এবারের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে: ড. হেলাল
সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়েছে। এবারের বাজেটকে গতানুগতিক বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ হেলাল উদ্দিন। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। এবারের বাজেট বাস্তবায়নে সংশয় রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ এবং উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। এবারের বাজেট কেমন হলো বলে মনে করছেন? এর ভালো-মন্দ দিক নিয়ে যদি একটু বলেন।
ড. হেলাল উদ্দিন: দেখুন, বাজেট হচ্ছে একটি দেশের এক বছরের কত আয় এবং কত ব্যয় হবে তার একটা রুপরেখা। সরকার কিভাবে কত পরিমাণ আয় করবেন এবং কোন কোন খাতে কত ব্যয় করবেন সেটাই হচ্ছে বাজেট। বাজেট আসলে তো বাস্তবায়ন নয়; সরকার কি বাস্তবায়ন করতে চায় সেটারই একটা চিত্র।
আমরা যদি বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের বাজেটের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, যে পরিমাণ আয়ের পরিকল্পনা বাজেটে করা হয়েছে তা পূরণ হয়নি। শুধু তাই নয় ব্যয়েরও যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে সেটাও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ বিবেচনায় সরকারের আয়-ব্যয় পরিকল্পনা পরবর্তিতে সংশোধিত বাজেটে কাটডাউন করা হয়। ফলে বাজেটে যে প্রস্তাবনা আছে সেটাই বাস্তবায়ন হবে এমনটি মনে করার কোনো কারণ আমি দেখিনা। বাজেট কার্যকরের ক্ষেত্রে কাটসাট করা হয়ে থাকে।
তাছাড়া প্রতিবছরই বাজেটের বরাদ্দ বেড়ে যায়। আর সেদিক থেকে দেখলে এবারের বাজেট খুব বেশি যে ব্যতিক্রম তেমনটি নয়। তবে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে বড় যে বিতর্কের জায়গাটি ছিল সেটি হচ্ছে- রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ভ্যাটের নতুন আইন। তবে পাস হওয়া বাজেটে কিন্তু সেই নতুন ভ্যাট আইনের বিষয়টি ২ বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে বাজেটে আয়ের যে খাত ধরা হয়েছে এবং ব্যয়ের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তা বাস্তবায়নে একটা সংশয়ের বিষয় থাকছে। ভ্যাটের নতুন আইন কার্যকর না হলে বর্তমান অবস্থার মধ্যে কিভাবে এতবড় ব্যয় নির্বাহ হবে?
তবে অন্যান্য বিবেচনায় এবারের বাজেটকে গতানুগতিকের চেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না।
রেডিও তেহরান: বিশাল অংকের অনেক বড় বাজেট। প্রতিবারই বাজেটের আকার বাড়ছে। এটা কী আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার নজির নাকি মূদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব?
ড. হেলাল উদ্দিন: দেখুন, মূল্যস্ফীতির বিষয়টি হচ্ছে, গতবছর ব্যয় করে যে লক্ষ্যে পৌঁছেছে সরকার চলতি বছর যদি সেই একই জায়গায় রাখতে চান সেক্ষেত্রেও বরাদ্দ মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে বাড়াতে হবে। ফলে প্রতিবছরই তার আগের বছরের তুলনায় বাজেট বড় হওয়ার বিষয়টির দিকে যেতেই হবে। এর অর্থ হচ্ছে একটা সমন্বয় করতে হচ্ছে মূল্যস্ফীতির কারণে। আর আমাদের প্রকৃত জিডিপি বাড়ছে। তো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি শতকরা ৭ ভাগ বাড়ে সেক্ষেত্রে তার সাথে সঙ্গতি রেখে কর বৃদ্ধি পাবে। তখন কর থেকে একটা বাড়তি আয় হবে। ফলে এ দুটো বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে জিডিপি শতাংশের অনুপাত বৃদ্ধির চেস্টা। আমরা যে পরিমাণ ট্যাক্স আহরণ করি তা থেকে অনুপাত বাড়ানো যায় কিনা সে চেষ্টা করা। ফলে মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি শুধু নয় পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলেই তারসাথে প্রবৃদ্ধির বিষয়টিও বাজেটে আসছে।
রেডিও তেহরান: প্রতিবারই বাজেট পেশের পর যে প্রশ্ন ওঠে সেটা হচ্ছে -এতবড় বাজেট বাস্তবায়ন হবে তো! বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাজেট প্রায় প্রতিবছরই খরচ করার সুযোগ হয় না- এ কারণে এমন প্রশ্ন। উন্নয়নখাতে বাজেট ব্যয় করতে সমস্যাটা আসলে কোথায় থাকে? এর সমাধান কী?
