চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ডা. ফায়জুল হাকিমের অভিমত
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে এডিস মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. ফায়জুল হাকিম বলেছেন, এ ব্যাপারে সরকারে অবহেলা রয়েছে।
রাজধানীর এডিস মশা নিধনে সরকার কিংবা সিটি করপোরেশনের আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার ছিল বলে মন্তব্য করেছেন এই চিকিৎসক। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন, দেশের জনস্বাস্থ্যের মান ক্রমশ নিচের দিকে যাচ্ছে।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব ডা. ফায়জুল হাকিম, বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন ধরে চিকুনগুনিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বহু মানুষ তবে রাজধানী ঢাকায় এর প্রকোপটা বেশি। যাহোক, এই রোগ হলে রোগীর করণীয় কী?
ডা. ফায়জুল হাকিম: চিকুনগুনিয়া মূলত মশাবাহিত রোগ। এডিস মশার কামড়েই এ রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। চিকুনগুনিয়া হলে আক্রান্ত রোগীর জয়েন্টে ব্যথা হয় বিশেষ করে পায়ের জয়েন্টে। যেটাকে প্রদাহ বলা হয়ে থাকে। এছাড়া অন্য ধরনের উপসর্গও থাকে। যেমন-শরীর দুর্বল করে, কারও কারও ক্ষেত্রে বমি ভাব থাকে।
রেডিও তেহরান: চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচার জন্য কী উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে ?
ডা. ফায়জুল হাকিম: চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে- প্রচুর পানি খেতে হবে। মুখে খাবার স্যালাইন খেতে হবে। জ্বর বেশি থাকলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বা সিরাপ খেতে হবে।
আর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বলব-পরিষ্কার পরিছন্নতাই মূল বিষয়। যেহেতু এটা এডিস মশাবাহিত রোগ। সে হিসেবে এই মশার জন্ম যাতে না হতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আর এডিস মশা যে ঢাকায় আছে এটা নতুন কোনো বিষয় নয়, পুরনো একটা বিষয়। তো এবছর যেভাবে রাজধানী ঢাকায় চিকুনগুনিয়া দেখা দিয়েছে সে ব্যাপারে সরকার আগে থেকে ওয়াকিবহাল ছিল না। রাষ্ট্রের অনেক বিষয়ে সরকার উদাসীন একইভাবে চিকুনগুনিয়ার ব্যাপারে সরকারের অবহেলা বা উদাসীনতা ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা চলে মহামরি পর্যায়ে রুপ নিতে যাচ্ছে।
রেডিও তেহরান: চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন এ নিয়ে গণমাধ্যম আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ডা. ফায়জুল হাকিম: না, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে আমি একমত নই। বরং আমি বলব গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার কারণে বিষয়টি নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকারেরও টনক নড়েছে।
কয়েক দিন আগে এক রোগীর ব্যাপারে আমি নিজে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম আমার ডাক্তার বন্ধুর সাথে আলাপ করতে। তিনি আমাকে বললেন, তাঁর পরিচিত কয়েকজন চিকিৎসক চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় দুই মাস চেম্বারে যেতে পারছে না। এথেকে বোঝা যায় চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহতা কতটা।
আমাদের জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ নামে যে সংগঠন রয়েছে-তারও কয়েকজন সদস্য চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হতে দেখেছি রিকশাচালক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে। যাদের অনেকেই এখন পর্যন্ত সুস্থ হননি। ফলে গণমাধ্যমকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে নিজেদের আত্মসমালোচনা করা উচিত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের। আমি বলব এখানে সিটি করপোরেশনকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। মশানিধনে কার্যকর ভূমিকা মূলত তাদেরই নেয়া উচিত ছিল।
রেডিও তেহরান: আপনার সংগঠন ‘জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ’-যেটুকু জানি স্বাস্থ্য সম্পর্কে আপনারা জনগণকে সচেতন করেন। তো চিকুনগুনিয়ার ব্যাপারে আপনারা কি উদ্যোগ নিয়েছেন।
ডা. ফায়জুল হাকিম: দেখুন, চিকুনগুনিয়ার ব্যাপার আমার সংগঠনের সবাইকে নিয়ে মাঠে নামার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু মিডিয়ার মাধ্যমে হয়তো আপনারা জেনে থাকবেন যে গত সপ্তায় আমার বিরুদ্ধে সরকার একটা হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছিল। আর যেহেতু আমি এই সংগঠনের আহবায়ক। ফলে যেদিন চিকুনগুনিয়া নিয়ে আমাদের সংগঠনের মিটিং ডেকেছিলাম ঠিক সেদিন এই হয়রানিমূলক মামলার কারণে আমি মিটিংয়ে বসতে পারিনি। তো যাইহোক হাইকোর্টে আমার আগাম জামিন হয়েছে। এখন আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে চিকুনগুনিয়া নিয়ে মাঠে নামব। কারণ এটি একটা বিরাট বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমি শুধু সরকারের সমালোচনা করার জন্য বলছিনা আমাদের নিজেদেরও রাজনৈতিক দায়িত্ব জনগণের স্বাস্থ্যসেবা রক্ষার জন্য কথা বলা। আর সরকার যেহেতু ক্ষমতায় থাকে। এডিস মশা দূরীকরণে সরকারের হাতে রয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। আর আমরা একটা গণতান্ত্রিক সংগঠন হিসেবে জনসচেতনা বাড়াতে পারি। প্রচারপত্র দিতে পারি এবং সিটি করপোরেশনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারি।
রেডিও তেহরান: অনেকে বলছেন, চিকুনগুনিয়ার বিষয়টিকে সরকার প্রথম থেকে গুরুত্ব দিলে পরিস্থিতি এতদূর পর্যন্ত গড়াত না। আপনার কী মনে হয়?
