খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-২৬)
পবিত্র কুরআনের আলোকে জীবন গড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই প্রায়ই উপদেশ শুনে থাকি। কিন্তু কারা এক্ষেত্রে আদর্শ? এ প্রশ্নের উত্তর কুরআনেই রয়েছে।
বিশ্বনবী (সা) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইত এক্ষেত্রে পরিপূর্ণ আদর্শ বা জীবন্ত কুরআন। আর তাঁদের পরেই রয়েছে নির্বাচিত বা বিশেষ সাহাবি ও মু’মিন বা বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ।
মহানবীর (সা) এক স্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল রাসুলে খোদার জীবন-যাপন পদ্ধতি বা জীবনাদর্শ কেমন ছিল? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, পবিত্র কুরআনই হচ্ছে তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি।
কেউ যদি বেহেশতের চাবিকাঠি পেতে চায় তাহলে তাঁকে সুরা মু’মিনুনে উল্লেখিত প্রথম দশ আয়াতের বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে হবে। এই সুরার প্রথম ১১ আয়াতে বলা হয়েছে:
‘মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নামাযে বিনয়াবনত, যারা বলে না অনর্থক কথা-বার্তা, যারা জাকাত দান করে থাকে এবং যারা যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে; তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত নারীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা সীমালংঘনকারী হবে এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে সতর্ক থাকে। আর তারা নামাজকে রক্ষা করে। তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে।
তারা শীতল ছায়াময় উদ্যান তথা জান্নাতুল ফেরদৌসের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।’
পবিত্র রমজানসহ যে কোনো সময়ের ইবাদতকে মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে ৬টি শর্তের কথা মাথায় রাখা উচিত। এই ছয়টি শর্ত হচ্ছে যথাক্রমে: খুলুসিয়াত বা আন্তরিকতা। অর্থাৎ প্রথমত ইবাদতের উদ্দেশ্য হতে হবে কেবলই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। দ্বিতীয়ত ইবাদত করতে হবে প্রফুল্ল চিত্তে। ইবাদতকে তিক্ত ওষুধের মত ভাবা ঠিক হবে না। ব্যক্তিগত দুঃখ বা শোক কিংবা সংকট যেন ইবাদতের আনন্দকে ম্লান না করে। তৃতীয়ত মহান আল্লাহর ইবাদত করতে হবে মারেফাত বা গভীর উপলব্ধি নিয়ে। চতুর্থত ইবাদত করতে হবে বিনম্র ও ভীতি-বিহ্বল চিত্তে। আল্লাহর প্রতি ভয় ও বিনয় দুইই থাকতে হবে। পঞ্চমত ইবাদত কেবল মৌসুম-ভিত্তিক যেন না হয়। যেমন, কেবল রমজান আসলেই ইবাদত-বন্দেগি করা আর সারা বছর আল্লাহকে ভুলে থাকা কাম্য নয়। কোনো বিশেষ মৌসুমে ফরজ ইবাদতের বাইরে খুব বেশি ইবাদত করার চেয়ে সারা বছর ও সারা জীবন ধরে কম মাত্রায় নফল ইবাদত চালিয়ে যাওয়াকে আল্লাহ বেশি পছন্দ করেন। যেমন, বলা হয় একজন মু’মিনের প্রতিদিন কুরআনের অন্তত ৫০ আয়াত পড়া উচিত।
অনেকেই অর্থ ও তাফসিরসহ কুরআন পড়ার বাইরে সাধারণ তিলাওয়াতকে মোটেই গুরুত্ব দিতে চান না। কিন্তু সাধারণ তিলাওয়াতেরও অনেক কল্যাণ রয়েছে। আল্লামা আমিনি রমজান মাসে ১৫ বার কুরআন খতম করতেন। আর এরমধ্যে ১৪ বারের সাওয়াব উৎসর্গ করতেন ১৪ মাসুমের নামে। আর এক খতম উৎসর্গ করতেন বাবা-মায়ের নামে।
যাই হোক, আল্লাহর কাছে ইবাদতকে গ্রহণযোগ্য করার ষষ্ঠ শর্তটি হচ্ছে ভারসাম্য বজায় রাখা। এমনভাবে ইবাদতে মশগুল হওয়া ঠিক নয় যা জীবনের অন্যান্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার এমনভাবেও দুনিয়াদারিতে মশগুল হওয়া উচিত নয় যাতে ইবাদতের সময়ই পাওয়া যায় না।
মু’মিন ব্যক্তির দোয়া হওয়া উচিত পবিত্র কুরআন-ভিত্তিক। আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ) কুফার মসজিদে রাতের বেলায় যে মুনাজাত করতেন তার প্রথমেই রয়েছে পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত নানা সতর্কবাণী। এইসব সতর্কবাণী উল্লেখ করেই তিনি তাঁর মুনাজাতে বলতেন:
'হে আল্লাহ! আমি সেই দিনের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে নিরাপত্তা চাইছি যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি কোন উপকারে আসবে না;কিন্তু কেবল সে ছাড়া যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে। যেদিন জালেম নিজের হাত দুটি দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের পথ অবলম্বন করতাম। যেদিন অপরাধীদের পরিচয় পাওয়া যাবে তাদের চেহারা থেকে;এরপর তাদের কপালের চুল ও পা ধরে টেনে নেয়া হবে। যেদিন বাবা ছেলের কোন কাজে আসবে না এবং ছেলেও তার বাবার কোনো উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। যেদিন জালিমদের ওজর-আপত্তি কোন উপকারে আসবে না, তাদের জন্যে থাকবে অভিশাপ এবং তাদের জন্যে থাকবে মন্দ ঘর। যেদিন কেউ কারও কোন উপকার করতে পারবে না এবং সেদিন সব কর্তৃত্ব হবে আল্লাহর। যেদিন পালিয়ে যাবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, বাবা,স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে।'যেদিন গোনাহগার পণ হিসেবে দিতে চাইবে তার সন্তান-সন্ততিকে, স্ত্রীকে,ভাইকে ও তার গোষ্ঠীকে যারা তাকে আশ্রয় দিত এবং এমনকি নিজেকে রক্ষার জন্য পৃথিবীর সবকিছু দিতে চাইবে। কিন্তু না,কখনও নয়। নিশ্চয়ই এটা লেলিহান আগুন যা শরীরের গোশত ও চামড়া ঝলসিয়ে নিঃশেষ করে দেবে'। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবুসাঈদ/২৬