ড. হেলাল উদ্দিন: দেখুন, এবারের বাজেটকে যে অতিবড় বলা হচ্ছে-আমি ঠিক তেমনটি মনে করছি না। অতিবড় নয় এজন্য যে গত বছরের বাজেটও তো প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকার মতো ছিল। হয়তো সে বাজেট পুরোটা বাস্তবায়ন হয়নি। আর গতবারের বাজেটকে বিবেচনায় নিলে হয়তো এবারের বাজেটও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে এমনটিও মনে করার কারণ নেই। আর সরকারের ভেতরেও এমন একটি ধারনা থাকতে পারে যে বাজেট পুরোপুরি হয়তো বাস্তবায়ন নাও হতে পারে। তবে একটা আকাঙ্খা, প্রত্যাশা এবং লক্ষ্য থাকতে হবে।
তবে উন্নয়নখাতে বাজেট ব্যয়ে সমস্যাটা হচ্ছে-যখনই কোনো ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং তারজন্য যে পরিমাণ আয় করতে হবে তাতে প্রতিবছরই ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আর ব্যয় করার ক্ষেত্রেও যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে তা হচ্ছে বাজেট যেহেতু এক বছরের, সেখানে বাজেট পাসের পর উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় শুরু করতেই একটা সময় পার হয়ে যায়। তারপর অর্থ ছাড় হওয়ার পর প্রকল্প শেষ করতে যে সময় হাতে থাকে তাতে শেষ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের ব্যাপারে সরকারের যে পদ্ধতি আছে সেটা মেনে চলাও যেমন কঠিন হয়ে যায় একইসাথে দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়ও থাকে।
এছাড়া বাইরের খাত থেকে অর্থ আসার যে আশ্বাস পাই সেটাও অনেক সময় যথাযথ সময়ে পাওয়া যায় না। অর্থ আনার জন্য স্বচ্ছতার যে বিষয় থাকে তাও অনেক সময় জটিলতার মধ্যে পড়ে। অভ্যন্তরীণ অর্থ ছাড়ের চেয়ে বিদেশ থেকে অর্থ আনার ক্ষেত্রে অনেক বেশি বেগ পেতে হয়। সেই জায়গায় প্রতিবছরই অনেক বেশি গ্যাপ থেকে যায়। ফলে প্রতিবছর বাজেট করাটা এক স্বল্পমেয়াদী বিষয় কিন্তু কাঠামোগত সমস্যাটা দীর্ঘমেয়াদী। আর সেই কাঠামোগত পরিবর্তনের তেমন কোনো প্রস্তাবনা বাজেটে থাকছে না। আর সেটাই আমাদের বাজেটে বড় সমস্যা বলে আমি মনে করি।
রেডিও তেহরান: এবারের বাজেট পেশের পর যে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়েছে তা হলো ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি। পরে অবশ্য তা কমানোর প্রস্তাব করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং তা মেনে নিয়েই বাজেট পাস হয়েছে। এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এবারের বাজেটের কোনো দিক কী জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে কীনা?
ড. হেলাল উদ্দিন: দেখুন, বাজেট সব সময়ই জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলো জনগণের কোন অংশের ওপর চাপ ফেলছে সেটা দেখার বিষয়। বাজেটে যখন সরকার বেশি আয় করছে তখন জনগণের কোনো একটা অংশ থেকে কোনো না কোনোভাবে সেই আয়টা করতে হচ্ছে।
আর প্রচলিত অর্থে চাপ বলতে আমরা বুঝি বাজেটের ফলে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তের ওপর কি ধরনের প্রভাব ফেলছে। সেক্ষেত্রে যদি কর কম হয় তাহলে সরকার অর্থায়ন কিভাবে করবে সেটাও একটা বিষয়। তবে সরাসরি জনগণের ওপর কর চাপের বিষয়টি এবারের বাজেটে দেখা যাচ্ছে না।
আর ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের যে বিষয়টি আপনি প্রশ্নের মধ্যে আনলেন সেটি আসলে খুব বড় কোনো বিষয় ছিল না। তারচেয়ে ভ্যাটের বিষয়টি ছিল বড়। যেভাবে ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্কের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে তাতে মনে হয়েছে ব্যাংকে টাকা জমা দিলেই তাতে আবগারি শূল্ক কাটা হবে। বিষয়টি তো আসলে সেরকম ছিল না। বার্ষিক জমা টাকার ওপর কিন্তু গ্রাহকের একটা অংশের আবগারি শুল্ক মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত এর আওতায় পড়েছে। এরপর থেকে শতকরা ৫০ থেকে ১০০ ভাগ আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। তারপরও বলব নৈতিকভাবে সরকারের এ ধরনের প্রস্তাবনা আনা উচিত হয়নি।
জনগণের ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আগে থেকেই ছিল। সরকার এটি আগে থেকেই করেছে। এবার সরকার শুধু সেটা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। আর বিষয়টি মিডিয়াতে অনেক বেশি লেখালেখি হওয়াতে সবার সামনে এসেছে। এটি না করার পক্ষেই বেশিরভাগ মানুষ মত দিয়েছেন। যারা বেশি আয় করছে তারা ব্যাংকে বেশি টাকা জমা রাখছে। আর আয়ের জন্য আয়করও দিচ্ছে। তারপরও কেন আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক থাকবে। এমন একটি নৈতিক প্রশ্ন কিন্তু আছে। শেষ পর্যন্ত পাস হওয়া বাজেটে কিন্তু আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়নি।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১