জুলাই ২৮, ২০১৭ ১২:০৮ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের কাজগুলো রুটিন ওয়ার্ক। কমিশনের কর্মকর্তারা জানেন কীভাবে কাজগুলো করতে হয়। এজন্য রোডম্যাপ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই রোডম্যাপের কোনো অর্থবহন করে না।

রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। আবুল মকসুদ বলেন, রোডম্যাপ অপ্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সংবিধানে সুস্পষ্ট করা আছে। এরমধ্যে রোডম্যাপের কী প্রয়োজন? বাংলাদেশে এখন একটা শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশে রাজনীতি নেই বললেই চলে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ,বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন আাগমী জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। প্রথমেই আমরা জানতে চাইছি যে, কেন এই রোডম্যাপ ঘোষণার প্রয়োজন হলো? এতে নতুন কী আছে?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, বাংলাদেশে আগামীতে যে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেটিই প্রথম নির্বাচন নয়। এরআগে অনেকগুলো সাধারণ নির্বাচন হয়েছে এবং এদেশের মানুষ জানে কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হয়।

যেমন ধরুন প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। অবশ্য তখন ভোটার খুব বেশি ছিল না এবং সার্বজনীন ভোটাধিকার ছিল না। ১৯৪৬ সালেও নির্বাচনের একই অবস্থা ছিল।

১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। সেই ভোট কোনো নির্বাচন কমিশনের আওতায় হয়নি। সে নির্বাচন হয়েছিল জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে। ১৯৫৪ সালের সেই নির্বাচন এতটাই সুষ্ঠুভাবে হয়েছিল যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন সাহেব নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন।

এরপর সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। ৭০’র নির্বাচন ছিল ঐতিহাসিক। আর সেই নির্বাচন হয়েছিল একজন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। এটাই ছিল প্রথম নির্বাচন কমিশনের অধীন নির্বাচন। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। পরে তিনি বাংলাদেমের প্রেসিডেন্ট হন। সেই নির্বাচনের সময়ও কমিশনের কোনোরকম রোডম্যাপ বা এ ধরনের কিছুর প্রয়োজন হয়নি। এরপর আরও অনেক নির্বাচন হয়েছে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন যেভাবে গঠিত হয়েছে-তাতে এমনিতেই তারা কিছুটা বিতর্কিত। নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার কারণেই তারা যে খুব একটা আস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছে সেকথা বলা যাবে না।

নির্বাচন কমিশনের কাজগুলো রুটিন ওয়ার্ক। আগেও নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা প্রতিটি জেলায় আছেন। তারাও জানেন নির্বাচন কীভাবে করতে হয়। এরমধ্যে হঠাৎ করে নির্বাচনের রোডম্যাপ করার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই রোডম্যাপের কোনো অর্থবহন করে না।

নির্বাচন কমিশনের কতগুলো রুটিন কাজ আছে। যেমন ধরুন- ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা, কোনো নির্বাচনি এলাকায় অসঙ্গতি থাকলে তা নির্বাচন কমিশন দূর করবেন। এরজন্য তো রোডম্যাপের দরকার হয় না। তো হঠাৎ করে নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করলেন-এটা তো অপ্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। তাদের যা কাজ তা তারা করবেন। তারা এমন কিছু কাজ করতে পারতেন যাতে মানুষের মধ্যে কমিশন সম্পর্কে আস্থা সৃষ্টি হয়। সেইসব কাজ না করে হুট করে তারা রোডম্যাপ ঘোষণা করলেন।

তবে রোডম্যাপের মধ্যে খুব খারাপ কিছু আছে তা বলছি না। রোডম্যাপে যে ৭ টি পরিকল্পনার কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন- এগুলো জনগণকে জানানোর কোনো প্রয়োজন হয় না। কাজের মাধ্যমেই মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সংবিধানে সুস্পষ্ট করা আছে। এরমধ্যে রোডম্যাপের কী প্রয়োজন?

এমনিতেই নানারকম বিতর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি কোনো আস্থা নেই। দেশে গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক দল বা বিরোধী দল কেউই গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা পালন করছে না। আর বিরোধীদলের ভূমিকা খুবই দুর্বল। ছোটো ছোটো দলগুলো খুবই দায়িত্ব জ্ঞানহীন কাজ করছে। খুব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছে।

জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বলিষ্ট ভূমিকা রাখার কাজটি কেউ করছে না। সুতরাং বাংলাদেশে এখন একটা শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করছে। দেশের রাজনীতিতে একটা গুমোট ভাব বিরাজ করছে। বস্তুত দেশে রাজনীতি নেই বললেই চলে। এখন যেটা আছে সেটা হচ্ছে কে ক্ষমতায় থাকবে আর কে ক্ষমতা হারাবে। সুতরাং এই অবস্থায় সবার মধ্যে আস্থা আনার একটা ব্যবস্থা করা নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং সরকার- সকলের পক্ষ থেকে করা উচিত। সেসব না করে এই যে নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ঘোষণা-এটি কোনো অর্থবহন করে না।

