের রোজাদার, উন্নত মানের রোজাদার ও অতি-উন্নত বা আল্লাহর ওলিয়ে কেরামদের সমতুল্য রোজাদার। সাধারণ রোজাদাররা মোটা দাগে কেবল রোজার বাহ্যিক বিধানগুলো মেনে চলেন। কিন্তু তারা চোখ, কান ও অন্তরের রোজা পালনে প্রায়ই ব্যর্থ হন। মধ্যম মানের রোজাদাররা চোখ, কান ও পঞ্চেন্দ্রিয়কে সংযত রাখতে সক্ষম হলেও চিন্তা বা অন্তরকে পাপ থেকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হন। উন্নত মানের রোজাদারদের চিন্তার মধ্যেও পাপ করার ভাবনা আসে না। আর ওলিয়ে কেরামদের রোজা কেবলই আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তারা বেহেশতের লোভে বা দোযখের ভয়ে রোজা রাখেন না। তারা যে কেবল হারাম বর্জন করেন তা নয়, একইসঙ্গে আল্লাহর সঙ্গে সার্বক্ষণিক প্রেমময় যোগাযোগ ছিন্ন বা দুর্বল হওয়ার জন্য দায়ী- এমন অনেক বৈধ কাজও তারা এড়িয়ে চলেন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে অতি-উন্নত পর্যায়ের রোজাদার হওয়ার তৌফিক দান করুন।
বিশ্বনবী (সা) বলেছেন, আল্লাহ যখন কাউকে ভালোবাসেন তখন তাকে দান করেন ধর্মের জ্ঞান এবং সেই ব্যক্তি কম ঘুমান, কম খান ও কথাও বলেন কম। আর রমজানের সংযম সাধনা প্রজ্ঞা অর্জনের জন্য সহায়ক ও এই মাসই কম ঘুমানোর, কম খাবার খাওয়ার ও কম কথা বলার অভ্যাস রপ্ত করার শ্রেষ্ঠ মাস। মহানবীর (সা) মতে, রমজানের এত অজস্র কল্যাণ রয়েছে যে মানুষ যদি তা জানত তাহলে তারা সারা বছরই রমজানের মতো রোজার খোদায়ী বিধান না থাকার জন্য আফসোস করত।
মহান আল্লাহ হযরত দাউদ (আ)’র ওপর ওহি নাজেল করে বলেছিলেন: হে দাউদ! আমি ৫টি বিষয়কে ৫টি চলকের সঙ্গে সংযুক্ত করেছি অথচ মানুষ সেই পাঁচ বিষয় সন্ধান করে অন্য ৫ মাধ্যমে। ফলে তারা সেসবকে পায় না। এ বিষয়গুলো হল:
১. আমি প্রকৃত জ্ঞানকে রেখেছি ক্ষুধা ও চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যে। অথচ মানুষ জ্ঞান অন্বেষণ করে ভরা পেটে ও আরাম-আয়েশ বজায় রেখে। ফলে তারা তা অর্জনে ব্যর্থ হয়। ২. আমি সম্মানকে রেখেছি আমার আনুগত্যের মধ্যে, কিন্তু মানুষ রাজা-বাদশাহ বা শাসকদের সেবার মধ্যে তা সন্ধান করে। ফলে তারা তা পায় না। ৩. আমি অভাবহীনতাকে রেখেছি অল্পে তুষ্ট থাকার মধ্যে, কিন্তু মানুষ তা খুঁজে বেড়ায় বিপুল বিত্ত আর সম্পদের মাঝে। ফলে তারা তার দেখা পায় না। ৪. আমি আমার সন্তুষ্টিকে রেখেছি নাফস বা (কুপ্রবৃত্তি) দুরাত্মাকে অসন্তুষ্ট করার মাঝে, কিন্তু মানুষ তা খুঁজে বেড়ায় নাফসকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে। ফলে তাদের ভাগ্যে তা জোটে না। ৫. আমি স্বস্তি ও প্রশান্তি রেখেছি বেহেশতের মধ্যে। অথচ মানুষ তা খুঁজে বেড়ায় দুনিয়ার মধ্যে। ফলে তারা তার নাগাল পায় না।
আগামীকাল ১৫ রমজান বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র বড় নাতি হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)'র পবিত্র জন্ম-বার্ষিকী। মুসলিম বিশ্বের যোগ্য ইমাম হিসেবে তাঁকে গড়ে তুলেছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.), আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা জাহরা (সালামুল্লাহি আলাইহা)। তাঁর জন্ম হয়েছিল মদীনায় হিজরি তৃতীয় সনে ও মুয়াবিয়ার ষড়যন্ত্রে তিনি শহীদ হন হিজরি ৫০ সনে। তিনি সমাহিত হন মদীনার জান্নাতুল বাকিতে।
মহানবী (সা.) প্রিয় এই নাতিকে কোলে নিয়ে আদর করা ছাড়াও তাঁর সঙ্গে খেলতেন। একবার তিনি এই নাতির জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করে বলছিলেন: হে আল্লাহ! আমি হাসানকে ভালোবাসি, তাই আপনিও তাদের ভালোবাসুন যারা হাসানকে ভালোবাসে।
মহানবী (সা) আরো বলেছেন, যারাই হাসান ও হুসাইনকে ভালোবাসে আমিও তাদের ভালোবাসি, আর আমি যাদের ভালোবাসি আল্লাহও তাদের ভালোবাসেন, আর আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন তাদের বেহেশত দান করবেন এবং যারা হাসান ও হুসাইনের সঙ্গে শত্রুতা রাখে তাদেরকে আমিও আমার শত্রু মনে করি, ফলে আল্লাহও তাদের শত্রু হন, আর আল্লাহ তার শত্রুকে জাহান্নামে পাঠাবেন।
মহানবী (সা.) আরো বলেছেন: হাসান ও হুসাইন বেহেশতি যুবকদের সর্দার। এরা দু' জন আমারই সন্তান। তিনি আরো বলেছেন: হাসান ও হুসাইন-দু'জনই মুসলমানদের ইমাম বা নেতা, তা তাঁরা (তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে) বিপ্লব করুক বা নাই করুক (কিংবা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক)।
সমর্থকদের নিষ্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতিসহ নানা দিক থেকে পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল থাকায় ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ-বিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, ইমামের প্রধান সেনাপতিসহ অনেকেই ভেতরে ভেতরে মুয়াবিয়ার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এ সময় তিনি মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে ইসলাম পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত এবং সুযোগ-সন্ধানী রোমানরা বায়তুল মোকাদ্দাস দখল করে নিত। এ ছাড়াও এ চুক্তির ফলে মুয়াবিয়ার প্রকৃত চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরা সহজ হয়েছিল।
ইমাম হাসান (আ) কয়েক বার তাঁর সম্পদ পুরোপুরি এবং কয়েকবার সম্পদের অর্ধাংশ দান করেছেন দরিদ্রদের জন্য। তিনি অন্তত ২৫ বার পায়ে হেঁটে হজ করেছেন। #
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৯