জুন ১৩, ২০১৭ ১৩:১০ Asia/Dhaka

বান্দাহর প্রতি মহান আল্লাহর এক অপার করুণার নিদর্শন হল তিনি দাসদের প্রার্থনা ও তওবা কবুল করেন। মহান আল্লাহর কাছে সরাসরি চাওয়ার রাস্তা সব সময়ই খোলা এবং তাঁর সঙ্গে নৈকট্য গড়ার পথও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সব সময়ই খোলা।

মহান আল্লাহর রহমত ও দোয়া কবুলের ব্যাপারে নিরাশ হওয়া এক মহাপাপ। কেবল কাফিররাই আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হয় বলে কুরআনে বলা হয়েছে।

মহান আল্লাহ মানুষের যৌবনের ইবাদত ও আনুগত্যকে বেশি মূল্য দেন। আমরা কেউই জানি না কখন আমাদের মৃত্যু হবে। তাই বৃদ্ধ হলে তখন বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি করব –এমন আশা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। 

অনেক সময় মানুষ নিজের জন্য যা চায় তা তার জন্য উপকারী নয় বলেই আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করেন না। অনেক সময় মানুষ এমন কিছু চায় তা তার জন্য মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। তাই আল্লাহ তাকে তা দেন না। আবার অনেক প্রত্যাশা মানুষের ঈমানের জন্য ক্ষতিকর বলে আল্লাহ তা পূরণ করেন না।

দোয়া বা তওবা কবুলের রয়েছে বিশেষ স্থান ও সময়। যেমন, রমজানে দোয়া অন্য সময়ে চেয়ে বেশি কবুল হয়।  এ ছাড়াও প্রত্যেক নামাজের আগ মুহুর্তে ও পরে, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়, বৃষ্টির সময়, কদরের রাতে, ঈদের রাতে, শবে বরাতে ও আরাফাহর দিনে দোয়া কবুল হয়। কাবাঘর, সাফা-মারওয়া, পবিত্র মক্কা ও মদিনার মসজিদ, রাসুল (সা)’র রওজা মুবারক, অন্যান্য নবীদের মাজার, আলআকসা মসজিদ, মিনা শহরের আল খাইফ মসজিদ, পবিত্র কারবালার দুই পবিত্র মাজার, কুফার বড় মসজিদ, সাহলা মসজিদ ও হান্নানা মসজিদ, বিশ্বনবীর (সা) আহলে বাইতের সদস্যদের পবিত্র মাজার প্রভৃতি দোয়া বা তওবা কবুলের খুব ভালো স্থান।  এ ছাড়াও মদিনার জান্নাতুল বাকি গোরস্থান, মক্কার জান্নাতুল মোয়াল্লা ও নাজাফের ওয়াদিউস সালাম গোরস্থান দোয়া কবুলের খুব ভালো জায়গা।

বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওয়াসিলা দিয়ে তওবা করলে ও  দোয়া চাইলে তা কবুল হয়। হযরত আদম (আ) নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর  বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওয়াসিলা দিয়ে তওবা করায় তা কবুল হয়েছিল।

পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ৬৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

....আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে তথা আমার রাসুলের কাছে আসত ও এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রসূলও যদি তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দিতেন তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত।  

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, সব কিছুরই একটি ভিত্তি রয়েছে, আর ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে আমাদের প্রতি তথা আমার পবিত্র বংশধরদের (আহলে বাইতের) প্রতি ভালবাসা।

তিনি আরও বলেছেন, 'প্রত্যেক বিষয়েরই রয়েছে জাকাত। আর শরীর বা দেহের জাকাত হচ্ছে রোজা।'

আজ ১৯ তম রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। ৪০ হিজরির এই সময়ে তথা ১৮ ই রমজানের দিন শেষে ১৯ রমজানের ভোর বেলায় ইবনে মোলজেম নামের এক ধর্মান্ধ খারেজি ফজরের নামাজে সিজদারত আমীরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আঃ)'র মাথায় বিষ-মাখানো তরবারি দিয়ে আঘাত হানায় দুই দিন পর তিনি শাহাদত বরণ করেন। এ ঘটনা ঘটেছিল কুফার গ্র্যান্ড মসজিদে।

অনেকেই মনে করেন ১৮ রমজানের দিবাগত রাত তথা ১৯ রমজানের রাত শবে কদর তথা মহিমান্বিত রাত। এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম।

