খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-২২)
জ্ঞান মু’মিনের হারানো সম্পদ। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।
তাই সব সময়ই ইসলামী জ্ঞান চর্চা অব্যাহত রাখা জরুরি। আর পবিত্র রমজান মাসে এর সাওয়াবও অত্যন্ত ব্যাপক। ইসলামী জ্ঞান অর্জন ও তা বৃদ্ধির জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত সাহায্য চাইতে হবে।
জ্ঞান এমন এক বিষয় যা কেউ চুরি করে নিতে পারে না। বরং এ সম্পদ দান করলে তা আরও বেড়ে যায়। আমরা অনেকেই কেবল আর্থিক ও বস্তুগত সাহায্যকেই স্বাগত জানাই ও কেবল তাকেই বড় দানশীলতা বলে মনে করি। কিন্তু আসলে বস্তুগত দানের চেয়েও বড় দান হল জ্ঞান বিতরণ তথা কাউকে সঠিক পথ-প্রদর্শন। বস্তুগত রিজিকের চেয়েও বড় রিজিক হল জরুরি জ্ঞান অর্জন তথা ইসলামের নানা দিককে ভালোভাবে বুঝতে পারা। মানুষ যখন কোনো কিছু ভালোভাবে বুঝতে পারে তখন সে বিষয়ে তার সচেতনতা প্রখর হয় ও সে বিষয়ে তার কাজেও বাড়ে একাগ্রতা এবং আন্তরিকতা। ইবাদতও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই সচেতন ও প্রজ্ঞময় ইবাদতকেই মহান আল্লাহ বেশি পছন্দ করেন।
ইসলামী জ্ঞান অর্জনের বড় মাধ্যম হল কুরআন ও হাদিস। কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, এই মহাগ্রন্থ কেবল খোদাভীরু ও ঈমানদারদেরকেই পথ দেখায়। কেবল ঈমানদাররাই অদৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহকে বিশ্বাস করে। অবশ্য এই বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে মহান আল্লাহর দেয়া বুদ্ধি ও বিবেকের সাপোর্ট। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে মহান আল্লাহ সব সময় তাকে দেখছেন তখন সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইবাদত করেন এবং এ কারণেই রোজাদার গোপনেও পানহার ও পাপ করতে ভয় পান।
ইসলামী জ্ঞানের অভাবেই অনেকেই ইসলামকে জীবনের সব ক্ষেত্রে যথাযোগ্য মাত্রায় বাস্তবায়ন করেন না। ফলে তারা কোনো বিষয়কে দরকারের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেন। আর যে বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত সে বিষয়ে শৈথিল্য দেখান ও কম সক্রিয় থাকেন। প্রকৃত রোজাদার ও খাঁটি মু’মিনকে এইসব দুর্যোগ থেকে মুক্ত থাকার মতো জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
একজন মুমিনের থাকতে হবে স্থান, কাল ও প্রেক্ষাপটের আলোকে বেশি জরুরি বিষয়টিকে সনাক্ত করার ক্ষমতা ও সে বিষয়ে দায়িত্ব পালনের নিষ্ঠা। একজন ব্যক্তি পানিতে যখন ডুবে যাচ্ছে তখন ফরজ নামাজ আদায়ের চেয়েও ওই ব্যক্তির জীবন রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিংবা কোনো নারী যখন ডুবে যাচ্ছে তখন বেগানা নারী বলে তাকে ডুবে মরতে দেয়াটা মু’মিনের তো দূরের কথা কোনো বিবেকবান মানুষেরই কাজ হতে পারে না।
বর্তমান যুগেও অতীতেরই মতই ইসলামের নানা ভ্রান্ত পথ ও মতের ছড়াছড়ি দেখা যায়। জঙ্গিবাদ, ওয়াহাবি মতবাদ ও ইসলামী সংযম বহির্ভূত বৈরাগ্যবাদ এসবের অন্যতম।
মহানবী (সা.) স্পষ্টভাষায় বলেছেন,“ইসলাম ধর্মে বৈরাগ্যবাদের কোন স্থান নেই।” যখন মহানবী (সা.)-কে জানান হলো একদল সাহাবী জগৎ-জীবন ও সংসার ত্যাগ করে কেবলই নির্জনবাস ও ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত হয়েছে তখন তিনি তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে বলেছিলেন,“আমি যে তোমাদের নবী আমিও তো এমন নই।” মহানবী (সা.) তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছিলেন যে,ইসলাম একটি সামাজিক ধর্ম। এ ধর্ম জীবন ও সমাজমুখী। এ ধর্ম জগৎ-জীবন-সংসার ত্যাগের আহ্বান জানায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজবিমুখ ইবাদত ও ইবাদতবিমুখ সমাজ-মুখিতা উভয়ই নিন্দনীয়।
পবিত্র কুরআনের বাণী নিয়ে ভাবনা রমজান মাসে খাঁটি মুমিনের এক বড় কর্মসূচি। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন কুরআনের বাণী এমনই যে এ নিয়ে যতই ভাবনা চিন্তা করা হয় ততই জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত খুলে যায় এবং তা বাড়িয়ে দেয় মানুষের ঈমান। আপনি যতবারই গবেষণার মন নিয়ে কুরআনের আয়াত নিয়ে গবেষণা করবেন ততই আপনার কাছে জ্ঞান ও উপলব্ধির নতুন কোনো দিক বেরিয়ে আসবে।
শবে কদরের রাতেও কুরআনের সুরা পাঠ করার সময় গবেষকের মন নিয়ে পাঠ তথা কুরআন অধ্যয়ন করা উচিত। আমরা কুরআনের বাচন-ভঙ্গী ও শব্দের বিন্যাস থেকেও অনেক সময় নানা ইঙ্গিত পেতে পারি। যেমন, পবিত্র কুরআনের সুরা ফাতিহায় বলা হয়েছে, আমরা তোমারই তথা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করি ও একমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্য চাই। এখানে এটা স্পষ্ট যে ইবাদতের প্রসঙ্গ এসেছে আগে ও সাহায্য চাওয়ার কথাটা পরে এসেছে। অন্য কথায় আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার আগেই আমাদের উচিত আল্লাহর দাস বা অনুগত হওয়া।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আল্লাহর প্রকৃত দাস ও অনুরাগী হওয়ার, তাঁর বাণী আর বিধি-বিধান ভালোভাবে বোঝার এবং সেগুলো মানার তৌফিক দিন।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/১৭