ডা. ফায়জুল হাকিম: হ্যাঁ, আমিও তাই মনে করি। মশা নিধনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বাজেট অপ্রতুল। কিংবা মশা নিধনের জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে সেটাও খুব নিম্মমানের। আমাদের সমাজ দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে আছে সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় মশার ওষুধের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি আছে।
ঢাকায় এডিস মশা আছে। আর এই এডিস মশার দ্বারা প্রতিবছর যে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ঘটছে। এই ডেঙ্গু তো চিকুনগুনিয়ার চেয়ে আরও ভয়ানক রোগ। ডেঙ্গু হলে তো মানবদেহের রক্ত ভেঙ্গে ফেলে। আর ডেঙ্গুতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ফলে রাজধানীর এডিস মশা নিধনে সরকার কিংবা সিটি করপোরেশনের আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার ছিল। নাহলে এটার প্রাদুর্ভাব হলো কিভাবে? সরকার যে অবহেলা করেছে সে বিষয়টি এখানে পরিষ্কার।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা ডা. ফায়জুল হাকিম, পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব কী শুধু সিটি করপোরেশন বা শুধু কী সরকারের? এব্যাপারে তো জনগণেরও সচেতনা প্রয়োজন। তো চিকুনগুনিয়ার ব্যাপারে জনগণ কতটা সচেতন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন।
ডা. ফায়জুল হাকিম: জনসচেতনার বিষয়ে আমি ছোট্ট একটি উদাহরণ দিতে চাই। বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রের জন্য মিডিয়াতে একটা প্রপাগান্ডা হতো। আর একারণে কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণের হার কিন্তু অনেকটা কমেছে। কিংবা আপনি যদি দেখেন এক চিমটে লবন, একমুঠো গুড় এবং আধা সের পানি এটা দিয়ে ডায়রিয়াকে মোকাবেলা করেছিলাম। সেক্ষেত্রেও প্রচার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমানে তো অনেক বেসরকারি টেলিভিশন আছে। অনেক মিডিয়া আছে কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে কিন্তু সেভাবে প্রচার দেখছি না। ইদানিং পত্রিকায় বড় বড় হেডিং এ বিজ্ঞাপন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেটা যদি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেয়া হয় এবং ব্যাপকভাবে প্রচার চালানো হয় তাহলে সাধারণ নাগরিকদের সচেতনা আরো বৃদ্ধি পাবে। তখন তাদের পক্ষে এ বিষয়ে প্রতিরোধের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে আমি মনে করি। আর সেক্ষেত্রেও নেতৃত্ব বা উদ্যোগী ভূমিকা তো সরকার এবং সিটি করপোরেশনকে নিতে হবে।
রেডিও তেহরান: চিকুনগুনিয়া নিয়ে সরকার, সিটি করপোরেশন এবং জনগণের প্রতি আপনার পরামর্শ কী হবে?
রেডিও তেহরান: দেখুন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এটি সমাজের-রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিক বিষয়ের সাথে এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। যেমন ধরুন ঢাকা শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষ বস্তিতে, ফুটপাথে মানবেতরভাবে বাস করে।
সম্প্রতি দেশের জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হলো। চলতি বছর একটি জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা করা হয়েছে। বর্তমান নীতিমালা যদিও হাতে পাইনি কিন্তু এর আগের যে গৃহায়ন নীতিমালা দেখেছিলাম তাতে সাধারণ মানুষের গৃহায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
আমাদের স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের পরিকল্পনা যদি সরকার বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে না থাকে তাহলে এই ধরনের অসুখ-বিসুখের ঘটনা প্রকট আকারে হবে। ফলে আমি বলব এটি সামগ্রিক পরিকল্পনার সাথে সম্পর্কিত। শুধুমাত্র মশার ওষুধ দিয়ে হয়তো এডিস মশা নিধন করা যাবে কিন্তু অন্য যেসব রোগ আছে বিশেষ করে পানিবাহিত রোগ তা কিভাবে রোধ করবেন। কিংবা ঢাকা শহরে যদি শব্দদূষণ বা বায়ুদূষণের বিষয়টিও খুবই ভয়াবহ। এসব দিকেও সরকারের কী মনোযোগ আছে? বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের দিকে তাকালে আমরা দেখব শব্দ দূষণের কারণে আমাদের শিশুদের শ্রবণ ক্ষমতা এবং মস্তিষ্কের বিকাশের ক্ষেত্রে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন সেমিনার এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের লেখালেখিতে এসব বিষয়ে চরম নৈরাজ্যের কথা ফুটে ওঠে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের জনগণের স্বাস্থ্যমান ক্রমশ নিচের দিকে যাচ্ছে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২০