খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-১৬)
পবিত্র রমজান বিষয়ক মহানবীর (সা) উপদেশের প্রেক্ষাপটে আজ আমরা খোদাভীরুতার তথা পাপ থেকে দূরে থাকার একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত তুলে ধরব।
স্বৈরশাসক রেজা শাহের শাসনামলে ইরানের এক ধনী পরিবার ছিল রেজা শাহের কাছাকাছি পর্যায়ের ধনী। ওই পরিবারে ছিল তিন সহোদর ভাই ও এক বৃদ্ধা মাতা। ওই বৃদ্ধা ফরজ হজ পালন করতে চান। কিন্তু তার শরীর দুর্বল হওয়ায় বৃদ্ধার তিন ছেলে সে সময়কার অত্যন্ত সৎ আলেম ও দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মাদ তাকি জাফরি (র)’র (১৯২৩-১৯৯৮) শরণাপন্ন হয়। এক ব্যক্তির মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে তারা ওই বিজ্ঞ ও সৎ আলেমকে বদলী হজ করার প্রস্তাব দিল। প্রস্তাবে পারিশ্রমিকের কথাও উল্লেখ করা হয় যা ছিল বেশ লোভনীয়।
সে যুগে ইরানি মুদ্রার মাত্র তিন’শ তুমান দিয়ে সবচেয়ে ভালো হোটেলে থেকে ও সবচেয়ে দামী খাবার খেয়ে হজ সম্পাদনের পাশাপাশি বাড়তি অর্থ দিয়ে আত্মীয়-স্বজনের জন্য কিছু দামী উপহার বা সওগাত আনাও সম্ভব ছিল ইরানিদের জন্য। অথচ ওই ধনী পরিবার বদলি হজের সম্মানী হিসেবে আল্লামা জাফরিকে আড়াই হাজার তুমান দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল যা দিয়ে তিনি রাজকীয় হালে হজ করার পর বাড়তি অর্থ দিয়ে একটি বাড়িও কিনতে পারতেন তেহরানে। আর সে সময় তিনি ভাড়া করা বাসায় থাকতেন বলে এই প্রস্তাব লুফে নেয়াটাই হত আর্থিক বিবেচনায় তার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু আল্লামা জাফরি ভেবেছিলেন যে এই ধনী পরিবারের অঢেল সম্পদের সঙ্গে জোর-জুলুমের ও হারাম কামাইয়ের সম্পর্ক থাকার বেশ বড় রকমের আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাহ্যিক নানা হিসেবে বদলি হজের এই প্রস্তাব পালনে শরিয়তের কোনো বাধা না থাকলেও সম্ভাব্য পাপ থেকেও দূরে থাকার যে পরামর্শ ইসলাম দেয় তারই আলোকে এই প্রস্তাব গ্রহণ করা ঠিক হবে না। ফলে ওই ধনী পরিবারের দূতকে তিনি না বলে দিলেন এবং মাদ্রাসায় ক্লাস নেয়ার ব্যস্ততার কথা জানান।
ওই দূত ধনী পরিবারকে আল্লামার জবাব জানিয়ে দেয়ার পর সম্মানীর অর্থের মাত্রা বাড়িয়ে দ্বিগুণ তথা পাঁচ হাজার তুমান করা হয়। কিন্তু আল্লামা জাফরি আবারও নাকচ করলেন। পরে ওই ধনী পরিবার বদলি হজের সম্মানী চারগুণ করার তথা দশ হাজার তুমান দেয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আল্লামা টললেন না। এভাবে সম্মানী ২৫ হাজার তুমান পর্যন্ত উঠল। এবার আল্লামা দূতকে বলেন যে, আসলে আমি বেশি অর্থ চাইছি তা নয়। আসলে ঘটনাটা হল আমি এই পরিবারের উপার্জনের মধ্যে হারাম সম্পদ মিশে আছে বলে আশঙ্কা করছি এবং এ জন্যই এই প্রস্তাব নাকচ করছি, কিন্তু এই আসল কারণটা ওই পরিবারকে জানানোর দরকার নেই।
ওই দূত চলে যাওয়ার পর আল্লামা এ বিষয়ে আরও ভাবেন এবং প্রলোভন এড়াতে পারার জন্য মনে মনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরদিন সকালে নামাজ আদায় করে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে আল্লামা নিজের মধ্যে এক বড় ধরনের আধ্যাত্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন। তিনি পথে-ঘাটে থাকা মানুষের বেশিরভাগকেই নানা ধরনের পশুর চেহারায় দেখতে পেলেন! ফলে তিনি মাথা নিচু করে ও কখনও মাথা কাপড়ে ঢেকে পথ চললেন। ফেরার পথেও একই রকম অবস্থা: পথ-ঘাটের মানুষগুলোকে নানা ধরনের শিয়াল, কুকুর ও অন্য অনেক পশুর মত দেখাচ্ছে! অর্থাৎ বোঝা গেল যে আল্লামার গতকালের কাজটি আল্লাহর পছন্দ হয়েছিল এবং খোদাভীরুতাজনিত সাবধানতা অবলম্বন করেছেন বলে এর পুরস্কার হিসেবে মহান আল্লাহ তাকে মানুষের প্রকৃত অবস্থা দেখার ক্ষমতা দান করেন। কিন্তু আল্লামা ভাবলেন, এভাবে চোখ নিচু করে বা মাথা কাপড়ে ঢেকে কতকাল চলবেন! তাই তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন যেন তাকে দেয়া এই নতুন ক্ষমতাটি ফিরিয়ে নেয়া হয়। তার দোয়া কবুল হয়। ফলে লোকজনকে তিনি আগের মতই দেখতেন।
পবিত্র রমজান মাসের প্রাক্কালে দেয়া রোজা প্রসঙ্গে বিশ্বনবীর (সা) ভাষণের এক পর্যায়ে হযরত আলী (আ)’র সেই প্রশ্নের জবাব তথা রমজানের সবচেয়ে ভালো আমল কী- এই প্রশ্নের জবাবে মহানবী কেনো বলেছিলেন যে ‘পাপ থেকে দূরে থাকাই এ মাসের সবচেয়ে ভালো আমল’- তা আশা করি আমরা সবাই বুঝতে পেরেছি। নবিজি বলতে পারতেন যে, রজমানে পাপ না করাই সবচেয়ে ভালো কাজ। কিন্তু তিনি বললেন, পাপ থেকে দূরে থাকতে হবে, অর্থাৎ পাপের ধারে কাছেও যাওয়া যাবে না। পবিত্র কুরআনেও রয়েছে এ ধরনের উপদেশ। যেমন, আল্লাহ বলেছেন, তোমরা ব্যাভিচারের ধারে কাছেও যেও না। #
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১১