রেডিও তেহরান: ঘোষিত রোডম্যাপকে বিএনপি কার্যত প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটি বলেছে, এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসানোর নীলনক্শা। আপনি কীভাবে দেখছেন এ অভিযোগকে?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন বিএনপি যে ভাষায় অভিযোগ করেছে সেটি যে খুব দক্ষ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে তেমনটি মনে হয় না। রোডম্যাপ ঘোষণার পর থেকে প্রতিদিনই বিএনপি একটা না একটা মন্তব্য করছে। সামনে নির্বাচন সেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারা নানা কারণে অনেক চাপের মধ্যে রয়েছে। সেই চাপ থেকে কিভাবে বের হতে পারবেন সে ব্যাপারে কথা বলা উচিত। তা না  বলে বিএনপির মুখপাত্ররা যেসব কথাবার্তা বলছেন তা দায়িত্ব জ্ঞানহীন বক্তব্য। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের যে অঙ্গীকার তার কোনো প্রতিফলন এসব কথাবার্তার মধ্যে নেই। তারা যা বলছেন তা কেবল কথার কথা। কিন্তু বিষয়টা এখন সে পর্যায়ে নেই।

এই মুহূর্তে এর বিরুদ্ধে-তার পক্ষে- এধরনের কথাবার্তা বললে জাতির কোনো লাভ হবে না। বিএনপি এই মুহূর্তে খুবই সংকটের মধ্যে আছে। কখনও ন্যায়সঙ্গত আবার কখনও অন্যায়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের জেল-জুলুম চলছে। এমন  একটা বিষয় তো আছেই। তারপরও দেশে কিভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং সেখানে বিএনপি কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে সেজন্য অবশ্যই তাদের খুব সংযতভাবে কথাবার্তা বলা উচিত। তবে এই রোডম্যাপ নিয়ে যা বিএনপি যা বলেছে তা কেবল কথার কথা মাত্র।

রেডিও তেহরান: বিএনপি দাবি করছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে। এর জবাবে আ. লীগ নেতা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিম এ দাবিকে মামা বাড়ির আব্দার বলেছেন। কী বলবেন এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, বিএনপির দাবির মধ্যে যুক্তি আছে। সেই দাবি নিয়ে খুব বলিষ্টভাবে তাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। অন্যদিকে বিএনপির বক্তব্য ও অবস্থানের পাল্টা হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্যে মনে হচ্ছে তারা কাউকে হিসাবের মধ্যে ধরছেন না। অন্যদলগুলোর কথা বাদই দিলাম। বিএনপির মতো একটা বড় দলকেও আওয়ামী লীগ হিসাবের মধ্যে নিচ্ছে না। কারও কোনো কথা শুনছে না।

তারা এমন নির্বাচন করতে চান যে নির্বাচনে নিজেরা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারবে। তারা গণতন্ত্রের জন্য কিছু বলছে না। তাদের বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে নিজেদের ক্ষমতায় আসা এবং ক্ষমতায় থাকা।

রেডিও তেহরান: সবশেষে আমরা আপনার কাছে জানতে চাইব- আসলে এই রোডম্যাপ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন আমি আগেই বলেছি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কাজ হচ্ছে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও কারচুপি মুক্ত একটি নির্বাচন করা। আর সেরকম একটি নির্বাচনের জন্য কমিশনকে অত্যন্ত বলিষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ। তো সেরকম একটা পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করলেন।

এই রোডম্যাপ ঘোষণা না করেও এই কাজগুলো নির্বাচন কমিশন করতে পারত। তো এই ঘোষণা করার কী অর্থ তাহলে! আসলে আমার মনে হয় নির্বাচন কমিশন মাঝে মাঝে চায় মিডিয়াও তাদের নিয়ে আলাপ আলোচনা করুক। তাদের কাছে তো কেউ বলেনি যে, আপনারা ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন সম্পর্কিত এসব কাজ করুন। দায়িত্বশীল কাজ সম্পাদন করার জন্য ঘোষণা করার তো কিছু নেই। ফলে আমার দৃষ্টিতে রোডম্যাপের কোনো ভূমিকা নেই।

যেসব কাজ করলে জনগণের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে আস্থা ফিরে আসে এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয় সেসব কাজই করা উচিত। মিডিয়ার সামনে প্রতিদিন বক্তব্য দিলে কোনো লাভ হবে না।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। তাদের নির্বাচন কমিশন তো এভাবে কথা বলে না। এমনকি তাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে সে কথাটাও অনেকেই জানে না। তারা কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের পরিচয় ও অবস্থান তুলে ধরছে। সুতরাং কাজ না করে মিডিয়ার সামনে এভাবে কথা বলে কেবল সময়ের অপচয় করছে নির্বাচন কমিশন। এর বাইরে তো আমি অন্য কিছু দেখি না।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৮