আলী (আ.) সর্বত্র প্রকৃত ইসলাম ও ন্যায়-বিচার কায়েমের তথা সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেই সুবিধাবাদী, মুনাফিক এবং স্বল্প-জ্ঞানী ধর্মান্ধ ও বিভ্রান্ত শ্রেণীগুলো তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। যেমন, তিনি খিলাফত লাভের পর সব সাহাবির জন্য সরকার-প্রদত্ত ভাতা সমান করে দিয়ে রাসূল (সা.) সুন্নাত পুন:প্রবর্তন করেছিলেন। ফলে অনেকেই তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়।

শাবান মাসের শেষ শুক্রবারে রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.) ভাষণের শেষ পর্যায়ে কাঁদতে থাকেন। তা দেখে হযরত আলী (আ.) এর কারণ জানতে চান। জবাবে মহানবী বহু বছর পর রমজান মাসে আলী (আ.)'র মর্মান্তিক শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন,"হে আলী! এই মাসে তোমার ওপর যা নেমে আসবে সে জন্য আমি কাঁদছি। আমি নিজেকে কল্পনা করছি তোমার স্থানে যখন তুমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছ এবং সামুদ জাতির কাছে পাঠানো খোদায়ী উটের পা কর্তনকারী লোকটির মতই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটি তোমার মাথার ওপর আঘাত হানবে এবং তোমার দাড়ি তাতে (রক্তে) রঞ্জিত হবে।"  

নিজের শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা শুনে সব কিছুর আগে হযরত আলী (আ.)'র মনে যে চিন্তাটির উদয় হয়েছিল তা এই বস্তু-জগত সম্পর্কিত ছিল না, বরং তা ছিল নিজের ঈমান সম্পর্কিত। তাই তিনি প্রশ্ন করলেন: " হে আল্লাহর রাসূল! সে সময় আমি কী ঈমানের ওপর অবিচল থাকব? "রাসূল (সা.) বললেন: " হ্যাঁ, সে সময় তোমার ঈমান নিরাপদ থাকবে।" 

বিশ্বনবী (সা.) আরো বলতে লাগলেন, "হে আলী! যে তোমাকে হত্যা করে সে বাস্তবে আমাকে হত্যা করল, যে তোমাকে বিরক্ত করে সে আমাকে বিরক্ত করল এবং যে তোমার অবমাননা করল সে আমার অবমাননা করল, কারণ তুমি আমার আত্মা বা প্রাণের সমতুল্য। তোমার ও আমার মানসিকতা এবং স্বভাব অভিন্ন। নিঃসন্দেহে প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত আল্লাহ প্রথমে আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং এরপর সৃষ্টি করেছেন তোমাকে, তিনি প্রথমে বেছে নিয়েছেন আমাকে এবং এরপর বেছে নিয়েছেন তোমাকে। আল্লাহ আমাকে নবুওতের জন্য মনোনীত করেছেন, আর তোমাকে মনোনীত করেছেন ইমামতের জন্য। আর যে তোমার ইমামতকে অস্বীকার করবে সে (কার্যত) আমার নবুওতকে প্রত্যাখ্যান করল। হে আলী, তুমি আমার উত্তরাধিকারী, আমার সন্তানদের তথা নাতী-নাতনীর পিতা এবং আমার কন্যার স্বামী আর আমার উম্মতের জন্য আমার জীবদ্দশায় ও আমার মৃত্যুর পর আমার প্রতিনিধি বা খলিফা। তোমার নির্দেশ হল আমারই নির্দেশ, তোমার নিষেধাজ্ঞা হল আমারই নিষেধাজ্ঞা। সেই শক্তির শপথ করে বলছি যেই শক্তি আমাকে নবুওত দান করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে তৈরি করেছেন, তুমি হচ্ছ সৃষ্টিকুলের জন্য হুজ্জাতুল্লাহ বা আল্লাহর নিদর্শন এবং তাঁর রহস্যগুলোর আমানতদার বা ট্রাস্টি ও সৃষ্টিকুলের ওপর আল্লাহর খলিফা।" 

আলী (আ.) জিহাদ থেকে ফিরে আসলে মহানবী (সা.) তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে যেতেন এবং তাঁর মুখের ঘাম মুছে দিতেন নিজ হাতে। তাঁকে জিহাদ বা সফরের সময় বিদায় দিতে গিয়ে তাঁর বিজয়ের জন্য দোয়া করতেন এবং বলতেন: হে আল্লাহ, আলীর সঙ্গে এটাই যেন আমার শেষ দেখা না হয় কিংবা বলেছেন: হে আল্লাহ, আমার মৃত্যুর আগে আলীকে যেন আরো একবার দেখতে পারি।

বিশ্বনবী (সা) যখন আলী (আ)-কে এতো গভীরভাবে ভালবাসতেন তখন আমাদেরও উচিত মহানবীর (সা) পথ অনুসরণের চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মহানবীর প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন।#  

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১৭