খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-১৯)
রমজান মাসে নাজিল হয়েছিল সর্বশ্রেষ্ঠ ও একমাত্র অবিকৃত আসমানি কিতাব- পবিত্র কুরআন। তাই বলা হয় রমজান হচ্ছে পবিত্র কুরআন পাঠ ও কুরআন চর্চার বসন্ত। আর হাদিস হচ্ছে কুরআনেরই পরিপূরক বা কুরআনেরই ব্যাখ্যা। কুরআন পড়ার মানে আল্লাহ’র কথা শোনা। তাই কুরআন ও হাদিসের বাণী মানুষকে যোগায় প্রশান্তি এবং দূর করে আত্মার ক্লান্তি
তো এবারে শুনুন একটি হাদিস: প্রকৃত জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান তার দিনকে চার ভাগ করে এবং ওই চার ভাগে চার ধরনের কাজ করে। এই চার ধরনের কাজ হল: প্রথমত, পুরো দিনের কিছু অংশে আল্লাহকে সময় দেয়া। যেমন, নামাজ আদায়, কুরআন পাঠ, দোয়া, তাসবিহ-তাহলিল তথা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার কাজে কিছু সময় ব্যয় করা। দ্বিতীয়ত, পুরো দিনের কিছু সময় আত্ম-সমালোচনায় ব্যয় করা। অর্থাৎ বিগত দিনে কতোটা ভালো কাজ করলাম ও কতোটা অন্যায় কাজে জড়িত হয়েছি তার হিসেব বের করে সতর্ক হওয়া এবং আত্ম-উন্নয়ন ও আত্মসংশোধনের চেষ্টা করা। তৃতীয়ত, দিনের কিছুটা সময় কোনো সৎ আলেমের নসিহত শোনা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে। চতুর্থত, দিনের কিছু সময় বিশ্রাম ও বিনোদনে ব্যয় করা এবং কোনো কোনো সূত্রমতে পার্থিব নানা কাজও এই অংশেই করার কথা বলা হয়েছে।
মোটকথা একজন সচেতন মুমিন তার দৈনন্দিন কর্মসূচি এমনভাবে সাজান যাতে মহান আল্লাহর অধিকার রক্ষার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকারসহ সবার এবং সব ধরনের অধিকারই আদায় করা যায়।
পাপ থেকে দূরে থাকার জন্য কিয়ামত দিবসের কঠিন অবস্থা, কবরের আজাব, মৃত্যুর সময়কার সম্ভাব্য কষ্ট ও জাহান্নামের কঠোর শাস্তির কথা স্মরণ করা উচিত। পবিত্র কুরআনের সুরা হজে বলা হয়েছে,
‘হে লোকেরা! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কেয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাতা মা তার দুধের শিশুকে বিস্মৃত হবে ও প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং হে নবী! মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুত: আল্লাহর আযাব সুকঠিন’।
একদিন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) কোথাও বসেছিলেন। এমন সময় জিব্রাইল (আ) তাঁর কাছে আসেন দুঃখ-ভারাক্রান্ত মলিন চেহারা নিয়ে। মহানবী (সা) প্রশ্ন করলেন, কেনো তোমাকে এতো দুঃখ-ভারাক্রান্ত দেখাচ্ছে? জিব্রাইল ফেরেশতা বললেন, হে মুহাম্মাদ (সা)! আজ আমি যখন জাহান্নামের হাপর বসাতে দেখেছি, তাই কেনো আমি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হব না? মহানবী (সা) প্রশ্ন করলেন, জাহান্নামের হাপরটা কী? জিব্রাইল বললেন, এটা জাহান্নামের আগুনে দম দেয়ার হাপর যে আগুনকে আল্লাহ এক হাজার বছর ধরে উত্তপ্ত হওয়ার জন্য জ্বলতে বলেছেন। এক হাজার বছর ধরে জ্বলার ফলে জাহান্নামের আগুন উত্তপ্ত হয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে। এরপর আল্লাহ জাহান্নামের এই আগুনকে আরও এক হাজার বছর ধরে জ্বলতে বললেন, ফলে তা উত্তপ্ত হতে হতে সাদা বর্ণের হয়ে পড়ে। এরপর এই আগুনকে আরও এক হাজার বছর ধরে জ্বলতে বলেন মহান আল্লাহ। ফলে তা কালো রং ধারণ করে। এখন জাহান্নাম হয়ে পড়েছে কালো বর্ণের ও তা হয়ে পড়েছে অন্ধকার। এই (মহা-উত্তপ্ত) আগুনের ৭০ হাত দৈর্ঘ্যের এক টুকরো যদি এই বিশ্বে এসে পড়ে তাহলে তা অবশ্যই পুরো বিশ্বকে গলিয়ে পারদের মতো তরল করার জন্য যথেষ্ট হবে।
জিব্রাইল আরও বলছিলেন, যদি জাহান্নামের জাক্কুম গাছের এক ফোটা চরম তিতা রস ও দ্বারি বা জারি নামের কাঁটার রস যা জাহান্নামিদের জন্য তৈরি করা চরম দুর্গন্ধযুক্ত, তিক্ত ও আগুনের মতো গরম খাদ্য- তা যদি পৃথিবীর পানিতে এসে পড়ে তাহলে পৃথিবীর সবাই এর দুর্গন্ধের তীব্রতার কারণেই মারা যাবে। জিব্রাইলের এই কথা শুনে মহানবী ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন ও জিব্রাইলও একইভাবে কাঁদতে থাকেন। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ তাঁর একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ওই ফেরেশতা বললেন, মহান আল্লাহ আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন যে তিনি আপনাদের দু’জনকেই পাপ ও পাপের শাস্তি থেকে রেহাই দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক দিন এবং জাহান্নামে যেন এক মুহূর্তও থাকতে না হয় সেই অবস্থা অর্জনের পাশাপাশি বেহেশতবাসী হওয়ার উপযুক্ত আমলগুলো করারও সুযোগ দিন।#
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/১৯