রায়ের মাধ্যমে বিচারবিভাগের স্বাধীনতাকে এনসিওর করা হয়েছে: সাদিয়া আরমান
বাংলাদেশের বিচারপতিদের অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। এ সম্পর্কে রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান বলেছেন, কোনো মামলায় যদি সরকারের স্বার্থ থাকে তাহলে দেখা যায় সেখানে তারা নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, বিচারপতিদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। আদালতের ওপর এধরনের চাপ একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান, বাংলাদেশের সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছে আদালত। এই রায়ের ফলে বিচার বিভাগে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে?
ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, আমাদের বিচারবিভাগ স্বাধীন থাকবে এটাই ছিল সংবিধানের মৌলিক দিক। তাছাড়া আমাদের দেশের লিভ জুরিডিকশনে যে বিষয়টি ছিল সেটি হচ্ছে- সরকারের এক্সিকিউটিভ বডি যেকোনো আইন পাস করলে যে কেউ রিটের মাধ্যমে সেই আইনের চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। এটি আমাদের দেশের আইন অঙ্গনের স্বাধীনতার বিষয়। আর দেশের আইন মন্ত্রণালয় এবং এটর্নি জেনারেলের অফিস মিলে বিচারপতি নিয়োগ করা হতো। তারপরও বলবো বিচার বিভাগের একধরনের স্বাধীনতা ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময় আমরা আইনজীবীরা লক্ষ্য করিছিলাম যে বিচার বিভাগের ওপর সরকারের অব্যাহত হস্তক্ষেপ বেড়েই চলেছে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে ছিল বিচারপতিদের যে কোনো সময় ইমপিচ করতে পারবে সংসদ। বিচার বিভাগকে এক্সকিউটিভ কন্ট্রোলে নিয়ে আসার একটা চেষ্টা ছিল। আর এ বিষয়টিকে আমরা আইনজীবীরা এবং বিচারপতিরা কখনও ভালোভাবে নিতে পারিনি।
যদিও আমরা কখনও কখনও দেখেছি হাইকোর্ট ডিভিশনে কোনো একটা রায় দেয়া হলে আপিল বিভাগে সে রায় অন্যরকম হয়ে যেত। কিন্তু সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল বিষয়ে আমরা আশা করেছিলাম সেরকমটি হবে না। কারণ এটি বিচারবিভাগের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে- বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়। এর মাধ্যমে এক্সিকিউটিভ বডির সাহায়্যে বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছিলো। আর সেটি ঠেকানোর জন্য আপিল বিভাগ এ রায় দিয়েছে।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা এ রায়ের পর রাজনীতিতেই বা কী প্রভাব পড়বে?
ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেশের জন্য আসলে ইতিবাচক কী বয়ে আনবে এ প্রশ্নের জবাবটি আমি এভাবে দেব, আসলে বিষয়টি তো সরাসরি বিচারপতি অপসারণের বিষয়। এখানে বিচারপতি নিয়োগ, তাঁর স্বাধীনতা এবং ইমপিচের বিষয়।
বিষয়টি কিন্তু অতটা সহজ নয়। এর কারণ হচ্ছে আমাদের সংসদ হচ্ছে লেজিসলেটিভ অর্গান। কিন্তু সেটি আসলে এক্সিকিউটিভ অর্গান হিসেবে কাজ করছে। তবে উচিত তিনটি অর্গান- শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ-এদের মধ্যে একটা ব্যালেন্স থাকা। অর্থাৎ একটি সুস্থ্য দেশে কিন্তু ব্যালেন্স অব পাওয়ার থাকবে। আর যে -যেভাবেই বলুক না কেন আমি মনে করি আমাদের দেশে সংসদ আসলে একদলীয় গণতন্ত্রের সংসদ। আর সেভাবেই চলছে। তবে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে বিষয়টিকে কিভাবে প্রভাবিত করা যাবে, কতরকম কু-বুদ্ধি করা হবে সেটা এখন বলা যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা সুপ্রিম জু্ডিসিয়াল কাউন্সিলকেও কিভাবে মেনিপুলেট করা যেতে পারে সে ব্যাপারেও এইমুহূর্তে মন্তব্য করা যাবে না। সময় বলে দেবে অনেক কিছুই।
রেডিও তেহরান: ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেশের জন্য আসলে ইতিবাচক কী বয়ে আনবে? এ নিয়ে বার বার কেন পরিবর্তন আনা হচ্ছে?
ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেশের জন্য ইতিবাচক যেটা বয়ে আনবে সেটা হচ্ছে, দেশের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে সাধারণ মানুষের আর যখন কোনো যাওয়ার জায়গা থাকে না বা পায় না তখন মানুষ দেশের সাধারণ কোর্টের কাছে যায় এবং হাইকোর্টের কাছে যায়।
তো আদালতের কোনো মামলায় যদি সরকারের স্বার্থ থাকে তাহলে দেখা যায় সেখানে তাঁরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে।
প্রাকিটিসিং আইনজীবী হিসেবে আমরা দেখেছি এমন চিত্র। আর সরকার বলতে পুরো সরকারকেই আমি বলতে চাইনি। প্রাকটিসের সময় আদালতে আমরা যেটা দেখতে পাই সেটা হচ্ছে সরকারের মধ্যে থাকা ক্ষমতাশীল মন্ত্রীদের যেসব জায়গায় স্বার্থ আছে, ক্ষমতার যেসব জায়গায় তাদের স্বার্থ জড়িত সেখানে তাঁরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন।
আর বিচারপতিদের ক্ষেত্রে যে সমস্যাটা হয় সেটা হচ্ছে যখন তাঁরা এ ধরনের চাপ অনুভব করেন তখন ওনাদের ভাবনায় ভবিষ্যতের চিত্র ফুটে ওঠে। কারণ কোনো মামলার রায় যদি সরকারের বিরুদ্ধে যায় তাহলে সেই বিচারপতির আপিল বিভাগে পদোন্নতি হবে না। তাই তাঁর রায় যতই আইনসঙ্গত হোক না কেন। এখন পর্যন্ত এধরনের বাস্তবতা চলছে আমাদের আদালতে। আর আমরা এই জায়গায় এখনও ঠেকে আছি। এই রূঢ় বাস্তবতার মধ্যে আবার যদি বিচাপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকে তাহলে বিচারপতিদের স্বাধীনতাটা কোথায় থাকবে! আর বিচারপতিদের স্বাধীনতা যদি না থাকে তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ কী কোনোভাবে ন্যায়বিচার পাবে!
রেডিও তেহরান: এ রায়ের পর সরকার দাবি করেছে- বিচারবিভাগ স্বাধীন বলেই এমন রায় দেয়া সম্ভব হয়েছে। সরকারের এ বক্তব্যকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, বিচারবিভাগ স্বাধীন বলেই আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের এমন রায় দিতে পেরেছে সরকারের এমন দাবির সাথে আমি একমত হতে পারিনা।
রেডিও তেহরান: এ রায়ের পর কেউ কেউ বলেছেন, রায়ের পেছনে বিচারকদের স্বার্থ কাজ করেছে। কীভাবে দেখছেন এ বক্তব্যকে?
ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, এ রায়ের মাধ্যমে বিচারবিভাগের, বিচারপতিদের এবং আইনজীবীদের যে স্বাধীনতা আছে সে বিষয়টি এনসিওর করা হয়েছে। এখানে টিকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
রেডিও তেহরান: অনেকে বলছেন, ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার জিয়াউর রহমানের শাসনের বৈধতা দেয়া হয়েছে? আপনার কী মনে হয়?
ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, বিষয়টি আসলে সেরকম নয়। আমি মনে করিনা কোনো একজন প্রেসিডেন্ট বিগত হয়ে গেলে তাঁর নাম এবং আমলটা এতটাই কালারড করে ফেলব এবং মনে করব যে সেটা ছিল ইতিহাসের কালো অধ্যায় ছিল। এটা আসলে আমাদের মানুষেরই একটা কালো অধ্যায়। যে বিষযটা থেকে আমরা এখনও উত্তরণ ঘটাতে পারিনি। ফলে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল নিয়ে আপিল বিভাগের এই রায় বিএনপির জয় ঠিক এমনটি নয়। এটি আসলে পুরো দেশের জন্য জয়। কারণ দেশের সুপ্রিম কোর্ট যতটুকু স্বাধীন থাকতে পারবে ততোটাই দেশের জন্য ভালো।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৯