খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-১৭)
খোদাপ্রেমের বসন্ত মাস রমজানে আল্লাহর প্রতি আমাদের প্রেম-বিহ্বলতা বাড়ছে কী? মহান আল্লাহর অশেষ দয়া, নেয়ামত আর ক্ষমাশীলতা সব সময়ই প্রবাহমান। কিন্তু রমজান মাসটি হচ্ছে বান্দাহর প্রতি আল্লাহর রহমত, বরকত ও মাগফিরাতসহ নানা নেয়ামত অজস্র গুণ বাড়িয়ে দেয়ার মাস।
ভেবে দেখুন এই মাসে রোজাদারের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য সাওয়াব লেখা হয়! এমনকি ঘুমের জন্যও লেখা হয় সাওয়াব- যা অর্জন করতে কোনো কষ্টই করতে হয় না! এ মাসে ক্বদরের রাতের ইবাদতকে ধরা হয় হাজার মাসের ইবাদতের সমান! তাই অন্তত রমজানে মহামহিম আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রেমাসক্ততা বহুগুণ বাড়ানো উচিত নয় কি? কেবল রমজানেই নয়, অন্য সব সময়ই পাপ থেকে দূরে থাকার সাওয়াবও আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। বলা হয় কেউ যদি এক লোকমা হারাম খাবার বা তার সমপরিমান হারাম অর্থ কামাই করা থেকে বিরত থাকে তাহলে তার সাওয়াব হাজার হাজার রাকাত নফল নামাজের সাওয়াবের চেয়েও বেশি। পাপ থেকে দূরে থাকা এমনতিই যে কোনো ভালো মানুষের দায়িত্ব এবং এর বিনিময়ে আল্লাহ কোনো পুরস্কার না দিলেও পারতেন। কিন্তু আল্লাহ এর জন্যও সাওয়াবের ব্যবস্থা রেখেছেন! আল্লাহ কতো অকল্পনীয় মাত্রায় দয়ালু!
আমরা যদি মহান আল্লাহর দয়ার দিকগুলোকে ভালোভাবে লক্ষ্য করতাম তাহলে কেবল রমজানে নয়, আমরা সারা বছরই এবং সারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই খোদার প্রেমে আত্মহারা হয়ে থাকতাম। আল্লাহ কুরআনে নিজেই বলেছেন, তোমরা আমার কাছে চাও, আর চাইলে আমি অবশ্যই তোমাদের দোয়া কবুল করব। আর এ জন্য কারো কোনো মধ্যস্থতারও দরকার নেই। আমি রয়েছি তোমার নিজের আত্মার চেয়েও তোমার বেশি কাছাকাছি! অথচ কোনো বড় কর্মকর্তার সঙ্গে কি আমরা সহজেই সাক্ষাৎ করতে পারি এবং সাক্ষাৎ করলেও কি আমাদের সমস্যা তার হাতে সমাধানের কি কোনো গ্যারান্টি আছে? বান্দাহ কোনো ভুল বা পাপ করলে আল্লাহ তো তখনই শাস্তি দেন না। বরং আল্লাহ তওবার সুযোগ দেন। কিন্তু কোনো মানুষের সঙ্গে ভুল কিছু করলে সাথে সাথেই শাস্তি বা তিরস্কারের শিকার হতে হয়। আমরা কোনো ভালো কাজ করলে এর জন্য দশটি সাওয়াব লিখা হয় আল্লাহর নির্দেশে। কখনও কখনও তার চেয়েও বেশি। যেমন, ইসলামী বর্ণনায় এসেছে কেউ যদি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে কারো জন্য কোনো দোয়া করে তাহলে সে জন্য পাওয়া যায় দশটি সাওয়াব। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তা করলে তাকে দেয়া হয় সাড়ে সাত লক্ষ গুণ বেশি সাওয়াব!
আপনি যদি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় অন্য এক মুসলমান ভাইয়ের জন্য দুনিয়ায় বা বেহেশতে একটি বাড়ি চান আল্লাহর কাছে, তাহলে আল্লাহ বেহেশতে আপনাকে দেবেন সাড়ে সাত লক্ষ বাড়ি!
আল্লাহর দয়ার আরো এক বড় নমুনা হল, বান্দাহ সৎ কাজের ইচ্ছা করলেই সে জন্য সাওয়াব লেখা হয় এবং পরে তা না করলেও সাওয়াব অক্ষুণ্ন থাকে। কিন্তু পাপের ইচ্ছা করলেই তা গোনাহর খাতায় লেখা হয় না। এমনকি সে গোনাহটি করার কয়েক ঘণ্টা পরও পাপ রেকর্ডের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশে তা লেখা থেকে বিরত থাকেন এবং লোকটি গোনাহর জন্য অনুতপ্ত হন কিনা তা দেখার অপেক্ষায় থাকেন। সাত আট ঘণ্টার মধ্যে অনুতপ্ত হলে ও তওবা করলে ওই পাপটি আর রেকর্ডই করা হয় না বরং তা সাওয়াবের খাতায় পুণ্য হিসেবেই লেখা হয়। কেউ যদি বহু বছর পরও অতীতের ছোট-বড় সব পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায় তখনও আল্লাহ তা কবুল করেন ও তাকে ক্ষমা করেন এবং এমনকি অতীতের সব পাপগুলোকে তখন সাওয়াবে রূপান্তরিত করে দেন! আল্লাহ তওবাকারীকে বিদ্রুপও করেন না কিংবা বলেন না যে, ‘এখন এতো বছর পর ক্ষমা চাচ্ছ!? না কোনো ক্ষমা নেই!’
এমনকি মহান আল্লাহর বিশেষ দয়ায় অনেক পাপ কেবল আল্লাহই জানেন এবং তা অন্য সবার কাছে ও এমনকি ফেরেশতাদের কাছেও গোপন রাখা হয়।
অথচ সাধারণ মানুষ কত বেশি প্রতিহিংসা-পরায়ন। আপনি একটা নিন্দাসূচক কিছু বললে তারা দশগুন খারাপ কথা শুনিয়ে দেয়। আপনি অপমানসূচক কিছু বললেই প্রতিপক্ষ আপনার মৃত্যু কামনা করবে। এক আঘাতের জবাবে দেবে কয়েকটি আঘাত। অথচ মহান আল্লাহ ধৈর্য ধরে বহু বড় জালিমকেও অনেক বছরের সময় দেন যাতে সে সংশোধনের সুযোগ পায় সর্বোচ্চ মাত্রায়।
নফল ইবাদত করে বান্দাহ যখন আল্লাহর কাছে কিছু চায় তখন আল্লাহ তার আশা পূরণ করেন। কখনও আল্লাহ বিলম্বে দোয়া কবুল করেন এবং বান্দাহ যা চায় তার চেয়ে অনেক গুণ ভালো ও উন্নত কিছু দান করেন। ন্যায়সঙ্গত কিছু প্রার্থনার আগে ও পরে যদি কেউ বিশ্বনবী (সা)’র ওপর দরুদ পাঠ করে তাহলে তা পূরণ না করতে আল্লাহ লজ্জা বোধ করেন।#
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১২